ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

জামিলুর রেজা চৌধুরী

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই
×

মিশন সেভ বাংলাদেশ'র পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা পেলেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা- সমকাল

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা যেমন শোকে স্তব্ধ, তেমনই শূন্যতায় চঞ্চল। মঙ্গলবার সকালে ছড়িয়ে পড়া তার মৃত্যু সংবাদ করোনা পরিস্থিতির এই দুঃসময়কে যেন আরও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। আমরা দেখেছি, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকদের আলোচনায় উঠে এসেছে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রাণঢালা ভালোবাসা। বস্তুত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনের আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশের মধ্য দিয়ে গোটা জাতির বেদনাই প্রতিফলিত হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির সতর্কতার কারণে তার পরিবারের পক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, কোটি কোটি মানুষ ঘরবন্দি থেকেই অন্তরের অন্তস্থল থেকে তার জন্য শুভকামনা জানিয়েছে। জামিলুর রেজা চৌধুরী শারীরিকভাবে চিরপ্রস্থানে গেলেন; কিন্তু জীবন ও কর্ম দিয়ে তিনি আমাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বৈশ্বিক নানা প্রতিষ্ঠানের হাতছানি উপেক্ষা করে তিনি উচ্চতর পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এসেছিলেন এবং সুদূরের আরও নানা আহ্বান এড়িয়ে তিনি দেশেই থেকে গিয়েছিলেন। দেশমাতৃকা যে তাকে মনে রাখবে, জীবত অবস্থায় একুশে পদকে ভূষিত করার মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্র তা ঘোষণা করেছিল।

বাংলাদেশের গড় আয়ুর অনুপাতে জামিলুর রেজা চৌধুরী পরিণত বয়সেই প্রয়াণ লাভ করলেন, আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এটাও অনস্বীকার্য যে, তিনি মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত কর্মক্ষম ছিলেন। কেবল শারীরিকভাবে নয়, মেধা ও মননে তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও তারুণ্যে ভরপুর। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেবল নন; রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনেক গুরুদায়িত্বই তিনি যথেষ্ট দক্ষতা ও সক্ষমতার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছিলেন। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, তিনি আরও অনেক বছর আমাদের মাঝে থাকবেন এবং জাতি তার মেধা ও মননে উপকৃত হতে থাকবে। আমাদের মনে আছে, জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে এক সংবর্ধনা সভায় তিনি বলেছিলেন, উপাচার্যের মতো গুরুদায়িত্ব আর নেবেন না। পরিবার ও সমাজকে আরও বেশি সময় দেবেন। দুর্ভাগ্যবশত তার আগেই তাকে চলে যেতে হলো। বয়সের তুলনায় না হলেও জাতির প্রতি তার অবদান ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে এটা অবিসংবাদিতভাবে অকাল মৃত্যু। তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।

জামিলুর রেজা চৌধুরীর বিদায়ে বেদনার মধ্যেও স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, তিনি একটি সার্থক জীবনযাপন করে গেছেন। যদিও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, তিনি কেবল শিক্ষকতায় নিজেকে সীমিত রাখেননি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় রয়েছে তার অবদান। বিশেষত বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক যখন প্রশ্নবিদ্ধ প্রশ্ন তুলে অর্থায়ন প্রত্যাহার করেছিল, তখন আমরা দেখেছিলাম- জামিলুর রেজা চৌধুরী দৃঢ়তার সঙ্গে প্রবল হাওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই সঠিক প্রমাণ হয়েছেন। জীবনের সর্বক্ষেত্রে এমন ঋজুতা দিয়ে তিনি অর্জন করেছিলেন সর্বজনীন শ্রদ্ধা। অধ্যাপক হিসেবে তিনি বুয়েটে কতটা জনপ্রিয় ছিলেন, সবাই জানে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থাপক হিসেবেও তার দক্ষতা ও দূরদর্শিতা যে সমীহ জাগানিয়া, দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাক ও এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য হিসেবে বলতে গেলে অবসরকালীন জীবনে দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রকৌশল ও স্থাপত্যের মতো বিষয়ের কেন্দ্রে কীভাবে মানুষ থাকতে পারে, প্রাণ প্রতিষ্ঠা হতে পারে, হাতেকলমে দেখিয়ে গেছেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার নাগরিক আন্দোলনেও তিনি এদেশের অগ্রণীদের একজন। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায়ও সুদূরপ্রসারী অবদান রেখেছেন। অবশ্য আমরা মনে করি- সবচেয়ে বড় সার্থকতা ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তার সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম। তার জীবনাদর্শ পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে চলেছে, ভবিষ্যতেও চলবে।

সমকাল পরিবারের সঙ্গে জামিলুর রেজা চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা সমকাল আত্মপ্রকাশের সময় থেকেই। তিনি আমাদের জন্য লিখেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রেরণা জুগিয়েছেন, আলো ছড়িয়েছেন। তিনি ছিলেন সমকালের অন্যতম প্রধান অভিভাবক। তার মৃত্যুতে আমরা ঘনিষ্ঠ স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করছি। আমরা তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। তার পরিবারের প্রতি জানাই গভীর শোক ও সমবেদনা। আমরা মনে করি, এই কীর্তিমান ব্যক্তির মৃত্যু নেই।

আরও পড়ুন

×