ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে
×

আহমদ রফিক

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২০ | ১২:০০

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা করোনা সংক্রমণের মুখোমুখি হয়ে কী অবস্থায়, তা নিয়ে গত দুই মাস ধরে সংবাদপত্রে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। যেমন বিভিন্ন খবরে-তথ্যে, তেমনি কলামে-নিবন্ধে, এমনকি সম্পাদকীয় স্তম্ভে। এর মধ্যে দুটি শব্দ প্রাধান্য পেয়েছে সমন্বয়হীনতা ও শিথিলতা।
যে কোনো দেশে মারি দুর্যোগে-দুর্ভোগে মূল লড়াইটা চলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে। আনুষঙ্গিক অন্যান্য সংশ্নিষ্ট বিভাগ এবং সহযোগিতায় জনসাধারণ। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চলে প্রধানত দুটি খাতে- মৃত্যু প্রতিরোধ ব্যবস্থায় এবং প্রতিকার তথা দক্ষ চিকিৎসাসেবায়। শেষোক্ত ক্ষেত্রে প্রধান সহায় চিকিৎসক ও সেবিকা, অভিজ্ঞ প্রশাসক এবং সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল। প্রথমোক্ত ক্ষেত্রেও দরকার অভিজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট, দক্ষ প্রশাসক, মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও গবেষণাগার। এসব কিছুর দক্ষ পরিচালনার কেন্দ্র স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিভাগ- যাদের মেধা, চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা ও সেসব বাস্তবায়নে কর্মবিধি প্রণয়ন এবং তৎপরতা। এককথায় একটি সুসমন্বিত ব্যবস্থা।
বিষয়টি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্য, ভিন্ন নয়। অন্য প্রসঙ্গ থাক, করোনার আক্রমণের সুষ্ঠু ও কার্যকর মোকাবিলায় আমাদের পূর্বোক্ত কর্তৃপক্ষ যে যথাযথ দক্ষতায় সাড়া দিতে ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি, তা নিয়ে সমাজে, সংবাদপত্রে সমালোচনার শেষ নেই। অভিযোগও কম নয় অনেক অবাঞ্ছিত মৃত্যুর কারণে। জানি না, সে জন্যই কিনা করোনা মোকাবিলায় শুরু থেকেই মূল নির্দেশনাগুলো আসছে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে। এমনকি ঈদের ছুটিতে কর্মস্থল ছেড়ে দেশবাড়িতে-গ্রামে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও।
করোনা মোকাবিলায় অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা, শিথিলতা ইত্যাদি ঘটনার নেপথ্যে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দুই প্রধানের ব্যক্তিত্ব দ্বন্দ্বই যে মূল কারণ, তা কারও কারও জানা থাকলে সাধারণ্যে জানা ছিল না, হয়তো আভাস-ইঙ্গিত ছিল। ঘটনা-রহস্য কিছুটা স্পষ্ট হলো ৫.৬.২০২০ তারিখের একটি খবরে ও প্রতিবেদনে 'স্বাস্থ্য সচিব বদল/মন্ত্রীর কী হবে'?
