ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

মৃত্যুমিছিল কি নতুন বিশ্বের সূচনা?

মৃত্যুমিছিল কি নতুন বিশ্বের সূচনা?
×

হারুন হাবীব

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে ১৯১৯-২০ সালে সৈনিকদের শরীর থেকে সংক্রমিত স্প্যানিস ফ্লু কেড়ে নিয়েছে অগণিত মানুষের জীবন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ লাখো মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়েছে, লাখো জীবন হরণ করেছে সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষ। আমেরিকান পারমাণবিক বোমা ধ্বংস করেছে জাপানের নাগাসাকি, হিরোশিমা। ভিয়েতনামের জনপদ অঙ্গার হয়েছে নাপাম বোমায়। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড প্রকম্পিত হয়েছে নাজি বাহিনীর নির্বিচার বোমা বর্ষণে। হিটলার খুন করেছে হাজারো ইহুদি। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী চালিয়েছে নির্বিচার গণহত্যা। কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা এবং ঠেকানোর নামে লাখো মানুষ খুন হয়েছে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে। ইরাকের মাটি রক্তাক্ত হয়েছে মার্কিন আগ্রাসনে। রক্তাক্ত হচ্ছে আজও সিরিয়া ও ইয়েমেনের মাটি। তবে আগেরকার ট্র্যাজেডিগুলো আবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট ভূসীমায়। কিন্তু কভিড-১৯ বা করোনা দানবের থাবা বিস্তৃত হয়েছে সর্বত্র : এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকায়।
পশ্চিমি গণতান্ত্রিক বিশ্বে প্রায় সরাসরি চীনকে দায়ী করা হচ্ছে মরণব্যাধিটি বৈশ্বিক দুর্যোগে পরিণত হওয়ার কারণে। তার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রিয়েসাসকে। চীন-ঘনিষ্ঠ সাবেক এই ইথিওপীয় মন্ত্রীর যোগসাজশে, অভিযোগ করা হচ্ছে, এই রোগের প্রাথমিক ভয়াবহতা লুকানো হয়েছে এবং এর পরিকল্পিত বিশ্ব বিস্তার ঘটানো হয়েছে। আরও বলা হচ্ছে, মূলত কাজটি করা হয়েছে চীনের বিশ্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় তার দেশের অনুদান বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন। অভিযোগ যাই থাক, বিদ্যমান বিশ্ব মহামারির প্রেক্ষাপটে এমন একটি পদক্ষেপ মার্কিন মিত্রদের কাছেও সঠিক বলে বিবেচিত হয়নি। জাপান এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশে দাঁড়ানোর জন্য ধনী দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে। কারণ মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকার সংস্থাটির বার্ষিক বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তহবিল দান করে থাকে।
যা হোক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে চীনের 'যোগসাজশের' অভিযোগ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদ বা গণমাধ্যম যতটা উচ্চকণ্ঠ, অন্যরা ঠিক ততটা নয়। তাইওয়ান অভিযোগ করেছে, ডিসেম্বরের ৩১ (২০১৯) তারিখে তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সংক্রমণের খবরটি জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে চীন মৃতের যে পরিসংখ্যান দিয়েছে তা সঠিক নয়, এমনটাও মনে করছে পশ্চিমি বিশ্ব, যদিও চীন উহানের মৃতের সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি বলে নতুন ঘোষণা দিয়েছে। পশ্চিমি বিশ্ব প্রায় এক কণ্ঠেই বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যদি রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য গোপন না করত।
