ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

জঙ্গিরা সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে

জঙ্গিরা সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে
×

মোহাম্মাদ আলী শিকদার

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সঙ্গত কারণেই করোনার ধাক্কায় অন্যান্য খবর এই মুহূর্তে মিডিয়ায় তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। করোনা মানবসভ্যতার জন্য এক মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় চ্যালেঞ্জ বিশ্ব আর কখনও ফেস করেনি। এ কথাটি স্বয়ং অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বলেছেন। করোনা সংকট এখন শুধু করোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর ভয়ানক থাবা অর্থনীতির সব সেক্টরের ওপর পড়তে শুরু করেছে। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হলে অন্যান্য সব অপরাধ বৃদ্ধি পায়। বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। করোনার আরও অভিঘাত হয়তো অপেক্ষা করছে। কখন কোনটা হানা দেবে, বলা যায় না। করোনা আসার আগে ইসলামিস্ট উগ্রবাদী সশস্ত্র জঙ্গি তৎপরতায় পুরো বিশ্ব তটস্থ ছিল। জঙ্গিদের অন্যতম একটি মৌলিক কৌশল হলো, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখনই তারা জোরেশোরে মাঠে নামে। মানুষকে ধর্মের ভয় দেখিয়ে সহজে দলে ভেড়াতে পারে। সামাজিক মাধ্যম খুললেই এখন দেখা যায় করোনা নিয়ে অপ্রতিরোধ্য এবং লাগামহীন বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে বলেছে। ধর্মান্ধরা যে কথাটি গোপন রাখছে তা হলো, ইতোপূর্বে মানুষ এর চেয়েও বড় মহামারি জয় করে মানবসভ্যতার অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছে।
লেখার শুরুতে কথাগুলো বললাম এই কারণে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি একটি দৈনিকের খবরের সূত্রে জানা যায়- করোনার কারণে সারাদেশের মানুষ যখন বহু রকম সংকটে ভুগছে, তখন জঙ্গিগোষ্ঠী অনলাইনসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে দুর্বল চিত্তের মানুষদের জঙ্গি দলে ভেড়াবার চেষ্টা করছে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান অ্যাডিশনাল আইজি মনিরুল ইসলাম বলেছেন, পুলিশ ইতোমধ্যে উগ্রবাদীদের কয়েকটি উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়েছে। ৩০ এপ্রিল আনসার আল ইসলামের এক শীর্ষ নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে সগির আহমদ গ্রেপ্তার হয়েছে। জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে গত মার্চ মাসে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এক নারীসহ পাঁচ সদস্য গ্রেপ্তার হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের এক পুলিশ বক্সে বোমা বিস্ম্ফোরণ ঘটনার দায়ে গত ৫ মে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তিন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা সবাই অনলাইনের প্রচারে উদ্বুদ্ধ হয়ে জঙ্গি দলে যোগদান করে। মোট কথা, এই সময়ে জঙ্গিরা মোটেও বসে নেই। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জঙ্গিরা সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে শুধু নিজেদের প্রচারের জন্য ব্যবহার করছে তাই নয়, তারা সাইবার যুদ্ধ প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তো রয়েছেই। বাংলাদেশও এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সুতরাং রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাইবার স্পেসগুলোর সুরক্ষার জন্য সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য বড় সব দেশের সামরিক বাহিনীতে এখন সাইবার যুদ্ধের জন্য আলাদা ফোর্স আছে। এর মধ্যে আরেকটু খবর বেরিয়েছে গত ৬ তারিখে। ঢাকার কাউন্টার টেররিজম ইউনিট মে মাসের ৫ তারিখে কাকরাইল থেকে ১৭ জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। এই জঙ্গিরা নাকি সৌদি আরবে হিজরত করার জন্য একসঙ্গে হয়েছিল। স্থলপথে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টাও তারা করেছে। কিন্তু পারেনি। পুলিশের ভাষ্যমতে, সৈয়দ মোশতাক বিন আরমান নামের বাংলাদেশি এক ইঞ্জিনিয়ার ২০১৭ সালে সৌদি আরবে গিয়েছে এবং সেখান থেকেই ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশি যুবকদের সৌদিতে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। সৌদি আরব থেকে তারা ইমাম মেহেদীর সৈন্যরূপে সব দেশে ছড়িয়ে পড়বে এবং ইসলামী বিশ্ব কায়েমের জন্য যুদ্ধ করবে। এর আগেও বাংলাদেশের অনেকেসহ বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বেশকিছু তরুণ-তরুণী বিভিন্ন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছে। এর শুরু আশির দশকের গোড়ায় আফগানিস্তান থেকে। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানফেরত একটি গ্রুপ নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম বা হুজি গঠন করে। এই হুজির সদস্য কর্তৃক ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গিদের সশস্ত্র তৎপরতার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অন্যদিকে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিছু ব্যক্তি কখনও এককভাবে, আবার কখনও সংঘবদ্ধভাবে ওইসব দেশে জঙ্গি তৎপরতা চালাবার চেষ্টা করে। তাতে বাংলাদেশের জন্য পরোক্ষভাবে যেমন নিরাপত্তার হুমকি সৃষ্টি হয়, তেমনি ওইসব দেশে বসবাসকারী বৃহত্তর বাংলাদেশি সমাজ বহুবিধ সমস্যার মধ্যে পতিত হয়।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের তৎপরতা ও হুমকি শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে নয়, এর ডালপালা ছড়িয়ে আছে বিশ্বব্যাপী। সুতরাং জঙ্গিরা বোধহয় নিঃশেষ হয়ে গেছে এ রকম ধারণা হবে মহা আত্মঘাতী। এ কথা ঠিক, বিশ্বব্যাপী জঙ্গিরা এখন অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে আছে। সৌদি আরব এখন আর বাংলাদেশি জঙ্গিদের জন্য স্বস্তিদায়ক দেশ নয়। সেখানকার ক্ষমতাধর যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের নতুন সংস্কার নীতির কারণে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী আর সহজে সৌদি সরকারের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাবে না। তবে আমাদের পুলিশ বাহিনীর আত্মতুষ্টিতে থাকার কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, জামায়াতের লাখ লাখ ক্যাডার বাহিনী, যাদের থেকেই মূলত জঙ্গিদের রিক্রুটমেন্ট বেশি, তারা বহাল তবিয়তেই আছে।
জঙ্গিদের অন্যতম একটি কৌশল হলো, যখন তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন বিচ্ছিন্নভাবে হলেও বড় ধরনের নাশকতামূলক কাজ করে সবাইকে জানান দিতে চায় তারা এখনও সক্রিয় আছে। এই সময়ে এই আশঙ্কাটিই প্রবল। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সেটা খবরেও এসেছে। সব গোয়েন্দা সংস্থাসহ বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী এখন করোনা-সংক্রান্ত দায়িত্বে প্রচণ্ডভাবে ব্যস্ত। এ ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনী অসাধারণ ভূমিকা রাখছে। তবে এই সুযোগটা যাতে জঙ্গিরা নিতে না পারে, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। সম্প্রতি জঙ্গিদের তৎপরতা সম্পর্কে যে কয়টি খবর বেরিয়েছে, তা বিশ্নেষণ করলে বোঝা যায় জঙ্গিরা বসে নেই। তারা দেশের ভেতরে যেমন গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে, তেমনি বিদেশে যেসব বাংলাদেশি জঙ্গি সদস্য রয়েছে, তাদের সঙ্গেও একটা যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। এখন পুলিশ যেভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দায়িত্ব পালন
করছে, তাতে পুলিশ সদস্যরা বিচ্ছিন্নভাবে জঙ্গিদের টার্গেট হতে পারে। কারণ, পুলিশের ওপর জঙ্গিদের আক্রোশ তো নতুন নয়।
সুতরাং সাইবার স্পেস মনিটরিং যেমন জোরদার করা উচিত, তার সঙ্গে পুলিশের প্রত্যেক সদস্যকে সব সময় জঙ্গি হুমকির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। ওদের কোনো মনুষ্যত্ব ও মানবতা নেই। তারা সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে।
[email protected]
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্নেষক; মেজর জেনারেল (অব.)

আরও পড়ুন

×