ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

ইফতার পার্টির অর্থে ত্রাণ

বিপদের দিনে বাহুল্য পরিত্যাজ্য

বিপদের দিনে বাহুল্য পরিত্যাজ্য
×

ধর্মমতে রমজান যদিও সংযম ও ত্যাগের মাস, সামাজিকভাবে আমরা এই মাসে ভোগ ও বাহুল্যই বেশি দেখে থাকি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও দুর্মূল্যের পেছনে একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী দায়ী সন্

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

ধর্মমতে রমজান যদিও সংযম ও ত্যাগের মাস, সামাজিকভাবে আমরা এই মাসে ভোগ ও বাহুল্যই বেশি দেখে থাকি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও দুর্মূল্যের পেছনে একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী দায়ী সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে একশ্রেণির মানুষের মাত্রাতিরিক্ত ভোগও যে দায়ী, অস্বীকার করা যাবে না। এমন নজির আমাদের চারপাশে বিরল নয় যে, নিছক লোক দেখানোর জন্য ব্যাপক ইফতারি বা সেহরির আয়োজন করা হয়েছে। আগে যদিও এই প্রবণতা কেবল 'সামাজিক' ছিল, গত এক-দুই দশকে তা ক্রমেই হয়ে উঠেছে 'রাজনৈতিক'। এমনকি, কোনো রাজনৈতিক দল তাদের ইফতার আয়োজনে কাকে আমন্ত্রণ জানাবে বা জানাবে না, তারও রয়েছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। দেখেশুনে এ প্রশ্ন অসঙ্গত হতে পারে না যে, এখানে কোথায় সংযমের সংকল্প আর কোথায় ত্যাগের মহিমা?
এবার অবশ্য করোনা পরিস্থিতিতে দেশব্যাপীই ইফতার মাহফিল বা 'ইফতার পার্টি' আয়োজন নিষিদ্ধকরা হয়েছে। বস্তুত প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এর বিকল্পও ছিল না। কিন্তু আমরা জানি, প্রতিবছর ইফতারি উপলক্ষে আয়োজন যখন প্রায় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পক্ষলো এজন্য আগে থেকেই অর্থ বরাদ্দও করে রাখে। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই অর্থের সদ্ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন বিশিষ্টজন। তারা যথার্থই বলেছেন যে, এই অর্থ যদি করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন নিম্নবিত্তদের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে দেওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি মোকাবিলা সবার জন্য সহজ হবে। একই সঙ্গে চর্চা হবে সত্যিকারের সংযম। আমরা আনন্দিত যে, এমন মত প্রকাশকারীদের মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতারাও রয়েছেন। আমরা চাই, বিশিষ্টজনের এই আহ্বান সংশ্নিষ্টরা আমলে নেবেন।
রমজান মাস উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সামাজিক আয়োজন ও অনুষ্ঠান নিশ্চয়ই স্বাগত। ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকে দরিদ্র রোজাদারদের ইফতার বা সেহরি করাতে পারেন। এই মাসে ব্যক্তিগতভাবে দান-খয়রাতও করে থাকেন অনেকে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ করোনার অভিঘাতে নাজুক জনগোষ্ঠীর জন্য বয়ে আনবে বাড়তি স্বস্তি। অস্বীকারের অবকাশ নেই যে- দেশের দারিদ্র্য চিত্র বহুলাংশে উন্নীত হওয়া সত্ত্বেও এখনও আধপেটা ইফতার বা সেহরি খেয়ে রোজা রাখা মানুষের সংখ্যা এখনও কম নয়। নিম্নবিত্ত বা খেটে খাওয়া অনেক পরিবারের কাছেই রমজান উপলক্ষে সামান্য উন্নত খাদ্যসামগ্রী ক্রয় কঠিন হয়ে পড়ে। ইফতার বা সেহরি উপলক্ষে সমাজের বিত্তবান শ্রেণি যদি বাজার থেকে অপরিমিত ক্রয়ে লাগাম টানে, তাহলে বিত্তহীন নাগরিকদের জন্য বাজারে যাওয়া সহজ হবে। লোক দেখানোর জন্য ইফতারের বড় আয়োজন পরিহার সম্ভব হলে তার পরোক্ষ অবদান আরও অনেক ক্ষেত্রেই পড়বে।
আমরা দেখছি, ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বিশিষ্টজনের আহ্বানকে ইতিবাচকভাবে নেওয়া হয়েছে। এখন আমরা কাজে এর প্রতিফলন দেখতে চাইব। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি যদি ইফতারের বাহুল্য আয়োজন থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থ আলাদাভাবে উল্লেখ করে ত্রাণ হিসেবে দিতে পারেন, তার তাৎপর্য হবে সুদূরপ্রসারী। এটাও হতে পারে, ইফতার বা সেহরি পার্টির জন্য বরাদ্দ অর্থে ইফতার বা সেহরি সামগ্রীই ক্রয় করা হলো; কিন্তু সমাজের উচ্চবিত্তদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ভূরিভোজের বদলে খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হলো। আমরা জানি, রাজনৈতিক দল ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, জেলা ও বিভাগীয় সমিতি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে থাকে। তবে সেগুলোতে অতিথি হিসেবে থাকেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই। খোদ রাজনৈতিক দলগুলো যদি ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে অন্যান্য সংগঠন ও সমিতিও একই পথ অনুসরণ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আমরা চাই, বিপদের দিনে বাহুল্য পরিত্যাজ্য হোক। করোনাভাইরাসের এই দিনে কেবল ইফতার মাহফিল নয়, সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানেই সংযম ও ত্যাগ প্রতিফলিত হোক। এমনকি কেবল করোনার দিনে নয়, এই চর্চা আমরা বছরের অন্যান্য সময়ও করতে পারি। সবসমই আড়ম্বর পরিহার করে সেই অর্থ দরিদ্র মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করতে পারি। আমরা জানি, সরকারের তরফে বিভিন্নভাবে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গোটা দেশেই যখন কর্মহীন মানুষের ম্লান মুখ বাড়ছে, তখন সরকারের একার পক্ষে এত ত্রাণ দেওয়া কঠিন। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনও যদি এগিয়ে আসে, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে না।

আরও পড়ুন

×