ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

প্রস্তুতি

করোনা পরবর্তী খাদ্য নিরাপত্তা

করোনা পরবর্তী খাদ্য নিরাপত্তা
×

সিকদার আনোয়ার

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনা পরবর্তী বিশ্বে খাদ্য পরিস্থিতি কী হতে পারে এ নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে অনেকের ধারণা। মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রথমটাই হচ্ছে খাদ্য যার কোনো বিকল্প নেই, তাই খাদ্য নিয়ে বেশি আলোচনা, গবেষণা, লেখালেখি কিংবা রাজনীতি হবে- এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশে বার্ষিক ধান উৎপাদন হয় ৩৭৫ লাখ মেট্রিক টন। মোটামুটিভাবে ধান উৎপাদনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৩.২%, যদিও ধানের আবাদি জমি বৃদ্ধির বার্ষিক হার ০.৩১%। এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে সরকার, কৃষিবিজ্ঞানী এবং বিশেষত কৃষকদের যৌথ অবদান।

মাথাপিছু চাল গ্রহণের পরিমাণ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কারণে ক্রমান্বয়ে বার্ষিক ০.৭ % হারে কমে আসছে। মাথাপিছু চাল গ্রহণের দৈনিক পরিমাণ ১৯৯৫-৯৬ সালের জরিপে ৪৬৪.৩ গ্রাম থেকে ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৬৭.২ গ্রাম। জনসংখা ১৭ লাখ ধরা হলে বছরে চালের চাহিদা ২২৭ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে সরকারিভাবে সাধারণত চাল আমদানি করা হয় না, তবে বেসরকারিভাবে কিছু বিশেষ ধরনের চাল আমদানি করা হয়, যার পরিমাণ ২০১৭-১৮ সালে ছিল ৩০ লাখ মেট্রিক টন।

দেশে খাদ্যশস্য তথা চাল, গম, ভুট্টা মিলে উৎপাদন প্রায় ৪১৫ লাখ মেট্রিক টন। তার সঙ্গে আলুর উৎপাদন প্রায় ১০০ লাখ টন, মাছ ৪৫ লাখ টন, মাংস ৬২ লাখ টন, আরও আছে ডিম, দুধ, ফল ও শাকসবজি ইত্যাদি। অন্যদিকে চালের গড় মাসিক চাহিদা ২১ লাখ টন এবং বছরে ২৫২ লাখ টন। তবে চালের হিসেবে অন্য বিষয় জড়িত আছে। যেমন বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন চাল শিল্পে ব্যবহ্রত হয়, আবার প্রায় ১২% অর্থাৎ প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের তালিকা থেকে বাদ দিতে হয় বীজ, প্রাণী বা পাখির খাদ্য এবং বিনষ্ট বা কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে। তাহলে মোটামুটি হিসেবে খাদ্য ঘাটতি হওয়ার কথা নয়।

খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত। প্রথমত কৃষি উৎপাদন। এখানে আবাদযোগ্য জমি ক্রমেই কমে যাওয়া, কৃষি উপকরণ সময়মতো ও পরিমাণ মতো প্রাপ্যতা, নির্বিঘ্নে শস্য কর্তন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কীটপতঙ্গ, রোগবালাই, কৃষি শ্রমিক প্রাপ্যতা ইত্যাদি বিষয় জড়িত। তা ছাড়া সার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এগুলোর কোনো একটিতে সমস্যা হলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং খাদ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ইতোমধ্যে অধিকাংশ বোরো ধান কর্তন হয়েছে। বাকি ধান কাটার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সরকারি সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। জানা যায়, সরকার চলতি মৌসুমে প্রতি মণ ধান এক হাজার ৪০ টাকা করে সারাদেশ থেকে দুই কোটি মণ বোরো ধান ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ফাড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতে কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি কার্ড নিতে না পারে বা কোনোভাবে সরকার নির্ধারিত দাম প্রাপ্তিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে তার ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। এটা কঠিন কাজ কারণ, কৃষকদের নিজস্ব সমবায় সমিতি বা কোনো সংগঠন নেই যার মাধ্যমে সংগ্রহ কেন্দ্রে ধান পৌঁছাবে। এ ক্ষেত্রে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত না হয়।

আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রা ৩৬ লাখ মেট্রিক টন, যা কম হলেও যেসব এলাকায় আমন ধান উৎপন্ন হয়, সেসব এলাকার কৃষকদের জন্য ওই সময় খুবই প্রয়োজনীয়। আউশ চাষে পানি সেচের প্রয়োজনীয়তা কম, এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা ফলদায়ক হতে পারে। আগামী আউশ এবং আমন ধান সংগ্রহ মৌসুমেও যেন কৃষক সরাসরি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে খাদ্য গোডাউনের ধারণক্ষমতা প্রায় ২১ লাখ মে টন। আরও সাড়ে ছয় লাখ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ১৬৪টি খাদ্যগুদাম চলতি সালের মধ্যে নির্মাণে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নসহ আরও গুদাম নির্মাণ করা প্রয়োজন। সামাজিক সুরক্ষা, রেশনিং, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য চার-পাঁচ মাসের খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। দুর্যোগ, আপদ, দুর্ভিক্ষ বা বৈশ্বিক মহামারি সামলানোর জন্য আরও আট-দশ লাখ টন খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা সম্পন্ন গুদাম থাকা বাঞ্চনীয়।

করোনাভাইরাসে হাঁস-মুরগি পালন মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত। এ খাত পুনরায় গড়ে তুলতে কিছু সময়ের প্রয়োজন। আলু, গম, ভুট্টার কর্তন যথাসময়ে সম্পন্ন করতে হবে, পরিস্থিতি বিবেচনায় আলু রপ্তানি না করাই মঙ্গলজনক, শাকসবজি, দুধ-ডিমের মূল্য স্বাভাবিক রাখা দরকার। মিলার, ডিলার, ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বকারবারিরা যাতে মজুদ করে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।

কৃষিজাত ফসল ঋতুভিত্তিক এবং পচনশীল বিধায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যাবশ্যক। তাতে একদিকে কৃষকের ন্যায্য মূল্যসহ সারাবছর সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে এবং অন্যদিকে আমদানিজনিত উচ্চমূল্যের ঝুঁকি পরিহার করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসার জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

খাদ্য মজুদ যথেষ্ট থাকার পরও যদি সাধারণের তাতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করার সুযোগ বা অধিকার না থাকে কিংবা সামর্থ্য না থাকে তবে তাতে লাভ নেই। অর্থনীতির অন্যান্য সেক্টর বিপর্যস্ত হলে, কর্মসস্থান কমে গেলে, মানুষের আয়-রোজগার কমে গেলে বা ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে সাময়িকভাবে খাদ্য গ্রহণের সক্ষমতা কমে যাবে। তাই জনগণের সক্ষমতা বজায় রাখার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য আনুষঙ্গিক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ সক্ষমতা বজায় না থাকলে সরকারি সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী জোরদারের পাশাপাশি ভর্তুকি, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, ত্রাণ, সাহায্য ইত্যাদি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ বা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে দেশে আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। কৃষিতে শস্য নিবিড়তা তেমন একটা বাড়েনি, এখনও ২০০-এর কাছাকাছি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও আহ্বান জানিয়েছেন করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সব জমি চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য, যাতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো যায়। করোনা প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা।

অবসরপ্রাপ্ত সচিব; প্রাক্তন রেক্টর, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি

আরও পড়ুন

×