ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

জন্মজয়ন্তী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বাস্থ্য ও সমাজ সমীক্ষা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বাস্থ্য ও সমাজ সমীক্ষা
×

সুভাষ সিংহ রায়

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কবিতা 'প্রাণ' প্রায় সবাই পাঠ করেছি- 'মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে বাঁচিবারে চাই।' মানুষ কীভাবে বাঁচতে চায়? সে চায় আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু। সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকাই প্রকৃত বেঁচে থাকা। রহস্যসূত্র অন্বেষণের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় রবীন্দ্র রচনায়। বিজ্ঞান-দীক্ষিত রবীন্দ্রনাথের মনোজগৎ বারবার উন্মোচিত হয়। বিজ্ঞানের জটিল বিষয় বোঝাতে 'বিশ্ব পরিচয়' লিখতে গিয়ে তিনি বাস্তব জীবন থেকে এমন উপমা বা দৃষ্টান্ত ব্যবহার করেছেন, যা সহজেই কিশোর পড়ূয়াদের বোধগম্য হয়ে ওঠে।

ছোট গল্প 'ফটিক' রচিত হয়েছিল আজ থেকে ১২৮ বছর আগে- 'বালকের জ্বর অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল। সমস্ত রাত্রি প্রলাপ বকিতে লাগিল। বিশ্বম্ভরবাবু চিকিৎসক লইয়া আসিলেন।' অসুস্থতার বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়, ফটিক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। 'মাথাব্যথা শিহরণ শীতবোধ' জ্বরাক্রান্ত হওয়ার পূর্বাভাস। এই শারীরিক অবস্থায় ফটিক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে মুষলধারা বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ে; রোগের প্রবণতা আরও সক্রিয় ও উজ্জীবিত হয়ে যায়। এ ঘটনাকে রোগের পূর্ববর্তী সক্রিয়করণ অবস্থা বলা হয়। শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে আসে ও সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই বীজাণু সংক্রমণে এই রোগের সৃষ্টি হয়; যদিও আরও কয়েক ধরনের বীজাণুও এই অসুস্থতার কারণ হতে পারে। সংক্রমণের এক থেকে সাত দিনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকার পর এই রোগের প্রকাশ ঘটে। সহসা শিহরণসহ জ্বর ও তার ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকে ও রোগী কাতর হয়ে প্রলাপ বকতে থাকে, অনতিকালের মধ্যে রোগীর অবস্থা সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে। যথাসময়ে চিকিৎসা না হলে সাত দিন থেকে দশ দিনের মধ্যে চরম পরিণতি ঘটে।

'ছুটি' রচনার সময় (১৮৯২ খ্রি.) রোগ নির্ণয়ের বিশেষ পদ্ধতি ও বীক্ষণাগারে পরীক্ষার এত ব্যাপকতা ছিল না। রঞ্জন রশ্মি প্রয়োগে রোগ নির্ধারণ প্রচলিত হয়নি। রঞ্জন রশ্মি আবিস্কৃত হয় ১৮৯৫ সালে; তার প্রয়োগ পদ্ধতি আরম্ভ হয় আর কয়েক বছর পরে। কিন্তু তখনই রবীন্দ্রনাথ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতেন।

রবীন্দ্রনাথ শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা ছিল যাপিত জীবনের নানান অনুষঙ্গের সঙ্গে ব্যবহারিক শিক্ষার সংযোগ ঘটানো। ১৯৪০ সালের দিকে শান্তিনিকেতনের আশপাশের গ্রামগুলোতে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে গ্রাম-সমীক্ষার থেকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, গরিব নিম্নবর্ণের ওপরে এর বেশি প্রভাব পড়েছিল। মধ্যবর্গীয় জাতিদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল যেখানে ১৪.০ শতাংশ, নিম্নবর্গীয়দের মধ্যে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১৮.৯ শতাংশতে। এই তথ্য বিভিন্ন সমবায় সমিতি প্রতি মাসে শ্রীনিকেতনের পল্লি সংগঠন বিভাগকে পাঠাতেন। ম্যালেরিয়া তো ছিলই; কিন্তু তার সঙ্গে যক্ষ্ণা, ফুসফুসের নানারকম রোগ, পাকতন্ত্রের বিশেষ করে ক্ষুদ্র অগ্ন্যাশয়ের পীড়া, আমাশয় ইত্যাদির প্রকোপ যথেষ্ট ছিল। এই রোগের চিত্রের থেকে বোঝা যায় যে বীরভূমের সেই সময়ের ক্রমশ ভেঙেপড়া আর্থিক কাঠামো এলাকার জনসাধারণের স্বাস্থ্যের ওপরে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল।

