ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

করোনাকালে বাইসাইকেল

দুই চাকার জন্য চার করণীয়

দুই চাকার জন্য চার করণীয়
×

ছবি: সমকাল

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ০৯:৩১

করোনা পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ নগরগুলোতে বাইসাইকেলের ব্যবহার ও বিক্রি বেড়েছে- রোববার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য আশঙ্কার এই সময়েও আমাদের আশাবাদী করে তোলে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা বিভিন্ন সময়েই সাইকেলের ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে এসেছি। করোনা পরিস্থিতিতে নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত শঙ্কা সেই কাজ সহজ করে দিয়েছে। যদিও গণপরিবহন সীমিত পরিসরে চালু হয়েছে এবং তাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নিয়ম রয়েছে, এ ব্যাপারে নাগরিক ভরসা তৈরি সহজ নয়। আমরা দেখেছি, বাসে যদিও অর্ধেক যাত্রী নেওয়া, হাতে জীবাণুনাশক দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে; টেম্পো, অটোরিকশা, রিকশার মতো যানবাহনগুলোতে এ সংক্রান্ত নজরদারি কঠিন। সেদিক থেকে যাদের ব্যক্তিগত যানবাহন নেই, বা যাদের পক্ষে মোটরসাইকেল কেনা বা চালানোর সঙ্গতি নেই, তাদের জন্য বাইসাইকেলই উপযুক্ত বিকল্প। নিজস্ব বাইসাইকেল কেবল জীবাণু থেকে সুরক্ষা নয়, স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও এর অবদান স্বীকার করতে হবে। আর্থিকভাবেও নিঃসন্দেহে যে কোনো যানবাহনের তুলনায় সাশ্রয়ী। একটি নগরের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ যদি বাইসাইকেল ব্যবহার করে, তাহলে জ্বালানি খাত ও পরিবেশ ব্যবস্থাতেও পড়ে ইতিবাচক প্রভাব।
একই সঙ্গে এটাও স্বীকার করতে হবে, আমাদের দেশে বিশেষত রাজধানীতে বাইসাইকেল চালানো সহজ নয়। আমরা জানি, নগরে বাইসাইকেল চালানোর মানসিকতা থাকলেও সুযোগ কম মূলত সড়ক-নকশার কারণে। বিশ্বেও বিভিন্ন মেগাসিটিতে বাইসাইকেলের জন্য আলাদা যে লেইন দেখা যায়, ঢাকায় তা কল্পনাতীত। অবশ্য বিভিন্ন সময়েই এ ব্যাপার আলোচনা হয়েছে ও দাবি উঠেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের মনে আছে, কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পথগুলোকে সাইকেলবান্ধব করার দাবিতে সাইকেল র‌্যালির প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আর কোনো অগ্রগতি দেখেনি। সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি সাইকেল লেইন হয়েছে। এই উদ্যোগ নগরজুড়ে সম্প্রসারিত করা যায় কিনা, সংশ্নিষ্টদের গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখতে বলি আমরা। বস্তুত এই প্রশ্ন পুরোনো যে, রাজপথে কেন পৃথক সাইকেল লেইন থাকবে না? ফলে দ্বিচক্রযানটিকে জনপ্রিয় করতে প্রথম কাজ হতে পারে আলাদা লেইন নিশ্চিত করা। করোনা পরিস্থিতির কারণে এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। আমরা জানি, এখনও মফস্বল এলাকায় বিপুলসংখ্যক নাগরিক বাইসাইকেল ব্যবহার করেন। কিন্তু এটাও সত্য যে, সাইকেলের ব্যবহার ক্রমেই কমছে। জায়গা করে নিচ্ছে মোটরসাইকেল। অথচ বাইসাইকেল সবদিক থেকে সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত। এত ইতিবাচক দিক সত্ত্বেও মফস্বলে বাইসাইকেলের ব্যবহার কমার একটি কারণ সম্ভবত 'সামাজিক'। গত কয়েক দশকে আমাদের সমাজে এই ভ্রান্ত ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, বাইসাইকেল নিম্ন ও মধ্যবিত্তের যানবাহন। মোটরসাইকেলের 'ঠাট' সাইকেলে মধ্যে নেই। অথচ বিশ্বব্যাপীই বাইসাইকেল সবচেয়ে বেশি আদৃত যানবাহন। উন্নত বিশ্বে এ জন্য নাগরিকদের প্রণোদনাও দেওয়া হয়। আমরা চাই, দ্বিতীয় করণীয় হিসেবে অন্তত সাইকেলের ব্যাপারে এই ভ্রান্ত ধারণা মোচনে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এগিয়ে আসুক। আমরা দেখি, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রাজধানীসহ দেশের শহরগুলোতে সাইক্লিস্টের দল গড়ে উঠেছে। সাইকেল জনপ্রিয় করতে তারা নিচ্ছে নানা পদক্ষেপ। পাশাপাশি তারা যদি উন্নত দেশগুলোর মতো বিভিন্ন স্থানে সাইকেল স্ট্যান্ড গড়ে তুলতে পারে। যেখান থেকে দলগুলোর সদস্যরাই সাইকেল নেবে ও ফেরত দেবে। তাহলে ঘোরাঘুরির বাইরেও দৈনন্দিন যাতায়াতে কাজে লাগবে। একই ধারায় সাধারণ মানুষের জন্যও ভাড়ায় গড়ে উঠতে পারে এই ব্যবস্থা। সাইকেলের জ্বালানি ও পরিবেশগত অবদান মনে রেখে সরকার নামমাত্র মাশুলে, এমনকি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সাইকেল সার্ভিস গড়ে তুলতে পারে। সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে বিষয়টি কঠিন হতে পারে না।
চতুর্থ যে দিকটিতে আমরা মনোযোগ দিতে বলি, তা হচ্ছে সাইকেলের অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে উৎসাহ ও প্রণোদনা। সমকালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে দেশে সাইকেলের চাহিদা বেড়েছে তিনগুণ। স্থানীয় বাজারের ৩০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে দেশি ব্র্যান্ডগুলো। ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে রপ্তানিমুখী সাইকেল কারখানা। গত অর্থবছরে কমবেশি সাড়ে সাত লাখ সাইকেল রপ্তানি হয়েছে। আমাদের মনে আছে, কয়েক বছর আগে বাইসাইকেল রপ্তানিতে এক দশকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই উপরে উঠে আসার খবর বিদেশি সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছিল। নাগরিক, উৎপাদক ও সরকার যদি মনোযোগী হয়, তাহলে দেশের চাহিদা মিটিয়েও সাইকেল হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম। করোনা-পরবর্তী বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও বদলাতে হবে। জরুরি সেই কাজ দুই চাকায় ভর করেই সূচিত হোক না!

আরও পড়ুন

×