আমরা এ বিষয়ের সূত্র নিয়ে বিশদ আলোচনায় যাচ্ছি না। শুধু সামান্য কিছু বক্তব্য উদ্ৃব্দত করছি। তাতে লেখা হয়েছে, 'করোনা মহামারির এই সময়ে (স্বাস্থ্য) মন্ত্রণালয়ের দুই প্রধান কর্তাব্যক্তির বিরোধ, তাদের ব্যর্থতা ও পারস্পরিক সমন্বয়হীনতায় সরকার যেমন বিব্রত, মানুষও তেমন বিরক্ত' (প্রথম আলো)।
সংবাদপত্রটির বিশদ প্রতিবেদন কতটা সঠিক-বেঠিক, সে বিবেচনায় না গিয়েও করোনা মোকাবিলায় আমরা দেখেছি অব্যবস্থাপনা- মাস্ক মুনাফাবাজি থেকে চিকিৎসক-সেবিকা-স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্ভেজাল পিপিই সরবরাহে বিশৃঙ্খলা। ফলে সংশ্নিষ্টদের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দানে দূরে থাকা, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসাসেবা ক্ষেত্রে খামখেয়ালিপনা, পরিণামে বেশ কয়েকটি করুণ মৃত্যুর ঘটনা সমাজে আলোড়ন তোলে। এর মধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবও (গৌতম আইচ) আছেন, যার কন্যা একজন চিকিৎসক। তবু তার পিতার সুচিকিৎসা মেলেনি।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ (মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তর) বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর এ জাতীয় অমানবিক আচরণের কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা জানি না। কিন্তু ওইসব ঘটনার পরও তাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন ঘটেছে বলে লক্ষ্য করা যায় না। একটি নামি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে তো ইতোমধ্যে চিকিৎসায় অবহেলাজনিত কারণে মামলা রুজু হয়েছে। এর আগেও এ সংস্থাটির বিরুদ্ধে এ জাতীয় অভিযোগ উঠেছে, যা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে নির্বিকার কেন?
দুই.
করোনাভাইরাস সংক্রমণ একটি জাতীয় দুর্যোগ- যার মোকাবিলায় দরকার সব সংশ্নিষ্ট বিভাগের দক্ষ তৎপরতার সমন্বয়, চিকিৎসক-সেবিকা-নার্সিং হোমগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা, যা না হলে এ সীমিত মহামারির ক্রমশ বিস্তার ঘটবে। সরকার ও জনগণ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এসব কথা সবাই বোঝেন, জানেন, কাউকে বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। এর মধ্যে যদি আবার মুনাফাবাজি ও দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটে, তাহলে তা সরকারের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা বলাই বাহুল্য। বিষয় দুটি নিয়ে তাই অনেক লেখালেখি হচ্ছে; কিন্তু তাতে সংশ্নিষ্টদের বোধোদয় ঘটছে না। ওই ৫ তারিখের একটি বড়সড় খবর তার প্রমাণ (কালের কণ্ঠ)।
এর মধ্যে আলোচিত বিষয়ের সূত্র নিয়ে একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা-চিকিৎসকের দীর্ঘ সময়কার অভিজ্ঞতার বিবরণে (উপ-সম্পাদকীয়, যুগান্তর ৫.৬.২০২০) বলা যায়, তিক্ত ফসল পড়ে অবাক হইনি। কারণ তার অভিজ্ঞতা আমাদের পূর্ব বক্তব্যের বাস্তবতাই প্রকাশ করেছে, মাঝেমধ্যে তীব্র, তির্যক মন্তব্যে। বলাই বাহুল্য, তার বক্তব্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে। কারণ তিনি ওই বিভাগেই মাঠ পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ে আসীন ছিলেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাপরিচালক।
তার রচনাটি যেমন তথ্যসমৃদ্ধ, তেমনি উপভোগ্য। শুরুতেই উপজেলা পর্যায়ে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে মশারি বিতরণে দুর্নীতির ঘটনা, করোনায় বর্তমান ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতি অবশ্য অনেক বড়সড় মাত্রার। বিশদ বিতরণে না গিয়ে আমরা শুধু তার কয়েকটি মন্তব্য তুলে ধরব, যা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিষয়ক এ তাবৎ আলোচনার সমান্তরাল ('কাছ থেকে দেখা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা')।
অবস্থাদৃষ্টে আমরা ইতোপূর্বে বলেছি, এ লেখাতেও বলছি- করোনা পরিপ্রেক্ষিত এটা স্পষ্ট এবং ভবিষ্যতের জন্যও প্রয়োজনীয়; তা হলো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, বিশেষ করে স্বাস্থ্য পরিচালনাকে দক্ষ, সৎ, বিশেষ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের দিয়ে নতুন করে পুনর্বিন্যস্ত করা দরকার। আমরা আগেও বলেছি, এখানে রোগ প্রতিরোধক এবং মারিতাত্ত্বিক গবেষণার প্রতিষ্ঠা অতীব জরুরি। চিকিৎসাসেবা ক্ষেত্রে উচ্চমান প্রশিক্ষণ বিষয়ে একই কথা খাটে; খাটে দক্ষ প্রশাসনের ক্ষেত্রেও দক্ষ হাসপাতাল পরিচালনা অবহেলিত।
তিন.
