ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

করোনা চিকিৎসা

মানবিকতা যেন ভুলে না যাই

মানবিকতা যেন ভুলে না যাই
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই ভাইরাসটির উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর খবর প্রায়শই সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখে আসছি। তাদের মৃত্যুর যথাযথ কারণ এতদিন আমাদের কাছে অস্পষ্ট থাকলেও এখন গবেষণার প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি- 'করোনা উপসর্গে মৃতদের বড় অংশই চিকিৎসা পাননি।' শুক্রবারের সমকালে ওই গবেষণার বিস্তারিত যে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, তাতে আমরা বিস্মিত। গবেষণায় ৮ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৮৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্তে মৃত্যুর প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। এদের মধ্যে অধিকাংশের বিনা চিকিৎসা বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আগেই মারা যাওয়ার বিষয়টি আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না।

করোনা উপসর্গে চিকিৎসা না পাওয়া সংক্রান্ত হৃদয়বিদারক কিছু খবরই হয়তো সংবাদমাধ্যমে এসেছে। গত মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমনের খবর হতে শুরু করে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ৯ ঘণ্টা কয়েক হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা না পাওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যুর মর্মান্তিক চিত্র সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ রোগী যাতে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা পান, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষও দাবি করে আসছে, তারা সবার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছে, কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক সে সময়েই বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ আলোচ্য গবেষণা প্রতিবেদনকেই সত্যায়ন করছে।

করোনা সংক্রমণের এ অবস্থায় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে ঠিক আছে, তার মানে এ নয় যে, সাধারণ রোগের চিকিৎসা থেকেও মানুষ বঞ্চিত হবেন। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ক্যান্সার, প্রসূতি মায়ের সেবা, দুর্ঘটনায় আহতসহ অন্যান্য নিয়মিত রোগের চিকিৎসা মিলছে না বলে রোগীরা অভিযোগ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও সংবাদমাধ্যমে আসার পর প্রধানমন্ত্রী চব্বিশ ঘণ্টা হাসপাতাল খোলা রাখার নির্দেশ দেন। সে নির্দেশনা অনুযায়ী খোলা থাকলেও অনেক সময় দেখা গেছে, চিকিৎসকই নেই। এ কারণে অনেক রোগীই জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো সেবা পেয়েছেন। কিন্তু এর মধ্যে যাদের করোনা উপসর্গ যেমন জ্বর, শ্বাসকষ্ট, কাশি ও সর্দি- এই চারটি লক্ষণ ছিল তাদের অধিকাংশই সেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এসব উপসর্গ নিয়ে সেবা না পেয়েই মারা যাওয়ার চিত্র আলোচ্য গবেষণা প্রতিবেদনে এসেছে। আমরা মনে করি, যথাসময়ে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীরা যথাযথ চিকিৎসা পেলে হয়তো কাউকে না কাউকে বাঁচানো যেত। তবে এই মৃত্যুগুলোর কতটি করোনায় আর কতটি নয়, তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও এ সময়ে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও ভঙ্গুর চিত্রই গবেষণায় উঠে এসেছে।

করোনার কারণে কেবল চিকিৎসার দুর্দশাই স্পষ্ট হয়নি বরং একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মানবিকতা ও দায়বদ্ধতার বিপরীত চিত্রও প্রতিভাত হয়েছে। এটা যেমন ঠিক যে, করোনার কারণে লকডাউনে ঘরে থাকা মানুষ পরিবারের নিবিড় সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়েছে। ব্যস্ত জীবনে বাবা-মাকে সন্তানরা কাছে না পাওয়ার যে দূরত্ব করোনা সেটা ঘুচিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এ করোনার কারণেই সংবাদমাধ্যমে বিপরীত চিত্রও এসেছে। করোনা সন্দেহে জন্মদাত্রী মাকে বনে ফেলার খবর যেমন আমাদের হতাশ করেছে, তেমনি অসুস্থ বৃদ্ধকে চরে ফেলে যাওয়ার খবরও পীড়াদায়ক। এমনকি করোনার শঙ্কায় ভাড়াটিয়াকে জোর করে বের করে দেওয়ার খবরও স্বস্তিদায়ক নয়। এমনকি পুলিশ, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ করোনাযোদ্ধাদেরও বাড়িওয়ালা কর্তৃক হয়রানির বিষয়গুলোও অমানবিক। এ প্রসঙ্গে শুক্রবারেই সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন প্রণিধানযোগ্য- করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় ঘরে ঢুকতে দেয়নি স্ত্রী-সন্তান। তাই বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিলে সেখানেই মৃত্যু হয় ঢাকার মিরপুর থেকে কুমিলল্গার দাউদকান্দিতে যাওয়া এক পোশাক শ্রমিকের।

করোনাভাইরাস মোকাবিলা কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই যখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন; এ সময় যখন সামাজিক দূরত্ব রাখাই চিকিৎসা; যখন সবাই দেখছে, চোখের সামনেই হয়তো প্রিয়জনের মৃত্যু; যখন করোনাজনিত হতাশায় আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ- ঠিক এ সময়ে মানুষ যদি যথাযথ চিকিৎসা না পায় কিংবা না পায় পরিবার ও সমাজের সহানুভূতি, সেটি নিশ্চয়ই অমানবিক, মর্মান্তিক ও দুর্ভাগ্যজনক। আমরা মনে করি এ সময় বরং বেশি করে চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আর অধিক পরিমাণে প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের কাছে থাকা। তাহলেই একটা মানবিক পৃথিবী গড়া সম্ভব। তবে হ্যাঁ, এসব ক্ষেত্রে নিজের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সচেতনতার বিষয়টিও আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

আরও পড়ুন

×