কাইউম স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা
×
সৌমিত্র শেখর
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২০ | ১২:০০
মোহাম্মদ আবদুল কাইউমের 'বৈবাহিক' এবং সাংবাদিক ও সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বেদু শুক্রবার ফোনে জানালেন: সেদিনই ভোর ৬টায় 'কাইউম সাহেব' মারা গেছেন। সংবাদটি আমার কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো।
মোহাম্মদ আবদুল কাইউম ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি ভারত-ভাগোত্তর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম কারিগর। জন্মেছিলেন ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি, ঢাকার রহমতগঞ্জে। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে আরমানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (১৯৫৩) ও স্নাতকোত্তর (১৯৫৪) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি 'হ্যালহেড থেকে হাউসটনের ব্যাকরণ' নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মসূত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন।
মোহাম্মদ আবদুল কাইউম শুধু অধ্যাপক নন, ছিলেন জাত-গবেষক এবং মুসলিম জীবনদর্শন সুপ্রকাশ্যে আনার একনিষ্ঠ কর্মী। এটি তিনি পেয়েছিলেন পিতা মোহাম্মদ কাসেমের কাছ থেকে। তার পিতা জীবিকা নির্বাহের জন্য একসময় মণিহারি দোকানের কর্মচারী ছিলেন বটে, কিন্তু তখনই 'অভিযান' বলে পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং 'মুসলিম সাহিত্য-সমাজে'র সঙ্গে যুক্ত হন। কাজী নজরুল ইসলাম 'অভিযান'-এ লিখেছেন। মোহাম্মদ আবদুল কাইউম সেই ধারাবাহিকতাতেই গবেষণা করেছেন এবং 'মুহম্মদ এনামুল হক' (জীবনী), 'খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ' (জীবনী), 'কাজী ইমদাদুল হক' (জীবনী), 'আর্জুমন্দ আলীর প্রেমদর্পণ' (সম্পাদনা), 'মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ রচনাবলী' (সম্পাদনা); 'সাময়িকপত্রে (মুসলিম) সাহিত্যিক প্রসঙ্গ', 'আলাওল রচিত সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী' (সম্পাদনা), 'মীর মশাররফ হোসেন ও শতবর্ষে বিষাদ-সিন্ধু' (সংগ্রহ), 'আলাওল রচনাবলী' (সম্পাদনা), 'চকবাজারের কেতাবপট্টি', 'রত্নবতী থেকে অগ্নি-বীণা : সমকালের দর্পণে' (সংগ্রহ), 'নানা প্রসঙ্গে নজরুল' (সংগ্রহ), 'নজরুল-সংবর্ধনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ' ইত্যাদি গ্রন্থ জাতিকে উপহার দিয়েছেন। পত্রিকা থেকে হারিয়ে যেতে পারে এমন মুসলিম-প্রসঙ্গ এ যুগের পাঠকদের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি সংকলন করেছেন। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত 'পাণ্ডুলিপি পাঠ ও পাঠ-সমালোচনা' বইটি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা পাণ্ডুলিপি পাঠের ক্ষেত্রে পদ্ধতিবিদ্যা পরিচয়ের একেবারে প্রাথমিক ও অবশ্যপাঠ্য বই হিসেবে এখনও বিবেচিত। তিনি অভিধান ও বানান বিষয়ে নানা সংসর্গে কাজ করেছেন। পেয়েছিলেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও পদক। যেমন : বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গবেষণা পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, দেওয়ান আবদুল হামিদ পুরস্কার, নজরুল একাডেমি পদক, কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশ পুরস্কার ইত্যাদি।
