ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

যাপিত জীবন

বাংলাদেশ : অদ্ভুত দোকানের দেশ

বাংলাদেশ : অদ্ভুত দোকানের দেশ
×

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সম্প্রতি ফেসবুক ভীষণ সক্রিয়। ঘরবন্দি অবস্থায় টিভি দেখা আর ফেসবুক ঘাঁটাঘাঁটি ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। তাই ফেসবুকেই ক্ষোভ, ভালোবাসা, ঘৃণা, সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে লেখালেখি- এসব করেই দিন কাটে। মাঝে মাঝে দু-একটি মন্তব্য বেশ রসালো হয় যেমন, তেমনি ভাববার অবকাশ দিয়ে যায়। দেখা যাচ্ছে, একটি শিশু ২০৫০ সালে পড়ছে- একটি জাতি ২০২০ সালে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে শুধু বাজার করতে, সেই জাতির নাম বাঙালি। প্রথমে কথাটা হালকা রসিকতা মনে হলেও পরে একটু ভাববার অবকাশও পাওয়া গেল। বাঙালি বড়ই বাজারপ্রিয় জাতি। দোকান মালিক সমিতির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে ২৫ লাখ দোকান আছে। এ তো গেল দোকান, যেখানে একটা ঘর আছে। মালিকের বসার জায়গা আছে। মালপত্র সাজানো-গোছানো আছে। কিন্তু তারপরও আছে হাট-বাজার, ভ্যানগাড়িতে দোকান, ফুটপাতে দোকান, মাছের আড়ত, পাইকারি বাজার, উন্মুক্ত স্থানে অসংখ্য দোকান। দোকান মালিকদের সংগঠনের তালিকায় সেগুলো হয়তো নেই। সেগুলো ধরলে হয়তো দেখা যাবে সারাবাংলাটাই একটা দোকান। কাঁচাবাজারের জন্য এখন আর কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। দোরগোড়াতেই ভ্যানগাড়ি প্রস্তুত। ওষুধের দোকানও হয়তো ধরা হয়নি। সেও সংখ্যায় লক্ষাধিক না হলেও কাছাকাছিই হবে।

যে পরিমাণ খাদ্য মানুষ গ্রহণ করে, প্রায় সমান সমান ওষুধ খেতে হয়। রোগ এত বেড়ে না গেলেও ওষুধ বেড়ে গেছে প্রয়োজন ছাড়াই। এই যে এত বাজার, তাদের ক্রেতা কারা? নিশ্চয়ই যাদের কেনার ক্ষমতা আছে। এই কেনার ক্ষমতাওয়ালা মানুষের সংখ্যা যারা কেনে না তাদের চাইতে অনেক কম। এমন অনেক বাড়িতে দেখেছি, যেখানে এতসব কেনা জিনিসপত্র পড়ে আছে, যেসব কখনও ব্যবহার হয়নি। এসব বাড়িতে একেকটা ছোট ছোট গুদামও রাখতে হয়। আবার বাড়িতে লোকসংখ্যা দু-তিনজন কিন্তু ফ্রিজ গোটা তিনেক, তার সঙ্গে একটা ডিপফ্রিজও আছে। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, গত ছয় মাসের পুরোনো মাছ-মাংসও পাওয়া যাবে। আমরা বাল্যকালে (পঞ্চাশের দশক) দেখেছি, গ্রামবাংলায় সপ্তাহে একদিন হাট বসত, তাই দিয়ে এক সপ্তাহ চলে যেত। ওই হাটে মাছ-মাংস, সবজি, কাপড়-চোপড়, কৃষি উপকরণ, মিষ্টান্ন সবই পাওয়া যেত। তারপর ছিল মেলা, কিন্তু কালেভদ্রে। পণ্য ছিল নিছক প্রয়োজন কিন্তু অন্যান্য সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ড ছিল ব্যাপক। তার মধ্যে আছে লেখাপড়া, বিচার-সালিশ, পারিবারিক উৎসব যেমন বিয়ে-শাদি, খেলাধুলা, নাটক, যাত্রা, গান-বাজনা, বর্ষাকালে বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ, নৈতিক মানোন্নয়নের নানা ব্যবস্থা। শীতকালে স্কুলের শিক্ষকরা হারিকেন নিয়ে ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি যাতায়াত এবং শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করতেন। এসব সামাজিক কর্মকাণ্ডের ফলেই মানুষের মধ্যে মহত্ত্বর জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছিল। প্রবল দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও '৫২, '৬২, '৬৯ এবং '৭১ সংঘটিত হয়েছিল। জাতি ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল। ছাত্র আন্দোলন, বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনে অনাহারে-অর্ধাহারে থেকেও বড় বড় কাজ করতে পেরেছিল তারা। বিশ্বে বাজার অর্থনীতি আসার পরে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো টাকার আমদানি হতে থাকে, সে টাকাও মুষ্টিমেয় লোকের হাতেই যায়। রাতারাতি একটা ভোগী ভোক্তাশ্রেণি গড়ে ওঠে। এই শ্রেণির জৌলুস দেখে অনেকেই ভ্রান্ত ধারণা করে বসে।

