আমার মা :এক সংগ্রামী নারীর প্রতিকৃতি
আবু সাঈদ খান
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২০ | ১২:০০
গত ১২ জুন আমার মা রিজিয়া খান ওরফে রিজিয়া বেগম চলে গেলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। সবাই বলে এটি তো যাবার বয়স। আমি মানতে পারি না। মনে হয়, কেন আরও কিছু দিন থেকে গেলেন না?
মা এখন শুধু স্মৃতি। মনে পড়ে, আমি যখন মুক্তিযুদ্ধ শেষে গ্রামের বাড়িতে ফিরলাম। মা আমাকে কাছে টেনে বসিয়ে এক পলকে তাকিয়ে থাকলেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছছেন। আমার কুশলাদি জানার আগেই জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি তো সালাউদ্দিন, নৌফেলকে চিনতে? আমি মাথা নাড়লাম। মা বললেন, যুদ্ধে যাওয়ার আগে ওরা আমাকে সালাম করে বলল, 'ফুফু দোয়া করে দেন। আমরা অপারেশনে যাচ্ছি। সুসংবাদ নিয়ে আসব।' সেই যে যাওয়া, ওরা ফিরল না; ওদের মৃত্যুর খবর পেলাম। (৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ :করিমপুর যুদ্ধে সালাউদ্দিন, নৌফেলসহ ৭ জন শহীদ হন।) মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, কত মায়ের কোল যে খালি হয়েছে...। আমি বুঝতে পারলাম, একাত্তর মাকে বদলে দিয়েছে। আমার মা হয়ে উঠেছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধার মা। আমি প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যাওয়ার কিছুদিন পর বাবার তত্ত্বাবধানে আমাদের বাড়িতেই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপিত হয়েছিল; পরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় নতুবদীয়া স্থানান্তরিত হয়। তবে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আমাদের বাড়িতেই হতো। এই ক্যাম্পের মূল সংগঠক-পরামর্শক ছিলেন অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। ক্যাম্পে অবস্থানকারী গ্রুপগুলো হলো- সালাউদ্দিন-নৌফেল গ্রুপ, হেমায়েত গ্রুপ (আলফাডাঙ্গা) ও মোহাম্মদ আলী-কাশেমের নেতৃত্বে নৌকমান্ডো দল। মুজিব বাহিনীর জেলা সহ-প্রধান শাহ মোহাম্মদ জাফর, বোয়ালমারীর নবাবউদ্দিন টোকন প্রমুখ আসতেন। মা ছিলেন এসব মুক্তিযোদ্ধার কারও চাচি, কারও খালা বা ফুফু।
আমার কাছে মা কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধার মা ও একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীই নন, তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। সন্তানকে যুদ্ধে যেতে বাধা দেননি বরং আশীর্বাদ করেছেন। কিশোরী কন্যা রানীকে মুক্তিযুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আহার জুগিয়েছেন। যখন রাজাকারদের তাড়া খাওয়া হিন্দু পরিবারগুলো আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল, মা তাদেরও আগলে রেখেছিলেন।
মা বরাবরই সাহসী। সম্ভবত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজাকার আবুল কালাম আজাদ বাচ্চু (যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত) আমাদের বাড়িতে হামলা চালাতে এলে আশপাশের নারী ও শিশুরা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। মা আমার ছোট ভাইবোনদের পাঠিয়ে দিয়ে বাড়িতেই থাকেন। যদিও বাচ্চু হামলা চালাতে পারেনি। গ্রামের লোকজন ঢাল, সড়কি, বল্লম ইত্যাদি নিয়ে এগিয়ে এলে বাচ্চু রাজাকার বাড়ির সামনে অবস্থান করে। সেখান থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি ফুটিয়ে চলে যায়। 
