অন্যদৃষ্টি
স্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্ত কারা নেন?
প্রতীকী ছবি
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
প্রকাশ: ১০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
দেশব্যাপী কভিড-১৯-এর ব্যাপক বিস্তার, সেই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার নানান অব্যবস্থাপনার পরিপ্রেক্ষিতে যে প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে, তা হলো দেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসলে কারা নেন?
একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সরাসরি উপকারভোগী হচ্ছেন সাধারণ জনগণ। সাধারণভাবে এরা 'রোগী' নামে পরিচিত। এই রোগীদের জন্য দেশে তিন স্তরের সেবা ব্যবস্থা বিদ্যমান- প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি। প্রাইমারি স্তরের মধ্যে আছে কমিউনিটি পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেল্গক্স; সেকেন্ডারি স্তরে রয়েছে জেলা শহরে সদর হাসপাতাল আর টারশিয়ারি পর্যায়ে রয়েছে বিশেষায়িত হাসপাতাল। এর বাইরে আছে বেসরকারি হাসপাতাল, এনজিও ক্লিনিক এবং নানান চিকিৎসাসেবা, যেমন পল্লি চিকিৎসক বা কোয়াক।
সরকারি সেক্টরে প্রাইমারি (কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যতীত), সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি পর্যায়ে ডাক্তাররা সবাই এমবিবিএস ডিগ্রিধারী এবং এদের মধ্যে একটা উলেল্গখযোগ্য সংখ্যক হচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের প্রায় সবাই প্রতিযোগিতামূলক বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। নিয়োগপ্রাপ্তরা কর্মজীবনে দ্রুত পদোন্নতি পান এবং একটি পর্যায়ে এসে কেউ কেউ সংশ্নিষ্ট বিভাগের প্রধান বা শীর্ষ পদটিতে আসীন হন।
অধিদপ্তর এমন একটি কাঠামো, যেটি হচ্ছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির মূল বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি অধিদপ্তর নির্দেশিত ও পরিচালিত হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্বারা, যেমন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা যেমন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলপত্র ইত্যাদি প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের একটি ভূমিকা থাকে বটে, কিন্তু সার্বিকভাবে দেশের পরিকল্পনা প্রণয়ন, এর চূড়ান্ত অনুমোদন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি এখনও মন্ত্রণালয়নির্ভর, যেখানে মূল সিদ্ধান্ত নেন আমলারা। তারা মূলত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা (কিছু ব্যতিক্রম বাদে)। একজন আমলা আগে কোনো মন্ত্রণালয়ে কাজ না করলে সাধারণভাবে সে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিশদ ধারণা রাখেন না। তার পরও নিয়োগ প্রক্রিয়া বা পদায়নের এই প্রথাটি চলে এসেছে ঔপনিবেশিকতার ধারাবাহিকতার কারণে তথা 'শাসন করার' দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।
অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মতো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও এই শাসন কাঠামোর অংশ। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন এ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, এই মন্ত্রণালয়ের দু'জন সচিব ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে অতিরিক্ত সচিব আছেন ১০ জন ও যুগ্ম সচিব আছেন ১৩ (এই ১৩ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে দু'জন সম্ভবত চিকিৎসক)। মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে অতিরিক্ত সচিব আছেন পাঁচজন ও যুগ্ম সচিব আছেন ছয়জন। উপ সচিব ও এর নিচের দিকে না-ই গেলাম। কারণ যুগ্ম সচিব ও এর ওপরের পদগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে।
খুব স্বাভাবিক যে, তারা সবাই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। এটি দোষের কিছু নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, দেশের শাসন ব্যবস্থার পদ্ধতি অনুযায়ী তারা কেউই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কর্মকর্তা নন। তারা আজ স্বাস্থ্যে, কাল ধর্মে, পরশু হয়তো বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ে অথবা তুলা উন্নয়ন বোর্ডে! অর্থাৎ, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তারা স্থায়ী অংশ নন বদলিজনিত চাকরির কারণে। তাদের বেশিরভাগেরই হয়তো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কিংবা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো পড়াশোনা। অনেকে যুক্তি দেখাবেন, তারা তো বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেন নীতিমালা ইত্যাদি প্রণয়নে। সেটি সত্য কিন্তু এটি আরও বেশি সত্য যে, নীতিমালা থাকার চেয়ে তা বাস্তবায়নই আসল কথা। তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন বা বিষয় হলো হাসপাতাল বা ফ্যাসিলিটি পর্যায়ে কর্মরত হাজার হাজার চিকিৎসাকর্মীর মতামতকে তারা কীভাবে নীতিমালায় স্থান দেন কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। সরাসরি রোগী নিয়ে কাজ করেন এ রকম চিকিৎসকের মতামতকে উপেক্ষা করা খুব অস্বাভাবিক নয়।
সুশাসন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সঙ্গে অংশগ্রহণকেও জরুরি মনে করা হয়। তারই আলোকে খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরই নীতি-কাঠামোতে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানান নির্দেশনা ও উদ্যোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের উদ্যোগের আলোকে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সকল সরকারি হাসপাতালে 'চৌগাছা-ঝিনাইদহ জনসম্পৃক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা মডেল' বাস্তবায়নের নির্দেশনা জারি আছে আগে থেকেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্দেশনা যেখানে জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে, সেখানে কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসকদের মতামতকেই যেন চরম অবহেলার চোখে দেখা হচ্ছে। ভবিষতে হয়তো আরও মহামারি আসবে কিন্তু শাসন ব্যবস্থার এই জটিলতাগুলো দূর করতে না পারলে আমাদের মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলই বেশি হবে।
জনস্বাস্থ্যকর্মী
[email protected]