শিক্ষায় স্বপ্নের উন্নয়ন ও বাস্তবতা
×
এম আর খায়রুল উমাম
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০
সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশও আজ মহামারির এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। এমন ক্রান্তিকালে শিক্ষাব্যবস্থা বিষয়ক আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক লাগতেই পারে। কিন্তু এ কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষের নানাবিধ অবিবেচনাপ্রসূত, অবিজ্ঞানমনস্ক কর্মকাণ্ড আর আচরণ পঞ্চাশে পা দিতে যাওয়া আমাদের দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার মানকে অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। জানি, এ কঠিন সময় কেটে যাবে। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতের পানে। অসময়ের এ দর্পণে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের জন্য আমরা যেন বাস্তবসম্মত, যুগোপযোগী, কূপমণ্ডূকতামুক্ত শিক্ষা কাঠামো দাঁড় করাতে পারি- সে প্রত্যাশায় নিজেদের বর্তমান পশ্চাৎপদতার দিকগুলো তুলে ধরে প্রত্যাশার জানান দিতেই এ নিবন্ধের অবতারণা।
আমাদের শিক্ষার্থীদের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় তৃতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান এই ছয়টি বই পড়ানো হয়ে থাকে। একবার তৃতীয় শ্রেণির চার পৃষ্ঠার ইংরেজি প্রশ্নপত্র দেখেছিলাম। তৃতীয় শ্রেণির এ ধরনের প্রশ্নপত্র এবং পাঠ্যসূচি পাশাপাশি রেখে যদি দেখা যায় তাহলে যে কেউ অনুমান করতে পারবেন, একজন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীকে কী পরিমাণ লেখাপড়া করতে হয়। অবস্থাদৃষ্টে সাধারণ মানুষের মনে হতেই পারে, এসব বিষয়ে তৃতীয় শ্রেণির পর আর পড়ার প্রয়োজনই হবে না। এখন সাধারণ মানুষের যা মনে হতে পারে, তা তো আর দায়িত্ববানদের মনে হতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলছেই। সরকারিভাবে শতভাগ পাসের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ চলমান। ইতোমধ্যে বছরের তিন ভাগের এক ভাগ শেষ। ২০২১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকের নতুন বিন্যাস আসবে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নতুন বোতলে পুরোনো মদই থাকবে।
আরও একটি ভয়ংকর বিষয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ধারাকে প্রত্যাখ্যান করে মৌলবাদী ধারাকে পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করা হচ্ছে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশের নাগরিকদের ইসলামি মানসিকতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। আর বর্তমান সময়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছি, পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তকে নাস্তিক্যবাদী ও হিন্দুত্ববাদী কবিতা ও প্রবন্ধের তালিকা গণমাধ্যমে বিবৃতি আকারে পাঠাচ্ছে। পাঠ্যপুস্তক হাতে পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গোটা জাতি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত তালিকার সবক'টি কবিতা ও প্রবন্ধ বাদ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িক এ শক্তিকে উৎসাহিত করতে যেসব গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, তাও বাদ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ জানে না, আমরা কোন মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনি আর কোন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করি? তবে এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী জাতিকে জানিয়েছিলেন প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি এত দেরিতে এসেছে, তখন আর সেগুলো পড়ে দেখার সময় ছিল না। পাণ্ডুলিপি আসামাত্রই প্রেসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আসলে দায়িত্ববানরা দেশ ও জাতির কল্যাণে এভাবে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে বলেই আমরা সংবিধান, শিক্ষানীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পাশে সরিয়ে রেখে শিক্ষাব্যবস্থাকে হেফাজতিদের হেফাজতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি। আজ সাধারণ মানুষের কাছে পরিস্কার হওয়া খুব দরকার, মুক্তিযুদ্ধ যে আদর্শ ও স্পিরিট নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল, তা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এটিই ফলপ্রসূ প্রক্রিয়া কিনা?