আরেকটি ঘটনা মা মোকাবিলা করেছিলেন। বিভাগদী-নতুবদীয়া ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা বোয়ালমারী থানার চাঁদপুর ইউনিয়নের দু'জন শান্তি কমিটির নেতাকে হত্যা করে। তাদের স্বজনদের ভুল তথ্যে কাশিয়ানি থেকে একটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ আমাদের বাড়িতে চড়াও হয়। তখন নতুবদীয়া ও বিভাগদীতে কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তারা ফরিদপুর শহরের আশপাশে বা অন্য এলাকায় অবস্থান করছিলেন। আগত মুক্তিযোদ্ধারা এসে অধ্যাপক আজাদকে খোঁজাখুঁজি করেন। তারা বাড়িতে আগুন দেওয়ার হুমকি দেন। মা বলেন, তোমরা মুক্তিযোদ্ধা না রাজাকার? তারা মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলে মা বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা তো মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে হামলা চালাতে পারে না। তারা কার বাড়ি জানতে চাইলে মা বলেন, আমার ছেলে আবু সাঈদ খান ও ওর বাবা আবদুর রশীদ খান দু'জনই মুক্তিযোদ্ধা। ওই দলে ছিলেন রাজেন্দ্র কলেজের একাধিক ছাত্র, যারা আমার সতীর্থ। কয়েকজন কল্যাণী ক্যাম্পে ছিলেন, সেখান থেকে আমাকে চেনেন। অধ্যাপক আজাদের পরিচয়ও শোনেন। এরপর আগত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তাদের ওপর, যারা তাদেরকে ভুল তথ্য দিয়ে পাঠিয়েছেন। তারা মার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। সেদিন মার সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় একটি ধেয়ে আসা অঘটন রহিত হয়।
২০০৯ সালের ২৬ মার্চ টিভি চ্যানেল বাংলা ভিশনে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল 'একাত্তরের মা'। এতে রফিকুল ইসলাম বীরোত্তমের মা ও আমার মায়ের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। আমি তখন মাকে আরেকবার নতুন করে আবিস্কার করলাম। অনুষ্ঠানে মা বিরামহীনভাবে একাত্তরের কথা বলে গেলেন। এক পর্যায়ে উপস্থাপিকা অভিনেত্রী-সংস্কৃতিকর্মী রোকেয়া প্রাচী প্রশ্ন করেন, স্বাধীন দেশে কেমন আছেন? মা বললেন, 'সবাই ভালো নেই। কেউ সুখে আছে; কেউ কষ্টে আছে, কেউ গাছতলায় আছে। এটা তো ভালো থাকা না।' আমি বুঝলাম, মার কাছে স্বাধীনতা মানে সবাই মিলে ভালো থাকা।
একাত্তরে মা বদলেছিলেন। তবে আর দশজন গৃহিণীর মতো গৃহকোণেই বন্দি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন। তার পেছনে রয়েছে আরেক প্রেক্ষাপট।
১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-উত্তর ঘটনা। তখন আমি জাসদের সার্বক্ষণিক কর্মী। আত্মগোপনে পারদর্শী হয়ে উঠেছি। তাই পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারছে না। এক পর্যায়ে আমার ওপর আত্মসমর্পণের চাপ দেওয়া হয়। তাতে কাজ না হওয়ায় বাবাকে গ্রেপ্তার করল। পুলিশ হুমকি দিল, আমি আত্মসমর্পণ না করলে বাবাকে ছাড়বে না, অস্ত্র মামলায় শাস্তি দেবে। বাবার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা দিয়েছিল, ১০ মাস আটকিয়েও রেখেছিল। তবে সাজা দিতে পারেনি। সামরিক আদালতই বাবাকে খালাস দেন। সে যাই হোক, তখন থেকে মাকে জেলগেট, আদালতপাড়া, নানা স্থানে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। তিনি ডিসি ও এসপির সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেন। তখন ফরিদপুরের ডেপুটি কমিশনার আবদুল মুয়িদ চৌধুরী। একদিন অনেকক্ষণ দেরি করে মা তাঁর সাক্ষাৎ পান। তখন বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা। সাক্ষাৎ শেষে মার কাছে জানতে চান, সঙ্গে কেউ আছে