আমি মোহাম্মদ আবদুল কাইউমকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। তিনি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না, কিন্তু তীক্ষষ্ট ছিল তার দৃষ্টি। আপাত রসকষহীন বিষয় তিনি আমাদের পড়াতেন। ভাষার ইতিহাস, পাণ্ডুলিপি পাঠ ও পাঠ-সমালোচনা আমি তার কাছেই পড়েছি। মুসলিম সাহিত্যিকদের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে তার আগ্রহ থাকলেও নজরুলের ওপর তার লেখালেখি অনেক পরে শুরু হয়েছে। বই তো বের হয়েছে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে ('নানা প্রসঙ্গে নজরুল')। কিন্তু তিনি ১৯৮৯ সালেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল-অধ্যাপক হয়েছিলেন। অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান তাকে খুব স্নেহ করতেন। কারণ, আমাদের স্যার ছিলেন সৈয়দ আলী আহসানের ছাত্র এবং পিতার সূত্রেও তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমরা এসব জেনেছি অনেক পরে। জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আমরা যখন আন্দোলন করছিলাম, তখন এরশাদের পক্ষাবলম্বনকারী ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে আমাদের স্যারের ঘনিষ্ঠতায় খুব পীড়িত হতাম।
এমএ পাসের শেষে কলকাতায় পিএইচডি করে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদানের পর কাইউম স্যারের স্ত্রী অধ্যাপক রাজিয়া সুলতানার সহকর্মী হই। মিরপুর থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই মাইক্রোবাসে আসা-যাওয়া করেছি। মিরপুরে স্যারের 'সঞ্চিতা' নামে বাড়ি ছিল। ছাত্রজীবনে বিভাগের কোনো কাজে সেই বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বসবার ঘরটা যেন হাজার বইয়ের লাইব্রেরি বানিয়ে রেখেছিলেন তারা। পরে বাড়িটি বিক্রি করে যখন হাতিরপুলে ভাড়া ফ্ল্যাটে তারা ওঠেন তখন বেশ কয়েকবার সেই বাসায় আমার যাওয়া হয়। এ সময় স্যার আমার ওপর আস্থা রাখতেন। অনেক গোপনীয় রিপোর্ট বা লেখার দ্বিতীয় সাক্ষী ছিলাম আমি। প্রথম সাক্ষী অবশ্যই তার স্ত্রী রাজিয়া আপা। রাজিয়া আপার সরলতা ছিল অপার। আবদুল হাকিমের ওপর পিএইচডি করা এই মহীয়সী নারী স্যারকে তার গবেষণায় প্রেরণা জুগিয়েছেন। এখন সেই যুগলবন্দি ছিন্ন হলো।
পারিবারিকভাবে অত্যন্ত সচেতন ও হিসাবি পথে চলেছেন আমাদের স্যার মোহাম্মদ আবদুল কাইউম। তাই আমাদের জানামতে, সবই গুছিয়ে রেখে গেছেন তিনি। লালবাগে পিতার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত এই মহান শিক্ষককে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মোহাম্মদ আবদুল কাইউম ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি ভারত-ভাগোত্তর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম কারিগর। জন্মেছিলেন ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি, ঢাকার রহমতগঞ্জে। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে আরমানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (১৯৫৩) ও স্নাতকোত্তর (১৯৫৪) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি 'হ্যালহেড থেকে হাউসটনের ব্যাকরণ' নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মসূত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন।
মোহাম্মদ আবদুল কাইউম শুধু অধ্যাপক নন, ছিলেন জাত-গবেষক এবং মুসলিম জীবনদর্শন সুপ্রকাশ্যে আনার একনিষ্ঠ কর্মী। এটি তিনি পেয়েছিলেন পিতা মোহাম্মদ কাসেমের কাছ থেকে। তার পিতা জীবিকা নির্বাহের জন্য একসময় মণিহারি দোকানের কর্মচারী ছিলেন বটে, কিন্তু তখনই 'অভিযান' বলে পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং 'মুসলিম সাহিত্য-সমাজে'র সঙ্গে যুক্ত হন। কাজী নজরুল ইসলাম 'অভিযান'-এ লিখেছেন। মোহাম্মদ আবদুল কাইউম সেই ধারাবাহিকতাতেই গবেষণা করেছেন এবং 'মুহম্মদ এনামুল হক' (জীবনী), 'খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ' (জীবনী), 'কাজী ইমদাদুল হক' (জীবনী), 'আর্জুমন্দ আলীর প্রেমদর্পণ' (সম্পাদনা), 'মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ রচনাবলী' (সম্পাদনা); 'সাময়িকপত্রে (মুসলিম) সাহিত্যিক প্রসঙ্গ', 'আলাওল রচিত সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী' (সম্পাদনা), 'মীর মশাররফ হোসেন ও শতবর্ষে বিষাদ-সিন্ধু' (সংগ্রহ), 'আলাওল রচনাবলী' (সম্পাদনা), 'চকবাজারের কেতাবপট্টি', 'রত্নবতী থেকে অগ্নি-বীণা : সমকালের দর্পণে' (সংগ্রহ), 'নানা প্রসঙ্গে নজরুল' (সংগ্রহ), 'নজরুল-সংবর্ধনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ' ইত্যাদি গ্রন্থ জাতিকে উপহার দিয়েছেন। পত্রিকা থেকে হারিয়ে যেতে পারে এমন মুসলিম-প্রসঙ্গ এ যুগের পাঠকদের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি সংকলন করেছেন। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত 'পাণ্ডুলিপি পাঠ ও পাঠ-সমালোচনা' বইটি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা পাণ্ডুলিপি পাঠের ক্ষেত্রে পদ্ধতিবিদ্যা পরিচয়ের একেবারে প্রাথমিক ও অবশ্যপাঠ্য বই হিসেবে এখনও বিবেচিত। তিনি অভিধান ও বানান বিষয়ে নানা সংসর্গে কাজ করেছেন। পেয়েছিলেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও পদক। যেমন : বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গবেষণা পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, দেওয়ান আবদুল হামিদ পুরস্কার, নজরুল একাডেমি পদক, কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশ পুরস্কার ইত্যাদি।
আমি মোহাম্মদ আবদুল কাইউমকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। তিনি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না, কিন্তু তীক্ষষ্ট ছিল তার দৃষ্টি। আপাত রসকষহীন বিষয় তিনি আমাদের পড়াতেন। ভাষার ইতিহাস, পাণ্ডুলিপি পাঠ ও পাঠ-সমালোচনা আমি তার কাছেই পড়েছি। মুসলিম সাহিত্যিকদের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে তার আগ্রহ থাকলেও নজরুলের ওপর তার লেখালেখি অনেক পরে শুরু হয়েছে। বই তো বের হয়েছে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে ('নানা প্রসঙ্গে নজরুল')। কিন্তু তিনি ১৯৮৯ সালেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল-অধ্যাপক হয়েছিলেন। অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান তাকে খুব স্নেহ করতেন। কারণ, আমাদের স্যার ছিলেন সৈয়দ আলী আহসানের ছাত্র এবং পিতার সূত্রেও তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমরা এসব জেনেছি অনেক পরে। জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আমরা যখন আন্দোলন করছিলাম, তখন এরশাদের পক্ষাবলম্বনকারী ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে আমাদের স্যারের ঘনিষ্ঠতায় খুব পীড়িত হতাম।
এমএ পাসের শেষে কলকাতায় পিএইচডি করে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদানের পর কাইউম স্যারের স্ত্রী অধ্যাপক রাজিয়া সুলতানার সহকর্মী হই। মিরপুর থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই মাইক্রোবাসে আসা-যাওয়া করেছি। মিরপুরে স্যারের 'সঞ্চিতা' নামে বাড়ি ছিল। ছাত্রজীবনে বিভাগের কোনো কাজে সেই বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বসবার ঘরটা যেন হাজার বইয়ের লাইব্রেরি বানিয়ে রেখেছিলেন তারা। পরে বাড়িটি বিক্রি করে যখন হাতিরপুলে ভাড়া ফ্ল্যাটে তারা ওঠেন তখন বেশ কয়েকবার সেই বাসায় আমার যাওয়া হয়। এ সময় স্যার আমার ওপর আস্থা রাখতেন। অনেক গোপনীয় রিপোর্ট বা লেখার দ্বিতীয় সাক্ষী ছিলাম আমি। প্রথম সাক্ষী অবশ্যই তার স্ত্রী রাজিয়া আপা। রাজিয়া আপার সরলতা ছিল অপার। আবদুল হাকিমের ওপর পিএইচডি করা এই মহীয়সী নারী স্যারকে তার গবেষণায় প্রেরণা জুগিয়েছেন। এখন সেই যুগলবন্দি ছিন্ন হলো।
পারিবারিকভাবে অত্যন্ত সচেতন ও হিসাবি পথে চলেছেন আমাদের স্যার মোহাম্মদ আবদুল কাইউম। তাই আমাদের জানামতে, সবই গুছিয়ে রেখে গেছেন তিনি। লালবাগে পিতার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত এই মহান শিক্ষককে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- শ্রদ্ধা