সাধারণ জনগণের জন্য জাতীয় শিক্ষানীতির সাধারণ উদ্দেশ্য হিসেবে বলে রাখা হয়েছে- 'দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনের জন্য শিক্ষাকে সৃজনধর্মী, প্রয়োগমুখী ও উৎপাদন সহায়ক করে তোলা। শিক্ষার্থীদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে সহায়তা প্রদান করা।' আবার দেশের সপ্তম পরিকল্পনায় মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আর কী চাই? সাধারণ জনগণের জন্য কাজির খাতায় সবকিছুরই ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে শিক্ষার উন্নয়নে স্বপ্নে পাওয়া ব্যবস্থাপনা। মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে ৫১টা অর্জনের ফিরিস্তি প্রকাশ করে বসে আছে। এ অর্জনের তালিকায় বলা আছে, 'মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনা করে পুষ্টিকর খাদ্য তালিকা সব অভিভাবকের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।' শিক্ষার্থীদের আমিষের ঘাটতি মেটাতে পরিপত্র জারি করা হয়েছে। অবস্থা এমন যেন, পুষ্টিকর খাদ্যের তালিকা অভিভাবকদের হাতে পৌঁছালেই শিক্ষার্থীদের পুষ্টির ঘাটতি মিটে যাবে। স্বপ্নের শিক্ষা উন্নয়নেও আজ ভেজাল ঢুকে গেছে।
বাংলাদেশে সবার জন্য সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তচিন্তা বিকাশের শিক্ষার জন্য বাংলা মাধ্যমে অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সুবিধাভোগী শ্রেণি সৃষ্টির জন্য ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না। অর্থ লুণ্ঠনের অবাধ ধারায় সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিনতাই হয়ে গেছে। বৈষম্য আকাশছোঁয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা আশা করা যায় না। রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রে সংকটের প্রভাব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর পড়েছে। আজ দেশের সাদা কালারের মানুষেরা কেউ মনেই করতে পারছে না, তারা এ দেশের অনাহারি মানুষের ঘামের অর্থে প্রতিপালিত। দায়িত্ব, কর্তব্য এড়িয়ে মানুষের অভাব মোচন ও দাবি পূরণের মনভোলানো, চোখজুড়ানো প্রচারণায় ফাঁকির ফাঁক থেকেই যাচ্ছে।
সর্বসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জাতীয় আয়ের ৫ দশমিক ৭ ভাগে উন্নীত করার দাবি ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সময়কাল থেকে সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ বাড়ানো তো দূরের কথা, দিনে দিনে শতাংশের হারে আজ তা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষা খাতে আরও রয়েছে বণ্টনে সমস্যা। প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থীর জন্য ২০০ টাকা ব্যয় করা হলে উচ্চশিক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর জন্য ব্যয় করা হয় ২৫ হাজার। আবার মাধ্যমিকের সাধারণ শিক্ষার একজন শিক্ষার্থীর জন্য যে ব্যয় করা হয়, তার চাইতে বেশি ব্যয় হয় মাদ্রাসায়। এহেন পরিস্থিতিতে আপাতত প্রাথমিকের ব্যয় দ্বিগুণ করা প্রয়োজন।
মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা করে মেধাবীদের জন্য উচ্চশিক্ষা প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে কোনো শিক্ষার্থীর কোনো স্তরই যেন প্রান্তিক শিক্ষা না হয়। সকল স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুয়ায়ী শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞান, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে জনগণকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। গণমুখী, বিজ্ঞানমুখী বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য শ্রেণি ও স্তরভিত্তিক উপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষা জাতির মূল ভিত্তি। সেখানেই পশ্চাৎপদতা থেকে গেলে এগিয়ে যাওয়ার সব পথই রুদ্ধ হয়ে যাবে।'
সাবেক সভাপতি, ইনাস্টটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ
আমাদের শিক্ষার্থীদের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় তৃতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান এই ছয়টি বই পড়ানো হয়ে থাকে। একবার তৃতীয় শ্রেণির চার পৃষ্ঠার ইংরেজি প্রশ্নপত্র দেখেছিলাম। তৃতীয় শ্রেণির এ ধরনের প্রশ্নপত্র এবং পাঠ্যসূচি পাশাপাশি রেখে যদি দেখা যায় তাহলে যে কেউ অনুমান করতে পারবেন, একজন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীকে কী পরিমাণ লেখাপড়া করতে হয়। অবস্থাদৃষ্টে সাধারণ মানুষের মনে হতেই পারে, এসব বিষয়ে তৃতীয় শ্রেণির পর আর পড়ার প্রয়োজনই হবে না। এখন সাধারণ মানুষের যা মনে হতে পারে, তা তো আর দায়িত্ববানদের মনে হতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলছেই। সরকারিভাবে শতভাগ পাসের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ চলমান। ইতোমধ্যে বছরের তিন ভাগের এক ভাগ শেষ। ২০২১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকের নতুন বিন্যাস আসবে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নতুন বোতলে পুরোনো মদই থাকবে।
আরও একটি ভয়ংকর বিষয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ধারাকে প্রত্যাখ্যান করে মৌলবাদী ধারাকে পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করা হচ্ছে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশের নাগরিকদের ইসলামি মানসিকতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। আর বর্তমান সময়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছি, পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তকে নাস্তিক্যবাদী ও হিন্দুত্ববাদী কবিতা ও প্রবন্ধের তালিকা গণমাধ্যমে বিবৃতি আকারে পাঠাচ্ছে। পাঠ্যপুস্তক হাতে পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গোটা জাতি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত তালিকার সবক'টি কবিতা ও প্রবন্ধ বাদ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িক এ শক্তিকে উৎসাহিত করতে যেসব গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, তাও বাদ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ জানে না, আমরা কোন মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনি আর কোন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করি? তবে এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী জাতিকে জানিয়েছিলেন প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি এত দেরিতে এসেছে, তখন আর সেগুলো পড়ে দেখার সময় ছিল না। পাণ্ডুলিপি আসামাত্রই প্রেসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আসলে দায়িত্ববানরা দেশ ও জাতির কল্যাণে এভাবে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে বলেই আমরা সংবিধান, শিক্ষানীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পাশে সরিয়ে রেখে শিক্ষাব্যবস্থাকে হেফাজতিদের হেফাজতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি। আজ সাধারণ মানুষের কাছে পরিস্কার হওয়া খুব দরকার, মুক্তিযুদ্ধ যে আদর্শ ও স্পিরিট নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল, তা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এটিই ফলপ্রসূ প্রক্রিয়া কিনা?