অন্যদিকে চীন ও তার ঘনিষ্ঠ মহল এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ করে চলেছে। বরং তারা আঙুল তুলেছে একক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। চীনের সরকারি গণমাধ্যম পশ্চিমি সমালোচনার কড়া জবাব দিয়ে বলেছে, বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে নিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো সাম্রাজ্যবাদী অভিলাষ রাখে না চীন। বিদ্যমান ভয়াবহ সংকটে চীন যেভাবে বিশ্বের বিপন্ন দেশগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে, তারা দাবি করছে, তাতে বিশ্ববাসী বিলক্ষণ উপলব্ধি করছে, বিশ্ব এখন সত্যিকার অর্থেই কার আধিপত্যে আছে। চীনের আন্তর্জাতিক পত্রিকা 'গ্লোবাল টাইমস'-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় চীনের এই মতটি সগৌরবে প্রচারিত হয়েছে।
সত্যিকার অর্থেই মানবসভ্যতা আজ বিপন্ন। অতএব এসব যদি নিছকই 'ব্লেম গেম' হয়ে থাকে তাহলে তা বন্ধ হওয়া উচিত। কারণ এ সময়ের একমাত্র দাবি, বিশ্ববাসীর পারস্পরিক সহযোগিতা, পারস্পরিক দোষারোপ নয়। এরপরও বলতে হয়, দিন যত যাচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ট্রেডোস ততই দ্রুত কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। দাবি জোরালো হচ্ছে তার পদত্যাগের।
চীনে রোগটির প্রথম সংক্রমণ ঘটে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। অভিযোগ হচ্ছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার পরও এ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি গোপন রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটররা বলছেন, ডব্লিউএইচও 'চীনা মিথ্যাচার' নিয়ে ক্রমাগতভাবে বিশ্ববাসীর সঙ্গে 'কৌতুক' করে গেছে, ফলে রোগটি সারাবিশ্বে ছড়াবার সুযোগ পেয়েছে। জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রী তারো এসো কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন বিশ্ব জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যর্থতা এবং বেইজিংয়ের 'স্বার্থ রক্ষার' জন্য ডব্লিউএইচওর নামকে 'চীনা স্বাস্থ্য সংস্থা' রাখা হোক।
পশ্চিমের অনেক সরকারি সূত্র বলেছে, যে মারাত্মক ভাইরাসটি প্রথমে উহানের জীবজন্তুর বাজার থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল, তা চীনা শহরের একটি পরীক্ষাগার থেকে আসে। যদিও এর 'জেনেটিক' তত্ত্ব এখনও অজানা তবু অনেকেই প্রায় নিশ্চিত যে, এটি প্রাণীতে উদ্ভূত হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে একটি চীনা পরীক্ষাগার থেকে বেরিয়ে যে ভাইরাসটি মানুষের জীবননাশের কারণ হয়েছিল তার নাম 'সার্স' বা গুরুতর তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসের সিন্ড্রোম।
চীন অবশ্য পশ্চিমি অভিযোগগুলোর একটিও আমলে নেয়নি। বরং তারা দাবি করে চলেছে, সংকটের জন্য তারা দোষী নয়, দায়ী নয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা তার প্রধানও এবং এ পরিস্থিতিতে, নিজের সংকট কাটিয়ে উঠে চীন যা করছে তার জন্য বিশ্বকে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। দেশটি আরও বলেছে, আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলো যদি সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিত, যেভাবে তারা এবং আরও কিছু দেশ নিয়েছে, তাহলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি ঠেকানো যেত।
