ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সংকটে সংকট

সংকটে সংকট
×

ড. প্রতিভা রানী কর্মকার

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

এ জগতে ভাঙাগড়ার খেলা, হতাশা আর দুঃখের ঘনঘটা, সংকট ও অসংকটে সূর্যালোক আর আঁধারের লুকোচুরি প্রতিনিয়ত প্রতিভাসিত হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলেও চিরস্থায়ী হয়নি। রুশ সাহিত্যের মহারথী ফিওদর দস্তয়ভস্কি আজকের দিনে বিশ্বসাহিত্যে এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি তার জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস- দি ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টে লিখেছিলেন, রাত যত গভীর হয়, ভোর তত এগিয়ে আসে। কিন্তু সেই ভোরের আলো আনার জন্য বা সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য যুগে যুগে দরকার হয়েছে সৎ, সাহসী ও নিবেদিতজনের অবদান, যদিও পৃথিবীর সংগ্রাম ও সফলতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সেখানে কিছুসংখ্যক আত্মবিশ্বাসী মানুষের নিরলস সাধনা, শ্রম, সংগ্রাম, সততার গল্প যেমন ছিল, তেমনি ছিল অসততা আর বিশ্বাসহীনতার গল্প। ইংরেজ কবি, চিত্রশিল্পী এবং মুদ্রাকর উইলিয়াম ব্লেকও তার 'সংস অব ইনোসেন্স এন্ডঅব এক্সপেরিয়েন্স' কবিতামালায় জনশূন্য উপত্যকায় নিষ্পাপ সরল মেষশাবক যেমন দেখেছিলেন, তেমনি দেখতে পেয়েছিলেন নিকষ অন্ধকারে অত্যাচারী জ্বলন্ত উজ্জ্বল বাঘকে; যদিও আমাদের চারপাশে এদের উভয়ের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। নব্য অভিযোজিত প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে বিশ্বের দুই লক্ষাধিক মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছি স্বদেশের প্রিয়জন, হারাচ্ছি বিচক্ষণ প্রবীণদের, প্রবাসে থাকা আপনজনদের, নিজ দেশের সাধারণ মানুষ, নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক, শিশুসহ অনেক অমিত সম্ভাবনাময় প্রাণ। এ যেন এক বৈশ্বিক সংকট। এ সংকট চলে গেলে আমরা যেন ভুলে না যাই কেন এটা এসেছিল, কী তার প্রতিরোধের উপায়, এমনকি সংকট চলাকালে নিজেদের অসচেতনতায় এমন কিছু যেন না করি যা সংকটকে দীর্ঘায়িত করে। আজ যারা কারণে-অকারণে, প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যাচ্ছেন অথবা সংক্রমিত হচ্ছেন, সংক্রমিত করছেন, দরিদ্র, রোগাক্রান্ত এবং অসহায় মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে তাদের ক্ষতি করছেন, তারা হয়তো নিজেদের অজান্তে সংকটে সংকট আনছেন। এই সংকট সবার জন্য দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেই সবার মধ্যে আমি, আপনি, সে, আমরা সবাই আছি। সমাজে যে কোনো বিপর্যয় একটি অদৃশ্য চক্রের মতো। একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্ক থাকে। যেমন এই সংকটে দিনমজুর, কুটিরশিল্পী, গৃহপরিচারিকা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বস্ত্রশিল্পী, হস্তশিল্পীসহ ক্ষুদ্র ও বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত অনেকের জীবনে সহসা নেমে এসেছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কালো ছায়া। মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুসহ সব শিশু-কিশোরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হঠাৎ থমকে গেছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলা প্রাঙ্গণে এখন হতাশাজনক নীরবতা। সূর্যকিরণ আর ধুলোর সঙ্গে লুকোচুরি খেলার সঙ্গী নেই সেই ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুদের। এ রকম সংকটময় পরিস্থিতিতে আমরা যেন আর সংকট ডেকে না আনি কেবল নিজেদের অসচেতনতার জন্য, বিলাসিতার জন্য বা স্বাস্থ্যবিধি না মানার জন্য। ভাবতে হবে এখনই; কেননা রোগ নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। এ রোগে আতঙ্কিত না হয়ে গৃহকর্মে বা সামাজিক গুরুদায়িত্বে সচেতনভাবে নিয়োজিত থাকাই ভালো হবে। শিশু-কিশোরদের বাড়িতে বা অনলাইনে যতটা সম্ভব পাঠদান, ওদের সঙ্গে গল্প করা, নিজের দেশের ও বিশ্বের জানা-অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন করার সময় এখন।
বাঙালি যুদ্ধ করেছে বারবার। ভাষা ও স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে। জয়ী হয়েছে এবং হবে। বাংলাদেশের গল্প বিজয়ের গল্প। আজ সংকটে তবে কেন আমরা হাল ছাড়ব! এ সংকটে গৃহে থেকে, জনসমাগম এড়িয়ে বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে বাঁচাতে পারি আমার, আপনার সবার প্রাণ। এটাই তো সংকটে সংকটের সমাধান। আমাদের সোনার মাতৃভূমিতে মাটি উর্বর। এ ক্ষেত্রে শস্য উৎপাদনে সমৃদ্ধি আসবে, শিক্ষা, ব্যবসা ও বিজ্ঞানের গবেষণায় বিনিয়োগ ও কর্মদক্ষতা বাড়লে সুরক্ষিত হবো আমরা। এছাড়াও আমাদের আছে অনেক মেধাবী সন্তান, যারা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে পারবে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অর্থনীতিক বিপর্যয়, রোগ-ব্যাধি সব মানা যায়; আত্মিক বিপর্যয় এবং মনোবল যখন ভেঙে যায় তখনই সংকটে সংকট আসে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাংলায় সদ্য একটি নতুন বছর এসেছে। প্রত্যাশা করি, আমাদের বাইরের এই ক্ষণস্থায়ী সংকট কেটে যাবে, নতুন বছর নতুন আশায় আবার পথচলা শুরু হবে।
পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×