১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীনিকেতনে নিবিড় এলাকার অন্তর্ভুক্ত সুপুর গ্রামে সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা করা হয়। সমীক্ষায় গ্রামের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে গ্রামের লোকদের স্বাস্থ্যসমীক্ষাও করা হয়। সেই সময়ের কোনো একটি গ্রামের সব লোকের স্বাস্থ্যসমীক্ষা বোধহয় এই প্রথম করা হয়। এই সমীক্ষা থেকে গ্রামগুলোর স্বাস্থ্য, গ্রামবাসীরা বিশেষ করে কী ধরনের রোগ থেকে ভুগতেন, তার ধারণা করা যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সুপুর গ্রামে যে সমীক্ষা করা হয় তার থেকে বর্ধিষ্ণু একটি গ্রামের স্বাস্থ্যের অবস্থার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। সমীক্ষালব্ধে এই তথ্যের থেকে দেখা যাচ্ছে যে ১৯৩৯ সুপুর গ্রামে এক বছরে মোট ৩৪ জন মৃত্যুমুখে পড়েন। এর কারণগুলোর মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সর্বাধিক- ৭৬.৪৭ শতাংশ। অন্যান্য যেসব কারণে মৃত্যু ঘটেছিল তার মধ্যে ছিল নিউমোনিয়া, কলেরা ও অন্যান্য অসুখ। গ্রামে কলেরার প্রাদুর্ভাব বহু বছর আগে ১৮৭৪ সালে হয়েছিল; কিন্তু এই সমীক্ষার সময় তা কদাচিৎ হতো। অন্যদিকে অন্যান্য রোগের প্রকোপ গ্রামে ক্রমাগত বেড়ে চলেছিল। গ্রামের লোকদের মধ্যে বিভিন্ন যেসব রোগের উপসর্গ পাওয়া গিয়েছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে- কুষ্ঠরোগে ৪ জন, যক্ষ্ণায় ৩ জন, হাঁপানি ১০ জন, দৈহিক পক্ষাঘাতে ১ জন আক্রান্ত ছিলেন। গ্রামে যৌন রোগাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা 'অনেক' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তা ছাড়া গ্রামের লোকেরা প্রতি বছর ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার ফলে অধিকাংশ লোকের প্লীহা বৃদ্ধি ঘটেছিল।

কবি এতটা বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন যে, আজ থেকে ৭০ বছর আগে শ্রীনিকেতন ম্যালেরিয়া রোগ নির্ণয়ের একটি পরীক্ষাগার গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে প্রাপ্ত সমীক্ষার ভিত্তিতে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে গোয়ালপাড়া, বল্লভপুর, লোহাগড়, বিনুরিয়া, পারুলডাঙা, শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন এলাকায় সাঁওতাল পল্লীসহ আরও কয়েকটি গ্রামে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে গ্রামগুলোতে ম্যালেরিয়া হার অনেক কমে যায়। শ্রীনিকেতনের হাসপাতালেও ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার জন্য আসা রোগীর সংখ্যা কমে যায় লক্ষণীয়ভাবে।

স্বাস্থ্য সমবায় সমিতির এলাকায় ম্যালেরিয়া যথেষ্ট ভালো প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। শ্রীনিকেতন পল্লিসেবা সমিতি তাই ডিডিটি ছড়ানোর কাজ করা ও ব্রতী দলের মাধ্যমে গ্রামের জঙ্গল পরিস্কার করা, কুইনাইন ও প্যালুডিন ট্যাবলেট বিতরণ করার মাধ্যমে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজ বজায় রাখে। অন্যদিকে, বসন্তরোগের প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন গ্রামে প্রতিষেধক ইনজেকশন বা ভ্যাকসিনেশন (মোট ১০১৫ জনকে) দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া জলবাহিত রোগের প্রকোপ যেমন- কলেরা, নানা ধরনের আমাশয়, পেটের অসুখ, টাইফয়েড ইত্যাদি রোগের হার যে যথেষ্ট পরিমাণে বজায় ছিল। ম্যালেরিয়ার প্রকোপ একেবারে নির্মূল না হলেও এর প্রকোপ আস্তে আস্তে কমতে থাকে। অন্যদিকে, জলবাহিত ও বায়ুবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে।

শ্রীনিকেতনের চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীদের চিকিৎসার যে তথ্য আছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, সব রোগের মধ্যে ম্যালেরিয়া রোগের সংখ্যা ১৯২৮ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে ৩৭.১৮% থেকে ৬৬.৬৭%-এর মধ্যে ওঠানামা করেছে। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ তা ১৯.৪%-এর নেমে আসে। কুষ্ঠ, কালাজ্বর, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টি, মাতৃত্বজনিত মৃত্যু ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু যে করা হয়েছে তা নয়, রোগের বিরুদ্ধে মানুষের চেতনা বৃদ্ধির নানা উপায় গ্রহণ করা হয়েছিল। রোগকে নিয়তি বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা কমতে থাকা। বিনুরিয়ার সাঁওতালরাও একসময়ে তাদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য সমবায়ের সুযোগ করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে দরবার করেছে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। গ্রাম-উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বাঁচার মতো করে বাঁচতে শিখিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৮০ বছর জীবনে কখনই সাহস হারাননি। বরং লিখেছেন- 'সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান, সংকটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ। মুক্ত করো ভয়, আপন মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।'

পুনশ্চঃ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক 'ডক্টরেট' উপাধি দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। রামগড়ের ঠিকানায় যাওয়া কবির সব চিঠির খামের ওপর লেখা থাকত 'ডক্টর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর'। দেখেশুনে রামগড়ের পোস্টমাস্টার চারিদিকে রাষ্ট্র করে দেন- কলকাতা থেকে একজন বিখ্যাত ডাক্তার এসেছেন রামগড় পাহাড়ে। পাহাড়ি মানুষদের মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত।

লেখক ও রাজনীতিক, সাবেক ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন

×