ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

শিক্ষায় করোনার প্রভাব

ঝরে পড়া রোধে এখনই ব্যবস্থা নিন

ঝরে পড়া রোধে এখনই ব্যবস্থা নিন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা নতুন নয়। দশ বছর আগেও আমরা দেখেছি, কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই ঝরে যেত। এমনকি মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ত তার চেয়েও বেশি। শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের নানামুখী কর্মকাণ্ড, শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও অভিভাবকের সচেতনতায় ঝরে পড়ার হার অনেক কমে এসেছে। ঝরে পড়া একেবারে বন্ধ না হলেও দিন দিন বিদ্যালয়ে শিশুর অন্তর্ভুক্তি ও শিক্ষা সমাপ্তির হার বাড়ছিল। শিক্ষার সার্বিক চিত্র যখন সন্তোষজনক পর্যায়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সমুপস্থিত করোনাদুর্যোগ। করোনাভাইরাসের প্রভাব যেমন অন্যান্য খাতে পড়েছে তেমনি এর কারণে শিক্ষা খাতেও বিপর্যয় অত্যাসন্ন।
মঙ্গলবারের সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বলছে, করোনার পরে ৩০ ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে পারে। শিক্ষাব্যবস্থায় কভিড-১৯ মহামারির প্রভাব মোকাবিলা শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য উঠে আসে। আমরা মনে করি, এটি সময়োপযোগী পর্যবেক্ষণ এবং এ নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর উদ্যোগে এই অনলাইন সেমিনারে আলোচকদের বক্তব্যে যথার্থই উঠে এসেছে, করোনার পরে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী হয়তো স্কুলে আর ফিরে না-ও আসতে পারে। এর বহুবিধ কারণ স্পষ্ট। চলমান মহামারির কারণে অনেক গরিব পরিবার আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়বে, সেক্ষেত্রে তাদের সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে কাজে পাঠাতে চাইবে। এমনকি মহামারি-উত্তর পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষেই শিক্ষা উপকরণ ক্রয় করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাতেও রয়েছে ঝরে পড়ার ঝুঁকি।
করোনা মহামারির ফলে শিক্ষায় বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে। আমরা দেখছি, দু'মাসের অধিককাল ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে এবং সেপ্টেম্বরের আগে খোলার কোনো সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়। এ সময়ের মধ্যে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চলছে এটা ঠিক। সংসদ টিভির মাধ্যমে যেমন শিক্ষার্থীদের পাঠদান হচ্ছে, তেমনি অনলাইন শিক্ষায় বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে, যা সময়ের বিবেচনায় প্রশংসনীয় বটে। কিন্তু সমস্যা হলো, সব শিক্ষার্থীর রেডিও, টিভি কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। এমনকি পরিসংখ্যান বলছে, অর্ধেক শিক্ষার্থীও এসবের আওতায় নেই। এক্ষেত্রে শহরের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে থাকবে। গ্রামেও অনেকে এ সুযোগ পাবে বটে কিন্তু উল্লেখযোগ্য অংশই বঞ্চিত থাকছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বৈষম্যও ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে প্রভাবক ভূমিকা পালন করতে পারে।
মহামারি শেষ হয়ে যাওয়ার পরে ঝরে পড়ার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতিবাচক আরও কিছু প্রভাব দৃশ্যমান হবে। শিশুশ্রম বাড়বে। খাবারের অভাব তাদের শ্রম দিতে বাধ্য করবে। একইসঙ্গে বাল্যবিয়েও বাড়তে পারে। আমরা চাই না সরকারের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলে শিক্ষায় যে গতি আসছে তা নিম্নমুখী হোক। এজন্য পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এখনই। এ ব্যাপারে সানেমের সেমিনার থেকে যে প্রস্তাবনা এসেছে, তা বাস্তবায়ন করলে ঝরে পড়া রোধ করা যাবে বলে আমরা মনে করি। যে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে, তাদের একটা ডাটাবেস সরকারিভাবে এখনই করা দরকার। এ তালিকা শিক্ষকদের কাজে লাগানো যেতে পারে। সে পরিবারগুলোকে শিক্ষার্থীপ্রতি মাসে তিন/চারশ' টাকা বৃত্তি ও একবেলা করে খাবারের ব্যবস্থা করলে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। এক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার সুপারিশ করেছেন সেমিানারের আলোচকরা।
শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়া যেমন উদ্বেগের, একই সঙ্গে করোনাভাইরাসের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছেন শিক্ষকরাও। বেসরকারি ও প্রাইভেট অনেক প্রতিষ্ঠানই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ও শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি না পাওয়ায় অনেক শিক্ষকের বেতন ঠিকমতো দিতে পারছেন না। তাই শিক্ষকদের প্রণোদনা দিয়ে হোক কিংবা বাজেটে তাদের কথা ভেবে শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ঝরে পড়ার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
আমাদের দেশের জন্য ঝরে পড়া এমনিতেই শিক্ষার অন্যতম সমস্যা। এখনও প্রাথমিকে প্রায় আঠারো ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। করোনার প্রভাবে এ হার যেন আরও না বাড়ে, সে জন্য এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যালয়ভিত্তিক কিংবা এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখা দরকার, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরাই ঝরে যায়। এসব পরিবারকে সরকার যে সাহায্য প্রদান করছে, সেটিও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। তবে আমরা চাই এ সাহায্য অব্যাহত থাকুক। সব শিশুর বিদ্যালয় গমন যেমন আমরা নিশ্চিত করতে চাই, তেমনি প্রত্যেকে মৌলিক শিক্ষা অর্জন করুক এটা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন

×