স্বপ্ন কারিগর জামিলুর রেজা চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম আবেদ
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০
বটবৃক্ষের মতো একজন মানুষ। বয়সকে হার মানিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে যুক্ত রেখেছেন আঁধারভেদী আলোর দুয়ার খুলতে। একাধারে খ্যাতিমান প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবাদী তিনি। স্বপ্ন দেখান তরুণদের। স্বপ্ন দেখেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বিজ্ঞানমনস্ক সমাজের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এই মানুষটি জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততাও কম নয়। কিন্তু তারপরও স্বপ্নের সেই সমাজ গড়তে, তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানে আগ্রহী করতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজ্ঞান বিতর্ক, গণিত অলিম্পিয়াডসহ নানা রকমের বিজ্ঞানভিত্তিক অলিম্পিয়াড ও উৎসবের। কাজ করছেন পাঠ্যবইয়ের মান উন্নয়নেও।
আমাদের ছোটবেলা বা কৈশোরে অনেক বন্ধু-বান্ধব ছিল। আমরা আড্ডা দিতাম, খেলাধুলা করতাম কিন্তু এখন যেটা ঘটেছে, দিন-রাত তারা স্ট্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। পাবলিক পেল্গসেও আমি দেখি তারা স্ট্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ফলে দুর্ঘটনাও ঘটছে। এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটা ভাবতে বলি। এখান থেকে কীভাবে তরুণ সমাজকে বের করে আনা যায়, সে বিষয়েও ভাবতে হবে।্ একটু থেমে আবার শুরু করেন, ্আমাদের সময়ের তুলনায় বর্তমান তরুণ সমাজের মধ্যে যে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে, এখানে নগর পরিকল্পনাবিদদেরও ভূমিকা রয়েছে। তরুণদের খেলাধুলা, বিনোদন ইত্যাদির কোনো জায়গা নেই। খেলার মাঠ নেই, পার্ক নেই। থাকলেও দখল হয়ে যাচ্ছে; ভিন্ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে। আগে ক্লাব ছিল, লাইব্রেরি ছিল। এখন সেগুলোও হারিয়ে গেছে। বই পড়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। বই পড়ে সমাজকে বুঝতে হবে। কিছুটা আবেগপ্রবণ দেখায় তাকে। সঙ্গত কারণেই প্রসঙ্গ পাল্টাই, নিজেকে কীভাবে দেখেন? মৃদু কিন্তু ঋজু ভঙ্গিমায় বললেন, একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে।
জামিলুর রেজা চৌধুরীর এই বোধটি গড়ে উঠেছে পরিবার থেকেই। বাবা আবিদ রেজা চৌধুরী ছিলেন পুর প্রকৌশলী। এ অঞ্চলের প্রথম দিকে প্রকৌশলীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। জানালেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। সিলেটের জাফলং সীমান্তের ভারতীয় অংশে তিন পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে যে ঝুলন্ত সেতুটি চোখে পড়ে, ১৯৩০ সালে সেটি বাবাই তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল সিলেট অঞ্চলের প্রথম ঝুলন্ত সেতু। পিতার গৌরবে গর্বিত পুত্রের মুখ খুব সহজেই চোখে পড়ে। মা হায়াতুন্নেছা চৌধুরীর স্নেহ আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে জানা- অন্যের সঙ্গে কী করে মিশতে হয়, নিজের প্রাপ্যটাকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে কী করে আনন্দ পেতে হয়।
বাবা ও ভাইসহ পরিবারের ১২-১৩ জন সদস্য প্রকৌশলী। এ রকম একটা পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠার কারণেই হয়তো মনের অজান্তে প্রকৌশলী হতে চেয়েছি- বলছিলেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকায় ১৯৪৩ সালের ১৫ নভেম্বর সকালে জন্ম নেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বাবার বদলি সূত্রে তিন বছর বয়সে আসামের জোড়হাটে চলে যান। যদিও ঝাপসা কিন্তু জোড়হাটের কিছু স্মৃতি আমার আছে। একতলা বাংলো বাড়ি, সামনে খোলা জায়গা। পাশের বাসায় আমার সমবয়সী একটা ছেলে ছিল। তার ছিল একটা খেলনা গাড়ি। মা-বাবাকে বলার পর গাড়ি পাইনি, পেলাম একটা ট্রাই সাইকেল। আমি বাসার সামনে ওটা চালাতাম।্ সেই সময় দেশভাগের দামামা বেজে ওঠে।
১৯৪৭ সালের আগস্টে পরিবার সিলেট ফিরে আসে। কিছুদিন পর বাবা বদলি হন। ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে একবারে ক্লাস ফোরে শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা। দুই বছর পর বাবার আবারও বদলি। ঢাকায় এসে প্রথমে প্রিয়নাথ হাইস্কুলে (নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল) ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে ক্লাস সেভেনে সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ভর্তি হন। আমি কখনোই খুব পড়ূয়া ছাত্র ছিলাম না। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা পছন্দ করতাম। সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় ফুটবলে ইন্টার ক্লাস চ্যাম্পিয়ন হই আমরা। উপরের ক্লাসের ছেলেদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন। সে কী আনন্দ!
