ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সেবার মুরোদ নেই, কর বাড়ানোর গোঁসাই

সেবার মুরোদ নেই, কর বাড়ানোর গোঁসাই
×

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২০ | ১২:০০

জাতীয় বাজেটে মোবাইল সেবায় সম্পূরক শুল্ক্ক বাড়িয়ে কি টেলিযোগাযোগ খাতে আরেক দফা অস্থিরতা ডেকে আনা হচ্ছে? টেলিযোগাযোগ খাত নিয়ে এমনিতেই অনিশ্চয়তা ও অসমতা বাড়ছে। বিশেষ করে এ খাতে বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে ধোঁয়াটে অবস্থা বিরাজ করছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেই শোনা যাচ্ছে, টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিনিয়োগকারীরা টাকা ব্যাগে ভরে বসে আছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নতুন কোনো বড় বিনিয়োগ তো আসছেই না, বরং টেলিযোগাযোগ খাতে সার্বিক বিনিয়োগ কমছে। বিনিয়োগ কমতে থাকায় সেবার মানও নিম্নগামী। অন্যদিকে এ খাত থেকে আরও বেশি রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতি বছরই জাতীয় বাজেটে সাধারণ গ্রাহকের ওপর নতুন করের বোঝা চাপানো হচ্ছে। ফলে গ্রাহকরা নিম্নমানের সেবা আরও বেশি মূল্যে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
২০১৯ সালজুড়ে অডিট আপত্তি সংক্রান্ত বকেয়া পাওনা নিয়ে দেশের দুই শীর্ষ মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে ব্যাপক টানাপোড়েন চলেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার। টানাপোড়েনের শেষ অধ্যায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে সাফল্যের হাসি হেসেছে ঠিকই, কিন্তু মাঝখানে সুযোগ হারিয়েছে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগের। ২০১৯ সালেই বাংলাদেশে জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য যে কয়েকটি দেশের নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা ছিল, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর দুই অপারেটরের রশি টানাটানি দেখে বাংলাদেশে আসা ফ্লাইটের টিকিট বাতিল করেছে। আর বিদ্যমান দুই অপারেটরও সেই টানাপোড়েনের অনিশ্চয়তায় কিংবা সুযোগ নিয়ে সেবার মানোন্নয়নে নতুন কোনো ব্যয়ই করেনি। করবে কীভাবে? এনওসি তো বন্ধ ছিল! ফলে ফোরজি সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হলো, বিদ্যমান ফোরজির গতি কমে গেল, ভয়েস কলের ক্ষেত্রে কলড্রপ বাড়ল। বাজারে শীর্ষ অপারেটরের একক আধিপত্য ঠেকাতে বিটিআরসি গত বছর এসএমপি (সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার) নীতিমালা করেছিল। তারও যুক্তিযুক্ত প্রয়োগ দেখছি না।
শুধু মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবার মান নয়, ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে দেওয়া ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রেও যে মান নিয়ন্ত্রণের একটা ব্যাপার আছে, সেটাও যেন টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবেচনায় নেই। এই সুযোগে দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবায় অবাধ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এলাকাভিত্তিক মস্তান চক্র। তাদের অনেকে লাইসেন্স ছাড়াই জোর করে ইন্টারনেট সংযোগ বিক্রি করে সাধারণ গ্রাহকদের জিম্মি করছে। বাংলাদেশে যখন ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের কোনো সংকট নেই, সেই সময়ে গ্রাহকদের মাত্র ৮০ থেকে ১০০ কেবিপিএস গতির সেবা দিয়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার কেবিপিএসের দাম নিচ্ছে অনেকটা গায়ের জোরে। বাংলাদেশে ছাড়া আর কোনো দেশে এভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পাড়ার মস্তানরা নিয়ন্ত্রণ করে? এর ফলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবায় যাদের বড় বিনিয়োগ এবং বৈধ ব্যবসা আছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
টেলিযোগাযোগে ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক সেবা একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিটিসিএল এককভাবে নিশ্চিত করত। কিন্তু তাদের যথাযথ সেবা নিশ্চিত করার ব্যর্থতায় ২০০৯ সালে বেসরকারি খাতে টান্সমিশন কোম্পানির লাইসেন্স (এনটিটিএন) দেয় বিটিআরসি। এটা ইতিবাচক সিদ্ধান্তই ছিল। কিন্তু কমিশন লাইসেন্স ফি, বছর বছর নবায়ন ফি নিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। গত ১১ বছরে ট্রান্সমিশন সেবার একটা নির্দিষ্ট মূল্য কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। এ কারণে এখন পর্যন্ত ট্রান্সমিশন সেবাদাতা বেসরকারি এনটিটিএন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সেবাগ্রহীতা মোবাইল অপারেটর ও আইএসপিদের জটিলতা চলছেই। একটা মূল্য কাঠামো তৈরি করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কত বছর লাগে?
বলা যেতেই পারে, সম্পূরক কর তো বিটিআরসি আরোপ করে না। বরং বাজেট উপস্থাপনের দিন থেকেই সম্পূরক কর আরোপ করায় তারা অপারেটরদের 'কড়া' চিঠি দিয়েছে। আমি বলতে চাই, বিটিআরসি রাজস্ব আদায় নিয়ে চিন্তাভাবনা একেবারে বন্ধ করে দিক। দায়িত্বটা সম্পূর্ণভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে দেওয়া হোক। প্রয়োজনে এনবিআরে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়ে একটি পৃথক অনুবিভাগ করা হোক। এ জন্য সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করার প্রয়োজন হলে তাও করা হোক। আর বিটিআরসি গ্রাহকের জন্য সেবা নিশ্চিত করুক, তথ্যপ্রযুক্তিতে নতুন সেবা চালুর জন্য গবেষণা করুক। বাণিজ্য এবং গ্রাহকসেবা দুটিই নিশ্চিত হয় এমন নীতিমালা তৈরির কাজে গভীর মনোননিবেশ করুক। যেন একটা মূল্য কাঠামো তৈরিতে ১১ বছরের ব্যর্থতার লজ্জা না নিতে হয়। বিটিআরসি যথাযথ সেবার মান নিশ্চিত করতে পারলে গ্রাহক হিসেবে ঘাড়ে বাড়তি করের বোঝাটাও অত ভারীও মনে হবে না।
এনবিআরকেও বাজেট তৈরির সময় ঘাটতি মেটানোর জন্য রাজস্ব আদায়ের শর্টকাট পথ থেকে সরে এসে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে সম্পূরক কর বাড়িয়ে কিন্তু এনবিআর আরও বেশি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ নষ্ট করছে। কারণ প্রতি বছরই ব্যয় বাড়ার বিষয়টি মানুষ কম সেবা নিয়ে সমন্বয় করছে। অপারেটরদের প্যাকেজ ভলিউম ছোট হতে হতে আণুবীক্ষণিক হয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে সম্পূরক কর না বাড়িয়ে গ্রাহকের সামনে বেশি সেবা গ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারিত করলে এনবিআর বাড়তি রাজস্ব আয় যেমন নিশ্চিত করতে পারত, ১৬ কোটি মোবাইল গ্রাহকের দীর্ঘশ্বাসের দায়ও নিতে হতো না।
২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্ক্ক এবং ভ্যাট নীতিতে অসামঞ্জ্যসতা দেখা গেছে। শুল্ক্কনীতিতে বলা হয়েছে, দেশে হ্যান্ডসেটের সঙ্গে চার্জার, ব্যাটারি ও পিসিবি উৎপাদন করলেই কেবল উৎপাদক হিসেবে বিবেচিত হবেন। না হলে সংযোজনকারী হিসেবে বিবেচিত হবে এবং উৎপাদক হিসেবে প্রদত্ত সুবিধা পাবেন না। আর ভ্যাট নীতিতে বলা হয়েছে, শুধু পিসিবি উৎপাদন করলেই উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভ্যাট সংক্রান্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। এখন এনবিআরকে জানতে হবে বর্তমান প্রযুক্তি দুনিয়ার উৎপাদন শিল্পের বাস্তবতায় কোথাও একসঙ্গে ব্যাটারি, চার্জার, পিসিবি উৎপাদন করা হয় না। এগুলো পৃথকভাবে উৎপাদিত হয়। তারপরও পিসিবি উৎপাদন সম্ভব হলেও ব্যাটারি, চার্জার উৎপাদন করাটা অবাস্তব। বরং এ ধরনের বিতর্কিত নীতি না থাকলে দেশে যখন আরও তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য সংযোজন কারখানা হবে, তার ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ কারখানা দেশে তৈরি হতে শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে এনবিআর আরও বেশি রাজস্ব পাবে, দেশে সত্যিকারের একটি তথ্যপ্রযুক্তি উৎপাদন কর্মপরিবেশও নিশ্চিত হবে। নীতিতে এ ধরনের অসঙ্গতি বরং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে।
সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×