ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

করোনা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কী বার্তা দিয়ে গেল

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কী বার্তা দিয়ে গেল
×

ড. তারেক শামসুর রেহমান

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১২:১৮

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের একটি ঘটনা গত শনিবারের। লকডাউন উপেক্ষা করে মাওলানা জুবায়ের আহমেদ আনসারীর জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন লক্ষাধিক মানুষ। মাওলানা জুবায়ের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমির। এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় বইছে। একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যদি লক্ষাধিক মানুষ উপস্থিত হন, তাহলে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি থাকল কোথায়? মাওলানা জুবায়েরের অনেক অনুসারী থাকতে পারেন। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের নায়েবে আমির, আর সেই রাজনৈতিক দলের কিছু অনুসারী থাকতেই পারেন। জানাজার বিষয়টি একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। শেষ বিদায়ের দিনে আমরা সামাজিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে উপস্থিত হয়ে তার জন্য দোয়া চেয়ে তাকে আমরা বিদায় জানাই। স্বাভাবিক নিয়মে তার জানাজায় এত মানুষ উপস্থিত হলে এই প্রশ্নটি উঠত না। এখন উঠেছে; কেননা এখন আমরা এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই পরিস্থিতিতে লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতিতে গাদাগাদি করে জানাজায় অংশ নিয়ে আমরা যে কত বড় ক্ষত সৃষ্টি করলাম, তা কি আমাদের ধর্মীয় নেতারা একবারও ভেবে দেখেছেন? এর জন্য কাকে আমরা দায়ী করব?

সরাইল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার কিংবা জেলা প্রশাসক তার দায়িত্ব এড়িয়ে যান কীভাবে? এটা কি এক ধরনের শৈথিল্য? দায়িত্ব পালনে অবহেলা? আজকে যদি ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ আশপাশের এলাকায় করোনাভাইরাস ছড়িয়ে যায়, তার দায়িত্ব কে নেবে? সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত সংক্রমণের নতুন নতুন রুট তৈরি হচ্ছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের পর নতুন রুট এখন গাজীপুর, নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জ। আমাদের আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, দ্রুত করোনাভাইরাসটি 'সামাজিকভাবে সংক্রমিত' হচ্ছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ব্যাপক। এক ধরনের অব্যবস্থাপনাও লক্ষণীয়। মাওলানা জুবায়ের প্রতিষ্ঠিত সরাইলের জামিয়া রহমানিয়া বেড়তলা মাদ্রাসার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানে সরকারের লকডাউনের কথা। প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে জমায়েত না করার। ইসলামিক ফাউন্ডেশনও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। তাহলে এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে জানাজার আয়োজন করল কেন?

অবাক হয়ে যাই জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কর্মকাণ্ডে। তাদের কাছে নিশ্চয়ই তথ্য ছিল। প্রয়োজন হলে তাদের ১৪৪ ধারা জারি করা উচিত ছিল। তারা তো উচ্চশিক্ষিত। তারা করোনাভাইরাস যে বিশ্বব্যাপী কত বড় সংকট ও ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। সরকারের নির্দেশনাও তারা জানেন। তারপরও তারা যে কেন উদ্যোগ নিলেন না, তা বুঝতে অক্ষম।

করোনাভাইরাস সারাবিশ্বকে ওলটপালট করে দিয়েছে। গত প্রায় চার মাস এই ভাইরাসটিকে কোনোমতেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির দেশে এখন স্বাস্থ্য সেক্টরের ব্যর্থতা দেশটিকে একটি 'অকার্যকর রাষ্ট্রে' পরিণত করে ফেলেছে। কীভাবে করোনাভাইরাসটি চীনের উহান থেকে ইউরোপের ইতালি আর স্পেন হয়ে আটলান্টিকের অপর পাড়ে নিউইয়র্কে আঘাত করেছিল, এই কাহিনি আমরা সবাই জেনে গেছি ইতোমধ্যে। এর একটা অন্যতম কারণ ছিল 'সামাজিক দূরত্ব' বজায় না রাখা। এর ফলে এটি সংক্রমিত হয়েছে একজন থেকে দশজনে। আর তাতে করে সামাজিকভাবে সংক্রমিত হয়ে গেছে মহামারিটি। চিন্তা করা যায়, ২১০টি দেশ ও এলাকা আজ করোনা মহামারিতে আক্রান্ত! সামাজিকভাবে যাতে সংক্রমিত হতে না পারে সে জন্যই বলা হচ্ছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা।

করোনাভাইরাস কভিড-১৯ একজন থেকে আরেকজনের মাঝে ছড়ায়। এর মাধ্যমেই এটা সংক্রমিত হয়। তখনই প্রয়োজন সামাজিক দূরত্ব, কম জমায়েত হওয়া, কমপক্ষে ছয় ফুট দূরত্বের ব্যবধানে অবস্থান করা ইত্যাদি। জামিয়া রহমানিয়া বেড়তলা মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো করোনাভাইরাস সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা রাখেন না। কিন্তু ডিসি কিংবা এমপি সাহেবের এ বিষয়টি মনে রাখার কথা। তারা তো জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত। কিন্তু তারা কী করলেন? কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলেন না কেন? ওসি সাহেব স্বীকার করেছেন, 'তার করার কিছুই ছিল না।' অর্থাৎ তার পক্ষে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত ঠেকানো সম্ভব ছিল না। এই যুক্তি আমরা গ্রহণ করতে পারি না। কেননা সরাইলে ঢোকার সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ ছিল। প্রয়োজনে সেনাসদস্যদের ব্যবহার করা যেত। আমরা সবাই মিলে এটা ঘটতে দিয়েছি। কিন্তু আমরা এটা বিবেচনায় নিলাম না- এক লাখ লোকের উপস্থিতির মাঝে যদি একজন এই ভাইরাসটি বহন করে থাকেন, তিনি তা ছড়িয়ে দিলেন শত শত মানুষের মাঝে! আর এই শত শত মানুষের মধ্যে থেকে এখন সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ল আরও হাজার হাজার মানুষের! এই ভাইরাসটি যে কত ক্ষুদ্র, তা মাইক্রোস্কোপেও দেখা যায় না। ছোট একটি চালের মাঝেও কয়েক লাখ ভাইরাস স্থান করে নিতে পারে! আমরা এই মুহূর্তে হয়তো বুঝব না আমাদের কী কী ক্ষতি হয়ে গেল। ১৪ দিন পর আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারব যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশপাশের জেলাগুলো থেকে করোনাভাইরাসের আক্রান্তের খবর আসতে থাকবে!

করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সংকটের কারণে হোম কোয়ারেন্টাইন এখন একটা বড় প্রতিষেধক। বিজনেস ইনসাইডারের মতে, বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের একভাগ মানুষ এখন লকডাউন। ভারত, চীন, ফ্রান্স, ইতালি, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রেও এখন হাজার হাজার মানুষ 'হোম কোয়ারেন্টাইনে' আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই যে পরিসংখ্যান, এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় বিশ্ব আজ কত বড় সংকটের মধ্যে পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এর চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে সত্য (৭ কোটি ৫০ লাখ); কিন্তু এত বেশি দেশকে আক্রান্ত করেনি, যা করোনাভাইরাস করেছে। বিশ্ব আজ অসহায়। এই ভাইরাস মোকাবিলায় কোনো প্রতিষেধক এখনও আবিস্কৃত হয়নি। বিজ্ঞান অসহায়ের মতো লক্ষ্য করছে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। এই মৃত্যুর মিছিল কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা এই মুহূর্তে কেউই বলতে পারছে না। তবে স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। অর্থাৎ নিরাপত্তার ধারণায় এখন প্রাধান্য পাচ্ছে স্বাস্থ্য। এই নিরাপত্তা পারমাণবিক নিরাপত্তার ইস্যুটিকেও ম্লান করে দিয়েছে। মানবসভ্যতা প্রত্যক্ষ করেছিল ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা বিস্ম্ফোরণের করুণ কাহিনি। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে, তা ম্লান করে দিয়েছে হিরোশিমা-নাগাসাকির ঘটনাও।

বিবিসি জানাচ্ছে, সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি আরও দুই মাস স্থায়ী হতে পারে। এর অর্থ পরিস্কার, আগামী ২ মাস অর্থাৎ জুন পর্যন্ত আমাদের এই সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রচুর মানুষ বড় শহরগুলোতে বসবাস করে। ইতোমধ্যে এটি সামাজিক সংক্রমণে পরিণত হয়ে অনেকের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে, আইইডিসিআর তাই মনে করে। ফলে ব্রাহ্মহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা আমাদের জন্য একটা 'ওয়েক-আপ' ফল। অর্থাৎ জেগে ওঠার সময়। প্রশাসনকে আরও শক্ত হতে হবে। মানুষ লকডাউন মানতে চায় না, ঘরের বাইরে গিয়ে ঘোরাঘুরি করে, পাড়ায়-মহল্লায় আড্ডা দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, পুলিশ এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তিনি যে সংক্রমিত হয়ে বাড়ির সবাইকে একটা ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারেন, এটা অনেকেই বোঝেন না। সুতরাং কঠোর অবস্থানে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। খুদে ব্যবসায়ীদের জন্য এটা খারাপ সংবাদ, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু মহামারিটি ছড়িয়ে পড়ার আগেই শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। এর বিকল্প কোনো নেই।

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
[email protected]


আরও পড়ুন

×