পুরস্কার হিসেবে পাই ৬০ টাকা। দলের সবাই মিলে কালাচাঁদ গন্ধমানিকের মিষ্টির দোকানে যাই মিষ্টি খেতে।্ আর বাকি টাকা শেষ করতে ছুটে যান সিনেমা হলে। সেই কৈশোর থেকেই খেলাধুলার পাশাপাশি সিনেমা দেখার ঝোঁকটা ছিল। ্বিশেষ করে উত্তম-সুচিত্রার কোনো ছবি এলে না দেখে থাকতাম না। হল থেকে বের হয়ে আসার সময় হলের সামনে থেকে কিনে নিয়ে আসতাম সিনেমার গানের বই।
১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান অধিকার করে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। ভর্তি হন আহছানউলল্গাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। সেখানেও বিকেলে খেলাধুলা করে সন্ধ্যায় বন্ধুদের পড়া দেখিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরতেন। ১৯৬৩ সালে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। রেজাল্টের পরদিন বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি সরাসরি ক্লাস নিতে পাঠিয়ে দেন। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই শুরু হয় শিক্ষক জীবন। তারপর ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ। ১৯৬৪ সালে বৃত্তি নিয়ে চলে যান ইংল্যান্ডে। ১৯৬৮ সালে পিএইচডি করেন। বাইরের দেশে থেকে যাওয়ার একাধিক প্রস্তাব থাকলেও পিএইচডি শেষ করে ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে তিনি বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সাল পর্যন্ত বুয়েটে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তারপর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য।
আন্তর্জাতিকভাবে আমরা যাঁদের নিয়ে গর্ব করতে পারি অবশ্যই ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী তাদের অন্যতম। উঁচু ইমারতের শিয়ার ওয়াল ডিজাইনের সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। পদ্ধতিটি ্কুল অ্যান্ড চৌধুরী মেথড নামে পরিচিত। উঁচু ইমারত ডিজাইনে কম্পিউটার জনপ্রিয় না হওয়া পর্যন্ত এ পদ্ধতিই সারাবিশ্বে ব্যবহার হতো। এ ছাড়া ২০০৬ সাল থেকে পদ্মা সেতুর ডিজাইন ও নির্মাণে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর দেশীয় বিশেষজ্ঞ দলের তিনি ছিলেন চেয়ারম্যান। বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার কর্মসূচির টিম লিডার হিসেবে ১৯৯৩ সালে তিনি উপকূলীয় এলাকায় সাইক্লোন শেল্টারের মাস্টারপল্গ্যান তৈরি করেন। ঢাকার নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলের প্রধানের দায়িত্বসহ বহু দায়িত্ব পালন করছেন। এমন অসংখ্য সরকারি- বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। অর্জন করেছেন একুশে পদকসহ জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান।
চলতি বছর ১ মার্চ জামিলুর রেজা চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশ হয় সমকালের প্রিয় পদরেখা। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা এর সংক্ষেপিত ভাষ্য পুনর্মুদ্রণ করছি। পূর্ণ ভাষ্য পড়ুন
সমকাল অনলাইনে
সাংবাদিক
- বিষয় :
- জামিলুর রেজা চৌধুরী
