ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

জেআরসি: তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের নেপথ্য নায়ক

জেআরসি: তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের নেপথ্য নায়ক
×

সৈয়দ জিয়াউল হক

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সাতসকালে কোনো সময়ে টেলিফোন বাজলে অজানা আশঙ্কায় বুকটা ধক্‌ করে ওঠে। এমনি একটি টেলিফোন পাই গত ২৮ এপ্রিল ভোরে। কোনো দুঃসংবাদ নয়তো! আমার আশঙ্কাই সত্য হলো। টেলিফোনের ওপাশ থেকে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনামুল কবির জানালেন সেই মহা দুঃসংবাদ- প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী কিছুক্ষণ আগে ইন্তেকাল করেছেন। টেলিফোনটা রাখতেই আমেরিকার ডালাস থেকে আমার বোন বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পাস করা কৃতী ছাত্রী ফওজিয়া পারভীন এবং সিয়াটল থেকে আমার জামাতা বুয়েটের একই বিভাগ থেকে পাস করা মাইক্রোসফটের কৃতী ইঞ্জিনিয়ার মো. আহসানুর রশীদও একই সংবাদ জানালেন। যার সঙ্গে বিগত পঁয়ত্রিশ বছরের নানান স্মৃতি, তার মৃত্যুসংবাদে আমার মাথার ওপরে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মনে পড়ল চীনে কর্মরত আমেরিকান ডাক্তার নরম্যান বেথুনের মৃত্যুতে মাও সে তুংয়ের উক্তি, 'কোনো কোনো মৃত্যু হাঁসের পালকের চেয়েও হালকা, কোনো কোনো মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী।' জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের মৃত্যু তেমনই আমার কাছে হিমালয় পর্বতের চেয়েও ভারী।
যদিও আমি প্রফেসর জামিলুর রেজার সরাসরি ছাত্র ছিলাম না তথাপি তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয় ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির যুগ্ম সচিব হিসেবে। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের প্রফেসর আবদুল মতিন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সোসাইটি। জামিল স্যার ছিলেন সোসাইটির পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ উপকমিটির চেয়ারম্যান এবং আমি সদস্য সচিব। ১৯৭৮ সালে বুয়েট কম্পিউটার সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে প্রফেসর মতিন পাটওয়ারী এর প্রথম পরিচালক হন। ১৯৮৩ সালে তিনি বুয়েটের উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ার পর সেপ্টেম্বরে জামিল স্যার পরিচালক হন। দশ বছরেরও অধিককাল তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। অফিস ছুটির পর আমার নিয়মিত কাজ ছিল বুয়েট কম্পিউটার সেন্টারে অবস্থিত সোসাইটির অফিসে যাওয়া। সোসাইটির কাজ ছাড়াও আমার নিয়মিত সেখানে যওয়ার মূল আকর্ষণ ছিল, জামিল স্যারের সান্নিধ্য যা আমার জীবনের পরম পাওয়া। প্রকৌশলের বিভিন্ন শাখা থেকে শুরু করে চর্যাপদ পর্যন্ত এমন কোনো বিষয় নেই যার ওপর তার দখল ছিল না।
আমি বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সচিব পদে যোগদানের পর থেকে সরকারি বিভিন্ন কমিটিতে তার সঙ্গে কাজ করার আরও বেশি সুযোগ পেয়েছি। ততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞ এবং অভিভাবক। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের উদ্যোগে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ প্রদানের জন্য জামিল স্যারের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্স ৪৫টি সুপারিশ সরকারের কাছে পেশ করে। জেআরসি কমিটির রিপোর্ট নামে পরিচিত এটিই ছিল তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবে যাত্রা শুরু করার প্রথম দিকনির্দেশনামূলক দলিল। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের সব বড় অর্জন এবং আইসিটি নীতি ও এ সম্পর্কিত যাবতীয় আইনকানুন ও নীতিমালা প্রণয়নে তিনিই ছিলেন মূল ব্যক্তিত্ব।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের উদ্যোগে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এদেশে প্রথম প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালে। বুয়েটের সিএসই বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের প্রতিভাবান ছাত্র জাকারিয়া স্বপন ছিলেন এর প্রধান উদ্যোক্তা। প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ৫ আগস্ট হোটেল শেরাটনের নিচতলার বলরুমে। পাটওয়ারী স্যার ও জামিল স্যারের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিনের সেই ছোট অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করে নবীন প্রোগ্রামারদের যে উৎসাহ প্রদান করেছিলেন তা সত্যিই অতুলনীয়।
প্রফেসর জামিলুর রেজার সঙ্গে আমার সরকারি সফরে একাধিকবার বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এর মধ্যে ২০০০ সালে আমেরিকায় 'সিলিকন বাংলা ইনফরমেশন টেকনোলজি কনফারেন্স' এবং ২০০১ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক স্থাপনের বিষয়ে প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নের উদ্দেশ্যে তার নেতৃত্বে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত টিমে কয়েকটি দেশের হাইটেক পার্ক পরিদর্শন উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সভায় প্রফেসর জামিলের পাণ্ডিত্য ও দক্ষতা দেখে আমাকে অনেকে জিজ্ঞাসা করেছেন তিনি কোন শাখার ইঞ্জিনিয়ার, আবার কেউ জানতে চেয়েছেন তিনি অর্থনীতিবিদ কিনা। যখন যে বিষয়ে কথা বলতেন মনে হতো তিনি সেই বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞ।
২০১৮ সালের মাঝামাঝি একদিন জামিল স্যার আমাকে ফোন করে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। পরদিন এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সঙ্গে অনেক আলোচনার পর তিনি আমাকে 'হিস্ট্রি অব কম্পিউটারাইজেশন ইন ইস্ট পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ' নামে একটি বই রচনা করতে অনুরোধ করেন এবং এ বিষয়ে তিনি প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ডকুমেন্ট প্রদানের আশ্বাস দেন। কিন্তু নানা কারণে স্যারের নির্দেশমতো বইটি লেখার কাজ শুরু করতে পারিনি। এই মনোকষ্ট আমাকে সারাজীবন বহন করতে হবে। শেষের দিকে তিনি আমাকে বলতেন শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না- এটুকুই। কিন্তু ড. পাটওয়ারী স্যারের কাছে শুনলাম মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে ২৩ এপ্রিল তাকে ফোন করে তিনি বলেছিলেন যে, তার ভালো লাগছে না, শুধু শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে- যে কথা আগে কখনও বলেননি। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে তার শরীরটা কি ভেঙে পড়েছিল? দেশের কোনো বরেণ্যে ব্যক্তির মৃত্যুকে আমরা সব সময়ে অপূরণীয় ক্ষতি বলে উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু কারও স্থান শূন্য থাকে না, পূরণ হয়েই যায়। তবে প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীর স্থান যে পূরণ হওয়ার নয়, এ কথা নির্দি্বধায় বলতে পারি।
প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ; সাবেক সচিব, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল
প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ; সাবেক সচিব বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল

আরও পড়ুন

×