বিগত কয়েক দশকে চীনের অর্থনীতির অগ্রগতি এবং প্রযুক্তিগত বিকাশ বিস্ময়কর। পশ্চিমি বিশ্বের বেশিরভাগ নিত্যব্যবহার্য পণ্যের 'আউট সোর্সিং' করে চীন। বিশ্বের অর্ধেক গাড়ি, তার ৮০ শতাংশ কম্পিউটার এবং ৯০ শতাংশ মোবাইল ফোন নির্মিত হয় চীনে। বহু পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই বিশ্ব নির্ভরতা চীনকে একদিকে যেমন বিশ্ব কর্তৃত্বের অংশীদারিত্ব দিয়েছে, একই সঙ্গে ঐতিহ্যগত পরাশক্তির দুর্বলতাকে পরিস্ম্ফুটিত করেছে।
অবধারিতভাবেই বলা যায়, চীনের রাজনৈতিক মডেল হয়তো বিশ্ব সম্মান অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু তার প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তির কাছে বহু দেশ, বিশেষত পশ্চিমি দুনিয়া, নিজেকে সমর্পিত করেছে। ভোগবাদিতা, আত্মতুষ্টি বা অন্তর্নিহিত সংকটের কারণে তারা চীনের ওপর ক্রমান্বয়ে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সুরক্ষা প্রয়োজনের কৌশলগত কার্যক্রম হাতে নিতে ব্যর্থ হয়। আর এই ব্যর্থতার চেহারা পরিস্কার হয়ে ওঠে কভিড-১৯ মোকাবিলায়।
কবে শেষ হবে করোনার এই মহাযুদ্ধ, কবে সভ্যতা বিনাশী ঘাতক খাঁচায় বন্ধ হবে- এসবের কিছুই বলা যাবে না নিশ্চিত করে। তবে এটি নিশ্চিত যে, একদিন এই তাণ্ডব বন্ধ হবে, যারা বেঁচে থাকবেন তারা নিশ্চয়ই শবস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আবারও জীবনের গান গাইবেন। গড়ে উঠবে মানুষের নতুন সভ্যতা।
অনস্বীকার্য যে, বর্তমান সংকটের পর বিদ্যমান বিশ্ব ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। সেই যে নতুন বিশ্ব, প্রশ্ন হচ্ছে, সে কি আগের মতো থাকবে? আমার বিশ্বাস, যে পৃথিবী আসবে তা হবে নতুনের, অনেক পুরোনো ধসে পড়বে, অনেক বিশ্বাস, অনেক ভয়, অনেক অভিলাষ নিক্ষিপ্ত হবে ভাগাড়ে। মানুষ এগিয়ে যাবে নতুন অভিজ্ঞানে, সেই জাগরণ হবে নতুন আশীর্বাদ।
তবে বিশ্বকে খুঁজে পেতে হবে অনেক প্রশ্নের উত্তর। বিশ্বকে জানতে হবে ভয়ংকর এই ঘাতকের কী আসল পরিচয়, তার জন্মকাহিনি কিংবা বিস্তার রহস্য? জানতে হবে, রোগটি বাদুড় নাকি অন্য কোনো বন্য প্রাণী থেকে উৎসারিত, নাকি আধিপত্য বিলাসীদের কোনো গবেষণাগারে এর জন্ম? নতুন পৃথিবীর জন্য এসবের উত্তর জানা জরুরি।
না, এই বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বকে আগের মতো রাখবে না। নতুন বোধ ও বিশ্বাসে সিক্ত হবে মানুষ। জেগে উঠবে জাতীয়তাবাদ, ঘটবে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের নতুন অভিজ্ঞান, যা বিশ্বায়নের যুগকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে নিয়ন্ত্রিত হবে পুরোনো ও নতুন পরাশক্তির দাপট, সম্প্রসারিত হবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সংকোচিত হবে অন্ধ বা উগ্রধর্মবাদ।
অতি আশাবাদীরা বলছেন, এই যুদ্ধ সমাজতন্ত্রের বুনিয়াদকে শক্ত করবে, আবার কেউ বলছেন মুক্ত গণতান্ত্রিক পৃথিবীর বুনিয়াদ আরও শক্তিশালী হবে। মোট কথা, যা ঘটবে তা বলে দেবে কেবল সময়। আমরা যা চাই তা সুন্দর, বাসযোগ্য এক পৃথিবী। কবি শঙ্খ ঘোষের একটি কবিতা মনে পড়ে, প্রায় পঁচাত্তর বছর আগে লেখা, তার একটি প্রার্থনা : 'আমাদের দেখা হোক মহামারী শেষে/জিতে ফিরে এসে।/আমাদের দেখা হোক জীবাণু ঘুমালে/আমাদের দেখা হোক সবুজ সকালে।'
লেখক, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×