ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

নারী উন্নয়ন ছাড়া বড় বড় বরাদ্দ অর্থহীন

নারী উন্নয়ন ছাড়া বড় বড় বরাদ্দ অর্থহীন
×

খুশী কবির

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২০ | ১২:০০

করোনা পরিস্থিতির কারণে আমাদের অর্থনীতি, জীবনযাত্রা, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ সবকিছু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চলমান মহামারির কারণে আমাদের স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ থেমে গেছে। ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অনেক আর্থিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থগিত হয়ে গেছে। ফলে অনেকেই কর্মসংস্থান হারিয়ে আয়বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারীরা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, গত কয়েক মাসে নারী নির্যাতন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন অবস্থায় যে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে তা পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য তৈরি বাজেটে করোনা সংকটের বিষয়টি খুব বেশি আমলে নেওয়া হয়নি। যদিও স্বাস্থ্য খাতে সামান্য কিছু বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে তথাপি এটা যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নারীর অগ্রযাত্রার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষা করে বা এ বিষয়গুলোকে আমলে না এনে বাজেট তৈরি করা হলে তা স্বাভাবিকভাবেই নারীর ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
নাগরিকদের প্রতি প্রত্যেক সরকারের বিভিন্ন দায়দায়িত্ব থাকে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় সামাজিক বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। যার লক্ষ্য ছিল পিছিয়ে পড়া, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক নাগরিকদের সহায়তা করা। সরকার এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করায় বাংলাদেশ বেশ কিছু সূচকে বিশেষ করে সামাজিক উন্নয়ন সূচকে, নারী উন্নয়ন ও লিঙ্গ সমতা সূচকে ভালো করেছে। এই সফলতার পেছনে অনেক বিষয় কাজ করলেও সামাজিক বেষ্টনী কর্মসূচির ভূমিকা অগ্রগণ্য। করোনাভাইরাসের এই সময়ে এ ধরনের কর্মসূচি আরও বেশি দরকার ছিল। আমরা মনে করেছিলাম এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য বরাদ্দ বেশি হবে বলে প্রত্যাশা করেছিলাম, যাতে তারা সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।
আমাদের দেশে অনেক নারী কৃষি, ইটভাটা, নির্মাণকাজ বা মাটিকাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া বিপুল সংখ্যক নারী গার্মেন্ট সেক্টরসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। করোনা পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি অন্যতম। এই দেশগুলোই কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রধান বাজার। করোনাভাইরাসে লকডাউনের কারণে এসব দেশের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। বাংলাদেশের মতো ওইসব দেশেও বেকারত্ব বেড়েছে। ফলে নতুন করে গার্মেন্ট পণ্যের ক্রয়াদেশ কম আসছে। উপরন্তু আগের অনেক ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বলা হচ্ছে পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে অসংখ্য শ্রমিক ছাঁটাই হতে পারে।
আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, বাজেটে পোশাক শিল্পের পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা হবে। বাজেটে নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ থাকবে। কিন্তু বিষয়টি পুরো আমলে না নিয়ে বাস্তবতাকে সামনে আনা হয়নি বলেই প্রতীয়মান। এর ফলে গার্মেন্ট সেক্টরে নিয়োজিত লাখ লাখ নারী শ্রমিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। গার্মেন্ট শ্রমিকরা চাকরি হারালে তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তাবে। মনে রাখতে হবে, এই নারীরা বেকার হলে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়লে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রযাত্রা বৃহদাকারে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এখন সরকারের করণীয় সামাজিক বেষ্টনীর মতো কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকদের সরাসরি সহযোগিতা করা। অন্য কোনো মাধ্যমে সহযোগিতা করার পদক্ষেপ নেওয়া হলে শ্রমিকরা তার সুফল কতটা পাবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
নারী উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচিগুলো দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ হবে, তেমনি প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু মানুষের মধ্যে এসব কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ঘোষিত বাজেটে বরাদ্দের সঙ্গে যদি প্রয়োজন অনুযায়ী এসব কর্মসূচি আরও বাড়ানো হতো তাহলে নারী উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতো। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে তুষ্টির অবকাশ নেই। এর পরও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সন্তান জন্মদানে বা অন্যান্য চিকিৎসা সেবা গ্রহণে নারীরা যে সহযোগিতা পেতেন করোনা পরিস্থিতিতে তা বহুলাংশে ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এভাবে চলতে থাকলে মাতৃমৃত্যু হার, শিশুমৃত্যু হার হ্রাস এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের যে সাফল্য, তা ম্লান হতে পারে।
হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে প্রসূতি সড়কেই সন্তান জন্ম দিয়েছেন- এমন সংবাদও আমরা গণমাধ্যম মারফত জানতে পেরেছি। করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে। আমি মনে করি চিকিৎসা সেবার পরিসর বৃদ্ধি করে এই সংকট দূর করা উচিত। স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও অধিক বরাদ্দ প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু এবারের বাজেটেও শিক্ষা খাতে খুব বেশি বরাদ্দ হয়নি। মোট বাজেটের এক শতাংশেরও কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শিক্ষায়। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দীর্ঘদিন ধরে বাজেটস্বল্পতার কারণে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি তৈরিতে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকল্প নেই। তাই সন্তানদের মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটে নারীদের বিষয়গুলো যথাযথভাবে আসেনি। করোনাকালে জন্মনিয়ন্ত্রণ বা প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সেবা মিলছে না। এর ফলে মাতৃমৃত্যু হার ও শিশুমৃত্যু হার বাড়ার পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধিরও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাজেটে এ বিষয়গুলোর প্রতিফলন ঘটা দরকার ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ফলে আমি মনে করি বাজেটটি গতানুগতিক হয়েছে। চলমান মহামারি বা বিশেষ পরিস্থিতির বিষয়টি উপেক্ষা করে বাজেটটি করা হয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে, আমাদের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে হবে, কিন্তু কত কমে গেছে তা হালকাভাবে নেওয়ায় বাজেটটিও গতানুগতিক হালকা বাজেট হয়েছে। এমন বাজেট হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অর্ধেক জনসংখ্যা তথা নারীর প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো দিক পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসডিজির প্রথম পাঁচটি লক্ষ্যমাত্রায় যেসব বিষয় বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্য নির্মূল করা; ক্ষুধা মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টির লক্ষ্য অর্জন ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা চালু; স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা ও সব বয়সের সবার কল্যাণে কাজ করা; অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা; লিঙ্গ সমতা অর্জন এবং সব নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন করা।
টেকসই উন্নয়নের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে কাউকে ছেড়ে উন্নয়ন নয়, সবার জন্য উন্নয়নের সুফল নিশ্চিত করা। বাজেটে এ বিষয়গুলোর প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে দারিদ্র্য বিমোচন, সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ তার অগ্রযাত্রার পথে হাঁটতেই থাকবে। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমতা জরুরি। নারীরা পিছিয়ে থাকলে দেশও পিছিয়ে থাকবে। নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ সমতা নিশ্চিতে তাদের জন্য খাসজমির ব্যবস্থা করা, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের জন্য দক্ষ করে তোলার মতো বিষয় বাজেটে থাকা দরকার। নারীর উন্নয়ন চিন্তা না করে প্রণীত বাজেটের কোনো অর্থই হয় না।
নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী; সমন্বয়ক, নিজেরা করি

আরও পড়ুন

×