ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

সুরক্ষা নিয়েই সচল থাকুক পোশাক শিল্প

সুরক্ষা নিয়েই সচল থাকুক পোশাক শিল্প
×

আহসান এইচ মনসুর

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

করোনাভাইরাসের হুমকিতে শ্রমিক সুরক্ষাসহ সার্বিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে গত মার্চ মাসের শেষ দিকে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ করে দেয় সরকার। এরপর আরও দু-তিন ধাপে গার্মেন্ট কর্মীদের ছুটি বৃদ্ধি করা হয়। প্রায় এক মাস ধরে লকডাউনের কারণে গার্মেন্ট বায়িং হাউস ও পোশাক কারখানার কাজ স্থবির হয়ে পড়ায় লাখ লাখ পোশাক শ্রমিক ও কর্মকর্তারা প্রায় বেকার। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী কিছু পোশাকের চাহিদা রয়েছে। ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলো উৎপাদন ও রপ্তানি চালু করেছে। বিশেষ করে পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো ক্রমশ ব্যবসা খুলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের পোশাক খাত উৎপাদনে না গেলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক খাতের যে সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সেটি অব্যাহত না রাখা গেলে প্রতিযোগী দেশগুলো সেই সুযোগ নিতে পারে। তখন পুরো ব্যবসায় ওই দেশগুলোতে স্থানান্তরের হুমকি রয়েছে। আর একবার সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে গেলে পুনরায় তা প্রতিস্থাপন করা বিশেষত বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধাপে ধাপে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো আগামীতে চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
এটা ঠিক যে, কঠিন বাস্তবতার কারণে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো খুলে দিতে হবে। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম, চীনও গার্মেন্ট খুলে দিয়েছে। তবে শুধু উৎপাদনের দিকে মনোযোগ থাকলেই চলবে না, যেহেতু ঝুঁকি রয়েছে, তাই আমাদেরকে বাস্তবসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে। বাস্তবতার কারণে অবশ্যই গার্মেন্ট খুলতে হবে, কিন্তু সেগুলো স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন সাপেক্ষেইে করতে হবে। গার্মেন্টগুলোতে যেন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে তার যথোপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা দেখেছি, বিজিএমইএ একটা হেলথ গাইডলাইন করেছে। তারা পোশাক শ্রকিমদের সহায়তা দিতে হটলাইন চালুসহ করোনা আক্রান্ত শ্রমিকদের সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এটাকে বাস্তবায়ন করা দরকার। সরকার চাইলে ওই গাইডলাইনে পরিবর্তন আনতে পারে। সেখানে সুরক্ষার বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। গার্মেন্ট শিল্পের স্বার্থেই সরকারকে এই গাইডলাইন বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ এটা শুধু বিজিএমইএর গাইডলাইন হিসেবে থাকলে বাধ্যতামূলক হবে না। কারণ বিজেএমইর পক্ষে এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সে আইনগত অধিকার ও সক্ষমতা তাদের নেই। কেবল সরকারই পারে এ ধরনের গাইডলাইন বাস্তবায়নে ফ্যাক্টরিগুলোকে বাধ্য করতে। কাজেই সরকারকে এটা গাইডলাইন আকারে প্রকাশ করে নির্দেশনা দিতে হবে অতি সত্বর। এই গাইডলাইন বাস্তবায়ন ছাড়া গার্মেন্ট চালু রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
