নতুন অর্থবছর
বড় বাজেট, বৃহত্তর বাধা
ফাইল ছবি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
করোনা পরিস্থিতিতে অনেক কিছু এমনকি খোদ অর্থনীতি থমকে গেলেও গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে নতুন অর্থবছর ২০২০-২১। রোববার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যেই চলছে জাতীয় বাজেট চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া। সরকার পরিচালনা সুষ্ঠু রাখতে এর বিকল্পও নেই। আমরা দেখছি, করোনার কারণে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময় স্থগিত হলেও ওয়েবসাইটে মতামত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১১ জুন বাজেট পেশ করা হবে। আলোচ্য প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবর উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তার মানে, বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে প্রতিবছর আগের বছরের বাজেটের আকারকে বড় অঙ্কে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা গেছে, এবারও তা অব্যাহত থাকছে। এর বিকল্পও নেই, বলা বাহুল্য। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অর্থনীতির আকার যখন ক্রমশ বড় হচ্ছে, বাজেটের আকারকেও তার সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে বৈকি।
আকার বৃদ্ধির প্রবণতা বিগত অর্থবছরগুলোর বাজেটের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হলেও এবার বরাদ্দের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ভিন্ন চিত্র দেখা যাবে। করোনা পরিস্থিতিতে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ আরও বহুগুণ বাড়ানো দরকার। নতুন অর্থবছরের বাজট সামনে রেখে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি শনিবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যেসব সুপারিশ তুলে ধরেছে, সেখানেও জোর দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। তারা যথার্থই বলেছে- বাংলাদেশে নাগরিকদের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় যে ব্যয় করতে হয়, তা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। আমরাও মনে করি, অভ্যন্তরীণ জাতীয় আয়ের অন্তত ২ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হওয়া উচিত। করোনা ভাইরাসের এই অভিজ্ঞতার পর এ ব্যাপারে আর দ্বিধা থাকা উচিত নয়। আমরা জানি, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বর্তমান সরকার প্রথম থেকেই বিশেষ মনোযোগ দিয়ে এসেছে। এখন তার আওতা ও মাত্রা আরও বাড়াতে হবে। একই কথা বলা চলে কৃষি তথা খাদ্য উৎপাদন বিষয়েও। আমরা জানি, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে খাদ্যশস্য উৎপাদনে কেবল স্বয়ংসম্পূর্ণই হয়নি, কয়েক মাস আগে মোটা চাল রপ্তানির জন্য আলাপ-আলোচনাও শুরু করেছিল। তখন এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা দ্বিমত জানিয়ে বলেছিলাম যে, দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের খাদ্যশস্য রপ্তানিতে যাওয়া উচিত হবে না। করোনাভাইরাসের মতো দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি আমাদের সেই আশঙ্কাকে প্রমাণ করেছে।
সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই অবশ্য বলা হয়েছে, এবার বাজেটে বড় বরাদ্দ থাকছে স্বাস্থ্য, খাদ্য উৎপাদন ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। আমরা দেখছি, সিপিডির সুপারিশেও এসব খাতেই জোর দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কর্মসংস্থানের প্রতি জোর দিতে বলব আমরা। কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক তৎপরতা স্থবির হয়েছে বলে নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের প্রবাসী কর্মীরা যেভাবে দেশে ফিরে আসছেন, তাতে করে কর্মহীনতা বেড়ে যাবে। নতুন কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে সরকারের দিক থেকে পরিকল্পনা ও প্রণোদনা অবশ্যই প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে জোর দিতে হবে আর্থিক নীতি সংস্কার এবং অপচয় রোধে। আমরা বিশ্বাস করি, অনিয়ম ও অপচয় কমে গেলেই অপেক্ষাকৃত অল্প বরাদ্দেও বড় সাফল্য সম্ভব।
জাতীয় বাজেট মানে কেবল বরাদ্দ নয়, অর্থের সংস্থানও। আমাদের দেশে যদিও ঐতিহ্যগতভাবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদাননির্ভর জাতীয় বাজেট ছিল, বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে ক্রমেই অভ্যন্তরীণ উৎসে জোর দেওয়া হচ্ছে। আগামী বাজেটে তা স্বভাবতই কঠিন হবে। সিপিডির সুপারিশে যদিও করজাল সম্প্রসারিত করার কথা বলা হয়েছে, এর বাস্তবতা সম্পর্কে আমরা সন্দিহান। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকায় একদিকে যেমন ব্যয় বাড়বে, তেমনই কমবে রাজস্ব আয়। আবার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান নির্ভরতার পুরোনো ছকে ফিরে যাওয়াও কঠিন। কারণ গোটা বিশ্বই করোনা ঝড়ে কাবু। নতুন অর্থবছরের জন্য এই পরিস্থিতিই বৃহত্তর বাধা। আবার পরিস্থিতি উত্তরণে বড় বাজেটের বিকল্পও নেই। আমরা মনে করি, এখানেই প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও পদক্ষেপ। আমরা চাই, নতুন বাজটে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য যেমন থাকবে, তেমনই থাকবে পরিস্থিতি উত্তরণের দিশা। বড় বাজেট প্রণয়ন করেই বৃহত্তর বাধাটি উত্তরণ সম্ভব হবে। কেবল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়ানো নয়; বরং আগামী বাজেট হবে গত এক দশক ধরে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের পথে আরেকটি মাইলফলক।