অন্যদৃষ্টি
কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনা কোথায়
মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃশ্যত একা, যেন নিঃসঙ্গ শেরপা। বাকিদের বেশিরভাগই দক্ষতা প্রদর্শনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় পটুতা দেখিয়েছেন। কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মন্ত্রীদের মধ্যে বিচক্ষণতা ও সমন্বয়ের অভাব ছিল। এটি পেশাদারিত্বশীল আমলাতন্ত্রেরও বড় ব্যর্থতা।
ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য চিকিৎসা কর্মীদের জন্য মাস্ক, গাউন, গল্গাভস এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের (পিপিই) অভাব এবং কভিড-১৯ টেস্টিং সরঞ্জাম এবং শ্বাসযন্ত্রের অপ্রতুলতা ছিল সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনা ছিল কিনা সন্দেহ। মাঠ পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরও নাজুক।
ভেন্টিলেটর সুবিধা না থাকার কারণে দেশটির একটি রিজিওনাল সিলেট হাসপাতালে করোনাভাইরাস আক্রান্ত একজন ডাক্তারের চিকিৎসা সম্ভব হয়নি। মানসম্মত ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়েই তিনি আক্রান্ত হন। শেষ মুহূর্তে রাজধানী শহর ঢাকায় চিকিৎসা করতে আসেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবতা স্বীকার করা ভালো ছিল। বলা যেত : এরূপ পরিস্থিতির জন্য আমরা একেবারেই তৈরি ছিলাম না। এর জন্য বিদ্যমান কন্টিনজেন্সি প্ল্যানও যথেষ্ট নয়। কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ মুহূর্তে বিশ্ববাজারেও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ নেই। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ডাক্তার-নার্সরা অপ্রতুল ব্যবস্থার মাঝে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতিশীল। তারাই এখনকার মূল যোদ্ধা। পরিস্থিতি খারাপ হলে আমাদের জন্য বিষয়টি জটিল হবে। ইউরোপ-আমেরিকাই হিমশিম খাচ্ছে। সবাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সহায়তা করুন।
উল্লেখ্য, এই মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থায়ন মূল সমস্যা নয়। প্রধানমন্ত্রীর সুবিবেচনার কারণে গত প্রায় এক দশকেরও অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত অগ্রাধিকার বরাদ্দের একটি বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংকের একজন পরামর্শক হিসেবে অনানুষ্ঠানিকভাবে অবগত যে, শুধু কভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক মন্ত্রণালয়টিকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহযোগিতা প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
দুর্নীতি গবেষণাপত্র, ভুক্তভোগীদের মতামত ও জনমানুষের সাধারণ ধারণা থেকে এটা প্রকাশ পায় যে, মন্ত্রণালয়টির মূল সমস্যা সিস্টেম লস, ক্রয় সম্পর্কিত আমলাতান্ত্রিক স্বার্থ, উপকরণগত সীমাবদ্ধতা, কর্তব্য অবহেলা, দুর্বল জনস্বাস্থ্য পরিষেবা, মানসম্মত জবাবদিহি কাঠামো তৈরিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভালো কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনার অভাব।
যা হোক, দেশটিতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখনও সীমিত। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় এটি, জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। জনগণ যদি এখনও স্বপ্রণোদিতভাবে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সহায়তা না করে, তবে বিপর্যয় অপেক্ষা করবে বলে প্রতীয়মান হয়।
সে পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে লকডাউন পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের অপারেটিং কোর এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশকে লক্ষ্য করে প্রধানমন্ত্রী ৭২,৭৫০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তবে জনগণ সহায়তা না করলে পরিস্থিতি রাষ্ট্রের ও অধিকাংশ জনগণের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাবে। উন্নয়ন অংশীদার, এনজিও, করপোরেট ও ধনী ব্যক্তিদের ব্যাপক সহযোগিতাও দরকার হবে।
বিধাতা সহায়। এই পরিস্থিতি থেকে মানব সভ্যতা উত্তরিত হবে। বাংলাদেশও উত্তরিত হবে। কিন্তু এদেশের মানুষকে এখন সামষ্টিকভাবে ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভাবতে হবে, স্বাস্থ্য খাত বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে মানসম্মতভাবে বাঁচানো কতটা জরুরি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, করপোরেট সেক্টর, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন, সিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, সমাজ গবেষকদের কাছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে মানসম্মতভাবে বাঁচানো এখন থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এ পরিস্থিতি থেকে আরও একটি বিষয় উদ্ভাবিত হলো যে, গত দশ বছরে একজনের দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশটির উন্নয়ন খুব দ্রুত ত্বরান্বিত হয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু দুর্যোগ বা বিপর্যয় মোকাবিলার শক্তিশালী সেক্টরাল কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনার ভিত ও তার কার্যকরী বাস্তবায়ন কাঠামো ভালভাবে তৈরি হয়নি। এর কারণ সম্ভবত নেতৃত্বের ও প্রশাসনের একটি বড় অংশের কৌশলগত দক্ষতার অভাব।
সহযোগী অধ্যাপক, ফ্যাকাল্টি অফ বিসনেস এডমিনিনস্ট্রেশন, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ
[email protected]