সাধারণ জনগণের জন্য জাতীয় শিক্ষানীতির সাধারণ উদ্দেশ্য হিসেবে বলে রাখা হয়েছে- 'দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনের জন্য শিক্ষাকে সৃজনধর্মী, প্রয়োগমুখী ও উৎপাদন সহায়ক করে তোলা। শিক্ষার্থীদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে সহায়তা প্রদান করা।' আবার দেশের সপ্তম পরিকল্পনায় মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আর কী চাই? সাধারণ জনগণের জন্য কাজির খাতায় সবকিছুরই ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে শিক্ষার উন্নয়নে স্বপ্নে পাওয়া ব্যবস্থাপনা। মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে ৫১টা অর্জনের ফিরিস্তি প্রকাশ করে বসে আছে। এ অর্জনের তালিকায় বলা আছে, 'মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনা করে পুষ্টিকর খাদ্য তালিকা সব অভিভাবকের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।' শিক্ষার্থীদের আমিষের ঘাটতি মেটাতে পরিপত্র জারি করা হয়েছে। অবস্থা এমন যেন, পুষ্টিকর খাদ্যের তালিকা অভিভাবকদের হাতে পৌঁছালেই শিক্ষার্থীদের পুষ্টির ঘাটতি মিটে যাবে। স্বপ্নের শিক্ষা উন্নয়নেও আজ ভেজাল ঢুকে গেছে।
বাংলাদেশে সবার জন্য সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তচিন্তা বিকাশের শিক্ষার জন্য বাংলা মাধ্যমে অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সুবিধাভোগী শ্রেণি সৃষ্টির জন্য ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না। অর্থ লুণ্ঠনের অবাধ ধারায় সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিনতাই হয়ে গেছে। বৈষম্য আকাশছোঁয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা আশা করা যায় না। রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রে সংকটের প্রভাব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর পড়েছে। আজ দেশের সাদা কালারের মানুষেরা কেউ মনেই করতে পারছে না, তারা এ দেশের অনাহারি মানুষের ঘামের অর্থে প্রতিপালিত। দায়িত্ব, কর্তব্য এড়িয়ে মানুষের অভাব মোচন ও দাবি পূরণের মনভোলানো, চোখজুড়ানো প্রচারণায় ফাঁকির ফাঁক থেকেই যাচ্ছে।
সর্বসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জাতীয় আয়ের ৫ দশমিক ৭ ভাগে উন্নীত করার দাবি ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সময়কাল থেকে সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ বাড়ানো তো দূরের কথা, দিনে দিনে শতাংশের হারে আজ তা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষা খাতে আরও রয়েছে বণ্টনে সমস্যা। প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থীর জন্য ২০০ টাকা ব্যয় করা হলে উচ্চশিক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর জন্য ব্যয় করা হয় ২৫ হাজার। আবার মাধ্যমিকের সাধারণ শিক্ষার একজন শিক্ষার্থীর জন্য যে ব্যয় করা হয়, তার চাইতে বেশি ব্যয় হয় মাদ্রাসায়। এহেন পরিস্থিতিতে আপাতত প্রাথমিকের ব্যয় দ্বিগুণ করা প্রয়োজন।
মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা করে মেধাবীদের জন্য উচ্চশিক্ষা প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে কোনো শিক্ষার্থীর কোনো স্তরই যেন প্রান্তিক শিক্ষা না হয়। সকল স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুয়ায়ী শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞান, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে জনগণকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। গণমুখী, বিজ্ঞানমুখী বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য শ্রেণি ও স্তরভিত্তিক উপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষা জাতির মূল ভিত্তি। সেখানেই পশ্চাৎপদতা থেকে গেলে এগিয়ে যাওয়ার সব পথই রুদ্ধ হয়ে যাবে।'
সাবেক সভাপতি, ইনাস্টটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ
- বিষয় :
- শিক্ষা