বাংলাদেশে যেন সবাই হঠাৎ করে বিত্তবান হয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা প্রবৃদ্ধির নতুন নতুন হিসাব সামনে নিয়ে আসে। তাদের হিসাবে কখনই বিত্তহীন মানুষের বিষয় আসে না। অতি দুর্বোধ্য অর্থনীতির ভাষায় কী সব বলেন, অধিকাংশ লোক বোঝেন না। শায়েস্তা খানের আমলে এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। এই আট মণ চাল কেনার সামর্থ্য কার ছিল? সেই সময়কার কৃষকের দুর্দশা আজকের কৃষকের সঙ্গে তুলনা করলেই তো হয়। এক মণ ধানের সমান যেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম, তখন সহজেই শায়েস্তা খানের সময়কার কৃষকের সঙ্গে এ অবস্থা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দোকান মালিকরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য চালানো যাবে। তারা কি পোশাক শ্রমিকদের ছবিগুলো দেখছেন না? অথবা তাদের সম্ভাব্য ক্রেতা প্রাইভেটকারের মালিকরা পথেঘাটে কী আচরণ করছেন, তা বুঝতে পারছেন না। দোকান মালিকরা কি একেবারেই সহায়-সম্বলহীন যে, ঘাতক করোনার কালে তারা সংসার চালাতে পারবেন না? এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পোশাক ব্যবসায়ীরা। পোশাক কিনতে হলে স্পর্শ করতে হয়। সেই স্পর্শ যে কত হাত ঘুরে করোনার স্পর্শ হয়ে ফিরে আসবে, তার হিসাব কি তারা করছেন না? দেশের এই অর্থনৈতিক সংকটে যেখানে মানুষ অর্ধাহারে বা অনাহারে থাকছেন, তখন ঈদের বাজার কারা করবে? একমাত্র সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা আমলারা যারা বেতন-বোনাস সবই পাবেন। আর ইচ্ছামতো বাজার করতে হবে তাদের, যারা ঈদের বাজার করতে কলকাতা-ব্যাংকক-সিঙ্গাপুর যেতে পারেননি। দুর্নীতিগ্রস্ত কতিপয় আমলা ও কিছু লুটেরা ব্যবসায়ীর জন্য জাতিকে একটা ভয়ংকর বিপদের দিকে ঠেলে দিতে হবে? গণপরিবহনে কোনো অবস্থাতেই সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

পরিবহন মালিকরা করোনার সুযোগে কয়েক গুণ ভাড়া বাড়িয়ে দেবে। এই মালিকদের নিষ্ঠুরতা কে না জানে? সরকার প্রথম থেকেই যে দৃঢ়তা দেখিয়েছিল, তা জনস্বার্থেই রক্ষা করা উচিত ছিল। যদিও এ জাতি খুবই অসহিষ্ণু। আর এই জনগণকে অসহিষ্ণু করার জন্য অনেক কুবুদ্ধিমান লোকের অভাব নেই। দোকান মালিকরা এক ধরনের অতি চালাক দোকানদারদের সংখ্যা যোগ করেননি, তারা হচ্ছেন শিক্ষার দোকানদার। এই দোকানিদের আয় লাখ লাখ টাকা। স্কুল-কলেজে লেখাপড়া না করিয়ে নিজেরাই বড় দোকান, সুপার মার্কেট আর শপিংমল বানিয়ে শিক্ষার মতো মূল্যবান পণ্যকে বিক্রি করে চলেছেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বিশেষ করে বিসিএস পরীক্ষার জন্যও এদের কোচিং সেন্টার নিবেদিত। আরও আছে স্বাস্থ্যের ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার দোকান। এক উপজেলায় দেখা গেল একশ'টি ওষুধের দোকান, তার মানে প্রায় পঞ্চাশ থেকে একশ'টি ক্লিনিক আর পরীক্ষার কেন্দ্র। ঢাকা থেকে চিকিৎসকরা গিয়ে সেখানে রোগীর সংখ্যা বাড়ানোর কাজটি করে থাকেন। পণ্যের দোকান, শিক্ষার দোকান, স্বাস্থ্যের দোকান মিলিয়ে দেশটা এখন দোকানের। সরকার বলছে, এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না; অথচ এক ইঞ্চি জায়গাও দোকানিরা অব্যবহূত রাখছেন না। অনেক কৃষিপ্রধান দেশ আছে, যেখানে মাইলের পর মাইল গেলেও একটা দোকান পাওয়া যাবে না। দেশে এত দোকান কিন্তু পাঠাগার, বিনোদন কেন্দ্র, থিয়েটার, জাদুঘর খুঁজে বের করা মুশকিল। অথচ কোনো কোনো দেশে শপিংমল, সুপার মার্কেট করতে গেলে সেখানে বইয়ের দোকান, থিয়েটার, সিনেমা হল থাকতেই হবে।

খাদ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় মানুষের অবশ্যই লাগবে, তবে ২০৫০ সালে কোনো শিশুকে উচ্চস্বরে যেন মুখস্থ করতে না হয়, একটি জাতি বাজার করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে।

নাট্যব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×