করোনা ও জীবন-জীবিকা
ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস আলোচনা করলে চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সমগ্র ইংল্যান্ডে ঘটে যাওয়া প্ল্যাগ রোগ মহামারির ঘটনা এড়িয়ে গেলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ রোগের প্রকোপ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে
বদরুল হুদা সোহেল
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২০ | ১২:০০
ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস আলোচনা করলে চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সমগ্র ইংল্যান্ডে ঘটে যাওয়া প্ল্যাগ রোগ মহামারির ঘটনা এড়িয়ে গেলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ রোগের প্রকোপ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, এটি ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে তৎকালীন সময়ে ইংল্যান্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোকের প্রাণ কেড়ে নেয়। তখনকার সময়েও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটলে মৃত ব্যক্তির সৎকারের জন্য কেউ সাহস পেত না। ১৩৪৭ থেকে ১৩৫০ সালের তিন সাড়ে তিন বছরের এই অদৃশ্য প্ল্যাগ রোগে মৃত্যুর বীভৎসতার কারণে এ ঘটনাকে ইতিহাসে ব্ল্যাক ডেথ বা 'কালো মৃত্যু' নামে অভিহিত করা হয়।
বিষয়টি মনে উঁকি দিচ্ছে এ জন্য যে, আজ ৬০০ বছর পরে অনুরূপ করোনা নামধারী এক অদ্ভুত ও অদৃশ্য শক্তির কাছে পাশ্চাত্য- প্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্ব আজ পরাজিত। রোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে সিদ্ধান্ত-পাল্টাসিদ্ধান্ত নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান।
করোনার ভয়াল থাবায় থমকে গিয়েছে পৃথিবী। প্রায় তিন মাস আগে বন্ধ হওয়া সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত অফিস, ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা চালানোর নিমিত্তেই এই সিদ্ধান্ত এবং এ করোনার ভয়কে ঘাতক সাথী হিসেবে নিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টায় আছে অনেকেই।
উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় সদ্য প্রবেশকারী দেশটি তার অর্থনৈতিক চাকাকে গতিশীল রাখার প্রয়াসেই সরকারের এ সিদ্ধান্ত। জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মানুষ আয়-রোজগারের অন্বেষণে যাচ্ছে বাড়ির বাইরে। না গিয়েও উপায় নেই, কারণ ঘরে বসে উপার্জন করার মতো সুযোগ বা কোনো পন্থা আমাদের এই কৃষিনির্ভর দেশে এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিসরে এগোয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের বুলেটিনে যুক্ত হছে কভিড-১৯ রোগী ও মৃতের সংখ্যা। ক্রমবর্ধমান আক্রান্তের খবর নিউজ চ্যানেলের স্ট্ক্রলে প্রতিনিয়ত ভাসছে এবং সেই সঙ্গে জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক। জুন মাসের মাঝামাঝিতে এসেও যখন পরিস্থিতির অবনত অবস্থা, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছে এর মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকতে হবে তাদের। তাই জরুরি প্রয়োজনে বিশেষ করে জীবিকার তাগিদে বাড়ি থেকে বের হওয়া শুরু করেছে মানুষ। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি মাথায় আছে বলেও মেনে না মেনে অফিস, গার্মেন্ট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছে যদিও দৃশ্যত কোনো ক্ষেত্রেই পূর্বেকার মতো কাজের গতি ও প্রাণচাঞ্চল্য এখনও ফিরে আসেনি।
বিশ্নেষণে গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে করোনাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি প্রতীয়মান। এর কারণও সহজে অনুমেয়। গ্রামাঞ্চলে লোকসংখ্যা বেশি হলেও শহরে লোকবসতি ঘন। স্থান সংকুলানের কারণে ঘিঞ্জি পরিবেশে গড়ে উঠেছে শহরের অফিস, হাটবাজার, দোকানপাট, আবাসস্থলসহ প্রতিটি কর্মস্থল। অফিস-আদালত, মার্কেট, শপিংমল, হাসপাতাল, যানবাহন ইত্যাদির সুযোগ-সুবিধা শহরে থাকায় লোকসমাগম শহরে বেশি।
যে হারে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী ভারতে করোক্রান্ত রোগী প্রতিনিয়ত বাড়ছে তা থেকে অনুমেয় যে, যে কোনো সময় যে কাউকে কভিড-১৯ ভর করতে পারে। তাই পূর্ব প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতি পরিবারে একটি ঘর আইসোলেটেড বা আলাদা করে প্রস্তুত রাখা দরকার।
আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে আউসিইউ, আইসোলেশন বা ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। হাসপাতালে না গিয়ে ঘরে থেকে চিকিৎসা নিয়ে বিচ্ছিন্ন থেকে সুস্থ হচ্ছেন আক্রান্ত রোগীর প্রায় আশি ভাগ। ফায়ার সার্ভিস ও থানা পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার ফোন নম্বর কাছে রাখা জরুরি। চেনা-অচেনা যারা সম্প্রতি করোনা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছেন, তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সম্যক ধারণা রাখা যেতে পারে। তবে যেহেতু সবার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সমান নয়, সেহেতু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত হবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়তই বিভিন্নজনের বিভিন্ন ধরনের ওষুধের রেফারেন্স পাচ্ছি, যা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করাটা হবে নির্বুদ্ধিতার। মনে রাখতে হবে, জীবনের জন্য জীবিকা; জীবিকার জন্য জীবন নয়। তাই জীবনকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখার জন্য মহামারির এই ক্রান্তিলগ্নে চলুন সবাই কভিড-১৯ এর ব্যাপারে সোচ্চার হই।
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
[email protected]
- বিষয় :
- করোনা