কিনা। মা বলেন, আমি আমার এই শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। এ কথা শুনে ডিসি সাহেব বলেন, রাতে কীভাবে যাবেন? মা বলেন, যার স্বামী জেলে পচছে; ছেলেকে পুলিশ খুঁজছে- পেলে গুলি করে মারবে, তার আবার রাতদিন। ডিসি সাহেব এ কথা শুনে তাঁর সেক্রেটারিকে একটি গাড়ি দিয়ে মাকে পৌঁছে দিতে বলেন। ডিসি অফিসের গাড়িতে মাকে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাটি এলাকায় মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি কাজে লেগেছিল। যারা ভেতরে ভেতরে শক্রভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিল, তারা আপনা আপনি চুপসে যায়।
আবদুল মুয়িদ চৌধুরী বা অন্য কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার পরামর্শে মা ইউনিয়ন পরিষদের নারী কোটায় মনোনীত সদস্য হন। পাঁচ বছর সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনার-ওয়ার্কশপে গিয়েছেন। নারী অধিকার, মানবাধিকার, মুসলিম পারিবারিক আইন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। মাত্র তেরো বছরে মার বিয়ে হয়েছিল। লেখাপড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কয়েক ক্লাস। তবে তিনি জীবনের পাঠশালা থেকে শিখেছিলেন। জমি কিংবা মুসলিম পারিবারিক আইনে ভাগবাটোয়ারার হিসাব মুখে মুখে বলতে পারতেন।
মা ঘর সামলেছেন, ৯টি ছেলেমেয়েকে লালনপালন করেছেন। পরিবারের নানা সমস্যা সমাধানে বাবার পাশে থেকেছেন। এর বাইরে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করতেন। আমি যখন ফরিদপুরে ছিলাম, তখন মা নানা সমস্যায় জর্জরিত লোককে আমার কাছে পাঠাতেন; কাউকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে হবে, কারও দলিল তুলে দিতে হবে বা কারও জন্য উকিলকে বলে দিতে হবে। এ সব কাজ মা নিজেও করতেন। ফরিদপুরের অনেক ডাক্তার, উকিল ও বিশিষ্টজনের সঙ্গে মার পরিচয় ছিল। অপরিচিত হলে বলতেন, আমি আবু সাঈদ খানের মা।
আমার মা সাধারণ হয়েও অসাধারণ। তাঁর সময়ের এবং তাঁর অবস্থানের চেয়ে অনেক অগ্রসর চিন্তার মানুষ, এক সংগ্রামী নারীর প্রতিকৃতি। তিনি ছিলেন বিদ্যুৎসাহী। পরিবারের ভেতরে ও বাইরে সবাইকে মন দিয়ে লেখাপড়া করতে বলতেন, প্রতিবেশীর ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহ দিতেন। যখন আমি নিজ গ্রামে বিভাগদী রিজিয়া রশীদ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেই তখন মা স্কুলের জন্য তাঁর শখের মেহগনি গাছগুলো দিয়ে দেন। বিভাগদী শহীদস্মৃতি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে মাকে বললাম, কেবল আমার জমিতে হবে না, আরও জমি লাগবে। ওখানে তোমার ১৬ শতাংশ রয়েছে। সেটিও দরকার। মা একবাক্যে বললেন, নিয়ে নাও।
স্কুল ও কলেজের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, নবীনবরণ ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে মা উপস্থিত থাকতেন। অসুস্থ শরীরে স্কুল ও কলেজে যেতেন। শিক্ষকদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। তাঁদের বলতেন, মন দিয়ে পড়াও। স্কুল ও কলেজে নতুন ভবন হচ্ছে শুনে মা খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেখে যেতে পারব কিনা। সে ইচ্ছে তাঁর পূরণ হলো না।
দেশের এই দুঃসময়ে মার চলে যাওয়া। তাঁকে সবাই মিলে বিদায় জানাতে পারলাম না। না, মাকে বিদায় জানাতে চাইও না। তিনি আছেন, থাকবেন আমাদের জীবনের অনন্ত প্রেরণা হয়ে।
লেখক ও সাংবাদিক
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি