ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে 'হোয়াইট সুপ্রিমেসি'

যুক্তরাষ্ট্রে 'হোয়াইট সুপ্রিমেসি'
×

ড. তারেক শামসুর রেহমান

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২০ | ১২:০০

যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতার ২৪৪ বছর পরও কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী যে কত বেশি অবহেলিত, নিগৃহীত ও তাদের নূ্যনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত, গত ২৫ মে মিনিয়াপোলিসে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তা আবারও প্রমাণিত হলো। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মার্টিন লুথার কিং প্রাণ দিয়েছিলেন ১৯৬৮ সালে। দীর্ঘ ৫২ বছর পরও এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সমাজে প্রতিটি স্তরে এই বর্ণবাদ আছে। এবার এই বর্ণবাদের সর্বশেষ শিকার হলেন জর্জ ফ্লয়েড। দীর্ঘ আট মিনিট শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেবের শাভিন হাঁটু দিয়ে তার গলা চেপে ধরে তাকে হত্যা করেছিল। সারাবিশ্ব দেখেছে জর্জ ফ্লয়েড বলছেন, 'আমি শ্বাস করতে পারছি না'; কিন্তু তারপরও শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেবের শাভিনের মন গলেনি। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে জর্জ ফ্লয়েড মারা যান। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে এরিক গার্নারের হত্যাকাণ্ডের কথা। এরিক গার্নারও শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারের হাতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। দুটিই ছিল ছোট্ট অপরাধ- জর্জ ফ্লয়েডের অপরাধ ছিল তার কাছে একটি ২০ ডলারের জাল নোট পাওয়া গেছে। আর গার্নারের অপরাধ ছিল- তিনি অবৈধভাবে সিগারেট বিক্রি করছিলেন। দুটি ঘটনাই তুচ্ছ; কিন্তু তুচ্ছ ঘটনায় তাদের প্রাণ দিতে হয়েছিল। যারা সংবাদপত্রের সিরিয়াস পাঠক, তারা স্মরণ করতে পারবেন- ২০১২ সালে ট্রাইভন মার্টিন কিংবা ২০১৪ সালে মিসাইল ব্রাউনের মৃত্যুর কাহিনি। এই দুই কৃষ্ণাঙ্গ যুবকও একইভাবে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র একটি গণতান্ত্রিক দেশ। সেখানে মানবাধিকারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একজন কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড, এরিক গার্নার কিংবা মিসাইল ব্রাউন যখন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারদের হাতে মারা যান, তখন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকারের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয় বৈকি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ৭টি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- সমতার অধিকার (সংবিধানের ১৪-১৮ ধারা), স্বাধীনতার অধিকার (সংবিধানের ১৯-২২ ধারা), ধর্মীয় অধিকার (ধারা ২৫-২৮), শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার (ধারা ২৯-৩০), সাংবিধানিক অধিকার (ধারা ৩২), সামাজিক নিরাপত্তা অর্থাৎ চাকরি ভদ্রভাবে বেঁচে থাকা, নিরাপত্তা, জীবনমানের উন্নতি এবং মাতৃত্বের অধিকার (ধারা ৪১-৪৩) ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে এই মৌলিক মানবাধিকারগুলো বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ফলে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা ঘটে আর এমনি কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এবারও তেমনটি হয়েছে। তবে এবারের অসন্তোষ ব্যাপক। এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে গেছে প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শহরে। এমনকি আটলান্টিকের অপর পাড়ে ইউরোপেও এই বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টলে একজন দাস ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ এডওয়ার্ড কোলস্টোনের স্ট্যাচুও ভেঙে ফেলেছে। এই কোলস্টোন ১৭ শতকে কৃষ্ণাঙ্গ দাস ব্যবসার সঙ্গে (৮০ হাজার আফ্রিকান নাগরিককে তিনি আমেরিকায় বিক্রি করেছিলেন) জড়িত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভকারীরা শ্বেতাঙ্গ নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (আমাজন, মেসি) জ্বালিয়ে দিয়েছে অথবা লুট করেছে। শ্বেতাঙ্গদের প্রতি ক্ষোভটা কেন, এসব ঘটনা থেকেই তা বোঝা যায়।
কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত, এটাই হচ্ছে বিক্ষোভের মূল কারণ। বলতে দ্বিধা নেই যে, চার বছর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেভাবে 'হোয়াইট সুপ্রিমেসি'র ধারণা প্রমোট করছেন, তাতে করে একদিকে কৃষ্ণাঙ্গরা, অন্যদিকে এশীয় ও হিস্পানিক বংশোদ্ভূতরা এক ধরনের আতঙ্কে ভুগছেন। তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তাদের যে অধিকার দিয়েছে, তা ট্রাম্প খর্ব করছেন বা খর্ব করতে চাচ্ছেন। বিক্ষোভের পেছনে এটাই মূল কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গরা বরাবরই অবহেলিত। তাদের চাকরির বাজার সীমাবদ্ধ। বেকারত্বের হার তাদের মাঝে বেশি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতো জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অসমতার হার সবচেয়ে বেশি। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মাঝে আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ১৯৬৩ সালে শ্বেতাঙ্গ পরিবারপ্রতি আয় ছিল সর্বোচ্চ এক লাখ ২১ হাজার ডলার (বছরে), ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শ্বেতাঙ্গ পরিবারপ্রতি ৯ লাখ ১৯ হাজার ডলার আর কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারপ্রতি মাত্র এক লাখ ৪০ হাজার ডলার (আর হিস্পানিক বা স্পেনিশ বংশোদ্ভূতদের এক লাখ ৯২ হাজার ডলার)। এতে দেখা যায়, একটি কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের চেয়ে একটি শ্বেতাঙ্গ পরিবার সাত লাখ ডলার বেশি আয় করে। এত বছরেও এই বৈষম্য কমেনি; বরং বাড়ছে। এর অর্থ হচ্ছে, সমাজের শীর্ষ পদগুলো শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্যই অলিখিতভাবে নির্ধারিত। কৃষ্ণাঙ্গদের সেখানে কোনো প্রবেশাধিকার নেই। এতে করে কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। এই ক্ষোভই বারবার এ ধরনের আন্দোলনের জন্ম দেয়।
যদিও এটা ঠিক, ৩০ কোটির অধিক জনসংখ্যার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আধিক্য বেশি, ৭২.৪১ শতাংশ। আর কৃষ্ণাঙ্গদের মাত্র ১২.৬১ শতাংশ। তুলামূলক বিচারে কৃষ্ণাঙ্গদের চাকরির নিরাপত্তা কম। যুক্তরাষ্ট্রে আয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার একটি পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে আরকান ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, কীভাবে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। করোনাভাইরাস কভিড-১৯-এও শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মাঝে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত, মৃত্যু হার ও চাকরি হারানোর হার বেশি (আরবান ওয়ার, ১০ এপ্রিল ২০১০)। গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে (২০ মে ২০২০) থেকে জানা যায়, করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষ মারা গেছে (আক্রান্ত ২০,০৭,৪৪৯, মৃত্যু ১,১২,৪৬৯, ৮ জুন), তার মাঝে কৃষ্ণাঙ্গ মৃত্যুর হার শ্বেতাঙ্গ মৃত্যুর চেয়ে তিনগুণ বেশি।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, প্রতি ৫ জন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানের মাঝে একজনের কোনো হেলথ ইন্স্যুরেন্স অর্থাৎ স্বাস্থ্যবীমা নেই। এরা নিয়মিত চিকিৎসা পান না। মৃত্যুর এটা একটা বড় কারণ। ফলে কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে যে ক্ষোভ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ (২১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, ২০১৯); কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। করোনাভাইরাসের সময় এই বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকট যখন বৃদ্ধি পায় তখন দেখা গেল, হাসপাতালগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণ আইসিইউ বেড নেই। ভেন্টিলেটর নেই। মাস্ক নেই। ডাক্তার তথা নার্সদের জন্য পিপিই নেই। শুধু ভেন্টিলেটরের অভাবে শত শত মানুষ সেখানে মারা গেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ৬ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধের পেছনে। এ পরিমাণ অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত করা যেত। সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেত। এতে করে স্বাস্থ্য সেক্টরে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে আনা যেত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি, বিশেষ করে 'ওপাসা কেয়ার' বাতিল করে দেওয়ায় এই বৈষম্য আরও বেড়েছে।
একুশ শতকে এসে শুধু শরীরের বর্ণের কারণে মানুষের মাঝে বৈষম্য তৈরি হবে- এটা প্রত্যাশা করা যায় না। একজন কৃষ্ণাঙ্গ (মিশ্র বলা সঙ্গত) বারাক ওবামা দীর্ঘ আট বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিন্তু তিনিও সমাজে এই বর্ণবাদ কমিয়ে আনতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। বর্ণবাদ একটা অভিশাপ। 'হোয়াইট সুপ্রিমেসি'র নামে শ্বেতাঙ্গ শাসন কৃষ্ণাঙ্গদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ থেকে যুক্তরাষ্ট্র যদি বেরিয়ে আসতে না পারে, তাহলে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো গ্রহণযোগ্যতা আর থাকবে না।
  অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×