আমরা জানি যে, এখন ক্রয়াদেশের পরিমাণ খুব সীমিত। স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ ক্রয়াদেশ থাকে তার ২০ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে। এখন যেহেতু ক্রয়াদেশ কম, তাই কারখানাগুলোতে সেই অনুপাতেই উৎপাদন করতে হবে। ক্রয়াদেশ অনুপাতে শ্রমিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু ২০ শতাংশ শ্রমিক হলেই চলবে, কাজেই সব শ্রমিককে ঢাকায় আনার দরকার নেই। কোম্পানিগুলো তাদের পলিসি ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী শ্রমিকদের সিলেক্ট করে কারখানায় আনতে পারে। শ্রমিকদের চলাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারখানায় তাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কেউ কারও মুখোমুখি হতে পারবে না। এভাবে দু-তিন মাস চালানো যেতে পারে। এর সঙ্গে বাথরুম পরিস্কার রাখতে হবে। শ্রমিকরা যাতে দুই/এক ঘণ্টা পরপর হাত ধুয়ে নিতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। খাবারের জন্য সময় পৃথক করে দিতে হবে। একসঙ্গে কোনোভাবেই সবাইকে বের হতে দেওয়া যাবে না। এই নিয়মগুলো মানতে হবে। অন্যথায় রোগটি ভয়ানকভাবে ছড়িয়ে যাবে, তাহলে আবার গার্মেন্টগুলো জনস্বার্থে বন্ধ করে দিতে হবে। সুতরাং মালিকদের স্বার্থেই এই নীতিমালার বাস্তবায়ন দরকার। সাবধানতা পুরোপুরি নিশ্চিত না করে কোনো গার্মেন্ট খোলা উচিত হবে না। আবার যে ফ্যাক্টরিগুলোর ক্রয়াদেশ বেশি তারা সীমিত শ্রমিক দিয়েই তিন শিফটে কাজ করতে পারবে।
ইতোমধ্যেই নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও আশুলিয়ার অনেক শ্রমিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে অধিক আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর অন্যতম। আবার এসব জেলাতেই গার্মেন্টের সংখ্যা বেশি। তাই আর কোনো গার্মেন্ট শ্রমিক যাতে নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হন সেটি আগে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা দেখছি, কিছু কারখানা চালু হয়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্যবিধির পরিপালন একেবারেই করা হয়নি। এ ধরনের পরিস্থ্থিতি খুবই হতাশাব্যঞ্জক এবং আমাদেরকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নিজেদের স্বার্থে হলেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত পরিহার করা দরকার। আমরা আশা করব, কেউ যাতে বিশৃঙ্খলভাবে গার্মেন্ট চালু করতে না পারে এবং চালু করার পর স্বাস্থ্যকর পরিবেশের ব্যত্যয় না ঘটায়, সরকার সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখবে। তবে যেসব মালিক ও কর্তৃপক্ষ বিজিএমইএর খসড়া স্বাস্থ্যনীতি সঠিকভাবে প্রতিপালন করে গার্মেন্ট খুলবে, তারা সঠিকভাবে কার্যক্রম চালাতে পারে।
আমরা প্রত্যাশা করি, কর্তৃপক্ষ যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই গার্মেন্টগুলো চালু করবে এবং সুরক্ষার বিষয়ে কোনো ছাড় দেবেন না। তারা অবশ্যই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের দিকনির্দেশনার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাবেন। তবে বিষয়টি শুধু মালিকশ্রেণির হাতে ন্যস্ত করলেই চলবে না। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও উৎপাদন সচল রাখা এবং সার্বিক সুরক্ষার বিষয় চিন্তা করে উৎপাদনে যাওয়া গার্মেন্টগুলো নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে। কোথাও অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে কালবিলম্ব না করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) এবং শিল্প পুলিশকে তৎপর থাকতে হবে।
মনে রাখতে হবে, গার্মেন্টে আমাদের প্রায় অর্ধকোটি শ্রমিক কাজ করেন। দেশের রপ্তানির প্রায় আশি ভাগই এ শিল্পের অবদান। সুতরাং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সামান্য শিথিলতা এ শিল্পের জন্য ভয়ানক পরিণতির কারণ হতে পারে। যদি কোনোভাবে গার্মেন্ট শ্রমিকদের মাঝে নতুন করে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে তাহলে জনরোষ এবং রাজনৈতিক চাপে ফের গার্মেন্টগুলোকে বন্ধ করে দিতে হতে পারে, যা একেবারেই কাম্য নয়। তাই সরকার ও বিজিএমই এবং গার্মেন্ট মালিকদের শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও পড়ুন

×