ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

খাদ্য নিরাপত্তায় নজর দিন

খাদ্য নিরাপত্তায় নজর দিন
×

মো. আবদুর রহিম

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

করোনাভাইরাসের কারণে আজ সারাবিশ্বের জনজীবন বিপর্যস্ত। এ ধরনের সংকট অভূতপূর্ব। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ আজ স্বেচ্ছা গৃহবন্দি। মানবসভ্যতা পূর্বেও অনেক প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট সংকট মোকাবিলা করেছে। কিন্তু বর্তমান সংকট নতুন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান সংকট পুরো পৃথিবীর জীবন ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে হুমকির সম্মুখীন করেছে। মহাক্ষমতাধর পরাশক্তি থেকে তৃতীয় বিশ্বের গরিব রাষ্ট্র সবাই আজ একই সরল রেখায় দাঁড়িয়ে। এই মহামারিতে কোনো রাষ্ট্র যে অন্য রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেবে সেটা আশা করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর্যায়ভুক্ত অর্থনীতির দেশ এ সংকটের অভিঘাত কীভাবে মোকাবিলা করবে তা গভীর চিন্তার বিষয়।
খাদ্য নিরাপত্তার নিরিখে ঐতিহাসিকভাবে বিশ্নেষণ করলে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশ সে ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কেননা বাংলাদেশ হলো খাদ্য উৎপাদনকারী দেশ। যেসব দেশের খাদ্যব্যবস্থা আমদানিনির্ভর সেসব দেশের ঝুঁকির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। কেননা বৈশ্বিক খাদ্যসংকট দেখা দিলে খাদ্য রপ্তানিকারক অঞ্চল নিজ দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার প্রদান করবে। ফলে রপ্তানির স্বাভাবিক প্রবণতা কার্যকর থাকবে না। অতিরিক্ত খাদ্য মজুদের প্রবণতা সবদেশেই দেখা দেবে। অর্থনীতির তাত্ত্বিক প্রয়োগ সেখানে কাজ করবে না। রপ্তানি আয় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ইত্যাদি বিষয়ের চেয়ে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য নিরাপদ খাদ্য মজুদ গড়ে তোলাই হবে প্রত্যেক দেশের প্রথম অগ্রাধিকার। সে ক্ষেত্রে ব-দ্বীপ সমভূমির বাংলাদেশ পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবে?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার 'একটি বাড়ি একটি খামার' কর্মসূচির দর্শনকে ঘরে ঘরে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মসূচি যে কতটা বাস্তবধর্মী তা আজ অনুধাবন করতে পারা যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, প্রাচীন ভারতীয় শাসক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্যও তার অর্থশাস্ত্রে বসতবাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনাতে ফল-ফুলের বাগান, পুকুর, কূপ, ধানের গোলা, একটি বাড়ি থেকে অন্য বাড়ির সীমা নির্দেশক বেড়া নির্মাণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছিলেন। কৌটিল্য গ্রামগুলোকে 'রাষ্ট্র' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এভাবে একেকটি গ্রাম স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার করা জরুরি। পরিত্যক্ত জমিকে উৎপাদন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি ফসল ফলাতে হবে। রংপুর অঞ্চলে গৃহীত চাষের জমিকে চার ফসলি জমিতে পরিণত করার কর্মসূচিকে দেশের অন্য জেলাতেও ছড়িয়ে দিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য আরও একটি সুখবর হলো, বাংলাদেশের প্রধান উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। হাওর অঞ্চলে ইতোমধ্যে ইরি ধান কাটা শুরু হয়েছে, অন্যত্র কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে। শঙ্কার বিষয় হলো, দ্রুত সময়ে ধান উঠানো সম্ভব না হলে শিলাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা প্রভৃতি কারণে ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনার কারণে মৌসুমি শ্রমিকের স্থানান্তরের প্রতিবন্ধকতা বড় সংকট তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপদ স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে। করোনার কারণে শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। লাখ লাখ শ্রমিক গ্রামে ফিরে গেছে অথবা বেকার বসে রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে গেছে। দেশের এই সংকটকালীন সময়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বেকার শ্রমিক এবং অন্য পেশার শ্রমজীবী মানুষকে ধান কাটার কাজে লাগানো যেতে পারে। এর ফলে একদিকে বেকার শ্রমিকদের সাময়িক কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে ক্ষেত থেকে দ্রুততম সময়ে ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করা যাবে। কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিপদগ্রস্ত কৃষকদের ধান কাটতে সহযোগিতা করতে দেখা যাচ্ছে। এবারে তারা সংগঠিতভাবে এলাকাভিত্তিক টিম গঠন করে এ কাজে এগিয়ে আসতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে গ্রীষ্ফ্মের ছুটিতে ছাত্ররা কাজ করে কিছু পয়সা আয় করে। দেশে এ ধরনের সুযোগ সীমিত। ছাত্ররা এ সংকটকালীন এ সময়টাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। বাবা-মায়ের কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি কমিউনিটি সার্ভিস হিসেবে তারা আপৎকালীন কৃষি অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। উন্নত দেশের ছাত্রদের কমিউনিটি সার্ভিস বাধ্যতামূলক। শিক্ষকরা এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের এ ধরনের কাজকে সে হিসেবে গণ্য করে টিউটোরিয়ালের সমান ক্রেডিট প্রদান করতে পারে।
যে কোনো মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির পরে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ওপরের সে আশঙ্কা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। করোনার প্রভাবে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক নয়। এমতাবস্থায় কোথাও যেন খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কোনো কারণে বাজার অস্থিতিশীল হলে ঘোলা জলের মাছ শিকারিরা মাঠে নেমে পড়বে। লবণ এবং পেঁয়াজের মতো কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সংকটেই যে দেশে নাস্তানাবুদ হতে হয় সেখানে বেঁচে থাকার জন্য অনিবার্য খাদ্য-পণ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। অধিক মুনাফা লাভের আশায় যাতে পণ্য মজুদ করতে না পারে সে জন্য বাজার মনিটর করা প্রয়োজন রয়েছে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে অহেতুক বাধার সৃষ্টি হলে কৃষক পণ্য উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবে। অন্যদিকে বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। বিশেষ ব্যবস্থায় বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা চালু রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় খেলার মাঠে সাপ্তাহিক হাট-বাজারগুলোকে বিস্তৃত করা যেতে পারে।
খাদ্য সংকটে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি বুভুক্ষু মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। এ ধরনের দুর্নীতি কেউ করলে দ্রুত কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে তা দৃশ্যমান করতে হবে। বৈশ্বিক এই সংকটে আর একবার ১৯৭১ সালের মতো দেশপ্রেমের চেতনাই পারে বাংলাদেশকে করোনার অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে।
[email protected]
সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×