ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

লকডাউন

অর্থনৈতিক ধস মহামারির চেয়ে প্রাণঘাতী

অর্থনৈতিক ধস মহামারির চেয়ে প্রাণঘাতী
×

ড. মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দেশে চলমান বাধ্যতামূলক ছুটি (অঘোষিত লকডাউন) তুলে নিয়ে বা সীমিত করে পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সন্দেহ নেই, এখনও মহামারির বিস্তৃতি ঠেকানোই সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের প্রথম অগ্রাধিকারের কারণ। বাংলাদেশ এখনও এই মারাত্মক ছোঁয়াচে দানব মহামারির সবচেয়ে দ্রুত প্রাণঘাতী বিস্তারকালের 'কমিউনিটি সংক্রমণ' পর্যায়কে যথাযথ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। করোনাভাইরাস মহাদুর্যোগ ফেব্রুয়ারির আগেও পুরো বিশ্বের জন্যই ছিল কল্পনাতীত। এর ভয়াবহতা ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কোনো দেশের রাষ্ট্রনেতা কিংবা স্ব্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ঠিকমতো আন্দাজই করতে পারেননি। পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, গণচীনের উহানে প্রথম এই ভয়ংকর প্রাণঘাতী ভাইরাস চিহ্নিত করে কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করার অপরাধে একজন চিকিৎসককে অনেক রকম শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। চীনের সরকার তার সাবধান বাণীকে নাকি প্রায় দুই সপ্তাহ পাত্তাই দেয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো তুড়ি মেরে ব্যাপারটিকে উড়িয়েই দিয়েছিলেন। তার এই 'ড্যাম কেয়ার' ভাব চালিয়ে গেলেন তিনি এবং তার প্রশাসন। বললেন 'এটা সাধারণ সর্দি-কাশি'। অথচ গত দেড় মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনার মহামারি বিশ্বের সব দেশ থেকে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটানোর পর ট্রাম্পেরই এখন 'লেজে গোবরে' অবস্থা। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার গলাবাজি থামছেই না, তিনি এখন বলির পাঁঠা বানাচ্ছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে। ইতোমধ্যে তিনি ওই সংস্থায় মার্কিন চাঁদা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশও বেশ খানিকটা বিলম্বে প্রতিরোধ কার্যক্রম শুরু করেছে বলতেই হবে।

আমার আশঙ্কা, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানের চেয়েও আগামী দিনগুলোতে ক্রমে ভয়ংকর হয়ে উঠবে দেশের প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বিত্তহীন ও দরিদ্র জনগণের ক্রমবর্ধমান খাদ্যাভাব। করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার অনুপাত ২০ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী এক মাসে এই হার নিশ্চিতভাবে দ্বিগুণ মানে ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে বিভিন্ন মহল আশঙ্কা প্রকাশ করছে। এ জন্যই আমি সাড়ে ছয় কোটি মানুষ খাদ্যাভাবের প্রত্যক্ষ শিকার হওয়ার কথা বলছি। অত্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবে দারিদ্র্যকে দ্রুত কমিয়ে আনায় বাংলাদেশ যে সফলতা অর্জন করেছিল, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো করোনাভাইরাস মহামারি সেই সাফল্যকে প্রায় পুরোপুরি ভেস্তে দিয়েছে। অনাহার-অর্ধাহারে জর্জরিত দেশের হতদরিদ্র ১২ শতাংশ মানে এক কোটি ৯০ লাখ মানুষ এবং এবার আবারও দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া বাড়তি ২০ শতাংশসহ কমপক্ষে ৪০ শতাংশ মানুষের জীবন ও জীবিকার চরম সংকটে পড়তে পারে। মৃত্যুর মিছিল শুরু হওয়ার আগেই তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও নূ্যনতম ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করার ব্যাপারটাকে নীতি-প্রণেতাদের অগ্রাধিকার ঘোষণা করে উপযুক্ত কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এখনই প্রতিরোধ যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে মনোযোগের অন্যতম মূল ফোকাসে পরিণত করার আহ্বান জানাই।

দেশের অর্থনীতি মহামারির বজ্রাঘাতে অচিন্তনীয় এক মহাসংকটের গিরিখাতে পড়ে গেছে, যার ভয়াবহতা এখনও জনগণ হয়তো সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না। আগামী এক থেকে দেড় বছর মহামারি-সৃষ্ট চরম অভিঘাতগুলোর বিভিন্ন ডাইমেনশন জনগণের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার সংগ্রামকে লণ্ডভণ্ড করতে শুরু করবে। সবচেয়ে বড় যে সংকট আসছে সেটা হলো কর্মসংস্থান হারিয়ে ফেলা শ্রমজীবী জনগণের বেকারত্ব ও আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ার ফলে আক্ষরিক অর্থে জীবন টিকিয়ে রাখার কঠিন সংগ্রাম। এই শ্রমজীবী জনগণের ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত কিংবা স্ব-কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল, যে খাতগুলোর বেশিরভাগই ভবিষ্যতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হবে রপ্তানি খাতের বৈদেশিক চাহিদার মহাপতন-উদ্ভূত ছাঁটাই ও কর্মহীনতা সংকট। যেহেতু ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশের বাজার তাই এই অর্থনীতিগুলোতে অবশ্যম্ভাবী ও অত্যাসন্ন মহামন্দা বাংলাদেশকেও মহাসংকটে ফেলবেই। এর পাশাপাশি আসছে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর অত্যাসন্ন কর্মসংস্থান হারানোর হিড়িক। 

মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি অদূর ভবিষ্যতে তাদের রপ্তানি আয়ে মহাসংকোচনের সম্মুখীন হতে চলেছে, যে ধসটা দীর্ঘস্থায়ী ও অনতিক্রম্য হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। অতএব বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটা বিরাট অংশ তাদের সারা জীবনের আয়-উপার্জনের উৎসগুলো হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন। প্রবাসীদের এই ফিরতি-প্রবাহ কত মারাত্মক হয় এবং দেশের বেকারত্ব সমস্যাকে কোন্‌ ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যায় তা বর্তমান পর্যায়ে আন্দাজ করা কঠিন। আমার ভয় হচ্ছে, দেশে আসা রেমিট্যান্স-প্রবাহ আগামী বছরগুলোতে তীব্রভাবে সংকুচিত হওয়ার চেয়েও অনেক বেশি মারাত্মক হবে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতিতে সৃষ্ট গতিশীলতা অনেকটাই হারিয়ে যাওয়ার ভয়াবহ আশঙ্কা রয়েছে। মনে রাখতে হবে, দেশের বাণিজ্য-ভারসাম্যে প্রতি বছর যে ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি থাকে সেটা পূরণ করার জন্য এই রেমিট্যান্স প্রবাহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। এখন দেশের যে ৩২ বিলিয়ন ডলারের স্বস্তিকর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে আমরা গর্ব করি, সেটাতে মারাত্মক ধস নামতে পারে এই সংকুচিত রেমিট্যান্স প্রবাহের ধাক্কায়। একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক ঋণ-জিডিপি অনুপাতকে এক শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্যও এই রেমিট্যান্স প্রবাহই মূল ভূমিকা পালন করে চলেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবাহকেও স্বস্তিকর পর্যায়ে রাখতে মূল ভূমিকা রাখে ফরমাল-ইনফরমাল যেভাবেই হোক দেশের অর্থনীতিতে যোগ হওয়া এই বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ। এই প্রবাহে ভাটার টান প্রবল হলে দেশের ৬০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনেকগুলোই অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। অতএব আগামী অর্থবছরের বাজেট ও বাণিজ্যনীতি ঘোষণার সময় দেশের আমদানি বাণিজ্যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের প্রস্তুতি শুরু করা ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করি। এমনকি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়াও এখনই শুরু করা প্রয়োজন।

দেশে এখন প্রায় ১৭ লাখ টন খাদ্যশস্যের সরকারি বাফার স্টক গড়ে তোলা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন। চলমান বোরো মৌসুমের ধান কাটার সময় শুরু হয়ে গেছে। যদি অকাল বন্যার মতো বড় ধরনের বিপত্তি না হয় তাহলে হয়তো আমরা আরেকটি বাম্পার বোরো ধানের ফলন পেতে যাচ্ছি। যেহেতু এখন বোরো ধানই দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রধান সূত্রে পরিণত হয়েছে। এর ফলে আগামী আমন মৌসুম পর্যন্ত আমাদের ধান-চালের মাঠ পর্যায়ের মজুদ এবং চালের বাজারের সরবরাহ অবস্থা স্বস্তিকর থাকার কথা। আউশ ধান উৎপাদনকে ব্যাপক প্রণোদনা দিয়ে এই স্বস্তিকর অবস্থা অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত বজায় রাখাও এক্ষণে সরকারের আরেকটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মনে করি। কিছু সংখ্যক বৃহৎ চালকল মালিক, চাতাল মালিক ও দেশের বড় বড় চালের মোকামের মজুদদারদের গোপন সমঝোতায় গড়ে ওঠা চালের বাজারের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটকে সরকারের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে চালের সরবরাহে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা থাকবে না আশা করি। কিন্তু মূল সমস্যাটা আসবে উপরোল্লিখিত ৪০ শতাংশ মানুষের কাছে পর্যাপ্ত ক্রয়ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ থেকে।

সরকার ইতোমধ্যেই রেশনিং ব্যবস্থা সারাদেশের এক কোটি পরিবারের মধ্যে সম্প্রসারণের পদক্ষেপ নিয়েছে। ভর্তুকি দামে যদি এই এক কোটি পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য বিক্রয়ের রেশনিং পদ্ধতি গড়ে তোলা যায় তাহলে প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি মানুষ এই সরকারি খাদ্যশস্য রেশনিংয়ের আওতায় এসে যাবে। কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ হলো, এই এক কোটি পরিবারকে সঠিকভাবে বাছাইয়ের বিষয়টি। সরকার ইতোমধ্যে পরিবারগুলোর তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা চেয়ারম্যান-মেম্বারদের রেশন কার্ড-বাণিজ্য ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ার খবর সংবাদমাধ্যমে আসছে।

লকডাউন দীর্ঘায়িত করে অর্থনীতিকে নিশ্চিত ধসের দিকে ধাবিত করা আমার কাছে সমীচীন মনে হয় না। মহামারির চেয়েও অর্থনীতির ধস অদূর ভবিষ্যতে অনেক বেশি প্রাণঘাতী হতে পারে। সে জন্যই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার আহ্বান- পর্যাত্রক্রমে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কাজ যে কোনো মূল্যে এগিয়ে নিতে হবে। দেশের নেতৃস্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসে সময়োচিত ও জ্ঞানদীপ্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×