পূর্বোক্ত চিকিৎসক মহোদয় প্রধানমন্ত্রীর আমলের বিভিন্ন মেয়াদে স্বাস্থ্য খাতে অর্জিত সুফলগুলো উল্লেখ করেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন :'কষ্ট নিয়েই বলতে হয়, মহামারি করোনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অনেক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতা আমাদের নতুন করে ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে।'
তার দীর্ঘ আলোচনায় একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য :'গত কয়েক বছরে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরে যারা প্রধান প্রধান পদে দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অদূরদর্শিতা, অক্ষমতা, দুর্নীতি দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি অবজ্ঞা চূড়ান্তভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।' এরপর রয়েছে আরও অনুরূপ মন্তব্য এবং সেই সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ঘটনাবলির উল্লেখ। তিনি প্রসঙ্গত মাস্ক কেলেঙ্কারির (দুর্নীতি) কথাও উল্লেখ করেছেন।
সবশেষে লিখেছেন, 'আমরা স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি চাই। হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রচুর জনবল নিয়োগ করে জনগণের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উদ্যোগ দেখতে চাই। কর্মস্থলে নিরাপত্তা চাই। নীতিবিবর্জিত আর অক্ষম ব্যক্তিদের হাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখতে চাই না। ইত্যাদি পরামর্শ।
লেখকের পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার সঙ্গে কেউ হয়তো দ্বিমত পোষণ করতে পারেন আলোচনার ক্ষেত্রবিশেষে। কিন্তু মূল অভিযোগগুলো নিয়ে অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তবে এই সঙ্গে আমাদের আরও সংযোজন-স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগে অতি আবশ্যিক দলমতনির্বিশেষ মেধাবী, দক্ষ ও সৎ এবং পেশাদারিত্বের আদর্শে বিশ্বাসী চিকিৎসক ও প্রশাসক এবং একই আদর্শের সেবিকা। না হলে সব লক্ষ্য ভণ্ডুল হয়ে যাবে। করোনা প্রতিরোধ তো বটেই।
যাবে দুর্নীতি, আত্মপরতা ও ঔদ্ধত্যের মতো অবাঞ্ছিত অপগুণের টানে। স্বাস্থ্য প্রশাসকের জন্য বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, গবেষণাধর্মী মানসিক প্রবণতা এবং শ্রমনিষ্ঠাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। লেখক বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করেননি হয়তো ইচ্ছা করেই। কিন্তু ওই খাতটি এখন বিশাল এক সিন্ডিকেট, যেমন ঔষধ কোম্পানি সিন্ডিকেট। তারা কাউকে তোয়াক্কা করে না বিশেষ কারণে। ইচ্ছামতো ওষুধের দাম বাড়ায় জনগণের মাথায় বোঝার ওপর শাকের আঁটি তুলে দিয়ে।
এসবই পরস্পর সংশ্নিষ্ট। লেখক যে জনগণের স্বাস্থ্যসেবার কথা বলেছেন, তাদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা দুই ক্ষেত্রেই মানবিক চেতনার প্রকাশ অপরিহার্য। তা তিনি চিকিৎসক বা সেবিকা হোন, টেকনোলজিস্ট বা প্রশাসক হোন কিংবা হোন ওষুধ প্রস্তুতকারক- প্রতিটি ক্ষেত্রে চাই দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ ও মানবিকবোধের প্রকাশ। স্বীকার করতেই হবে, একাধিক খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতে অনেক কিছুর সঙ্গে এ দুটির ভয়ানক ঘাটতি। এ ঘাটতি পূরণের কোনো বিকল্প নেই। এ কথাটাই করোনা প্রসঙ্গে এবং সাধারণ বিচারে আমাদের মূল বক্তব্য।
ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×