বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর প্রতিকার
যেমন আইনের, তেমন আর্তমানবতার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২০ | ১০:৪১
উচ্চ আদালত সোমবার এক রায়ে বলেছিলেন, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ফেরত পাঠানো বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বা 'অবহেলাজনিত মৃত্যু' বা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য। পাশাপাশি এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনাসহ ১১ দফা নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু যে হারে বেড়েছে, তার প্রেক্ষাপটে ভার্চুয়াল বেঞ্চে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের এমন 'কড়া' নির্দেশনা স্বাভাবিক ছিল। বস্তুত এতে প্রতিফলিত হয়েছিল বিপুল অধিকাংশ নাগরিকের প্রত্যাশা। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই নির্দেশনার অপব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই আমরা দেখছি, রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে এই নির্দেশনার অধিকাংশ স্থগিত করা হয়। যদিও করোনা চিকিৎসা পরিস্থিতি আদালতকে জানানো, বেসরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ ও দোকানে অক্সিজেন সিলিন্ডারের মূল্য প্রদর্শনের নির্দেশনা বহাল রাখা হয়েছে।
আমরা মনে করি, বিষয়টি কেবল আইনগত নয়, আর্তমানবতারও। ফলে চিকিৎসা না দিয়ে যেসব হাসপাতাল রোগী ফিরিয়ে দেয়, তারা এই দফায় আইনি ব্যবস্থা থেকে রেহাই পেলেও আর্তমানবতার ডাকে সাড়া দেবে বলে প্রত্যাশা। যদিও আপিল বিভাগে স্থগিত হয়েছে, রায়টি মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর মধ্যে দায়বদ্ধতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে আশা করা যায়। আমরা জানি, করোনা পরিস্থিতিতেও সুযোগ সন্ধানীচক্র মানুষকে জিম্মি করে নিজেরা পকেট স্ম্ফীত করে চলেছে। নিয়মনীতিহীন কর্মকাণ্ড চলছে এবং সৃষ্ট নৈরাজ্যে মানুষের বিড়ম্বনা বেড়ে চলেছে। নিকট অতীতে সমকালের সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা এ পরিস্থিতির প্রতিকার দাবি করেছিলাম। বস্তুত আদালতের নির্দেশনা ছাড়া এমনিতেও সংবিধান স্বীকৃত ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণে সরকারের সংশ্নিষ্ট পক্ষের উদাসীনতা মেনে নেওয়া যায় না।
আমরা প্রশ্ন রাখি, বিগত কয়েক মাসে বিনা চিকিৎসায় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে যাদের প্রাণহানি ঘটেছে, কেন এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তযোগ্য কিংবা দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ করোনা সংক্রমণ সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে বাজারে যারা তুঘলকি কাণ্ড চালাল কেন তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হয়নি? আমরা এখন দেখতে চাইব, নির্দেশনার বিরুদ্ধে আপিলকারী রাষ্ট্রপক্ষ এসব বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেয়। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত ফের ভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে অন্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগী, প্রসূতি চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণহানি বাড়ছে। চিত্রে ফুটে উঠেছে, চট্টগ্রামে এক মা অ্যাম্বুলেন্সে তার সন্তানকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালের দরোজায় ধরনা দিয়েও চিকিৎসা পাচ্ছেন না। সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসা এমন চিত্র নতুন নয়। এই পরিস্থিতি কোনো মানবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না। চিকিৎসা না পেয়ে ঘুরে ঘুরে মরে যাওয়া কোনোভাবেই মানুষের নিয়তি হতে পারে না।
মানুষের জীবন-মৃত্যুর ভরসাস্থল হাসপাতালগুলোতে ইতোমধ্যে মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কম ঘটেনি। শুধু করোনা দুর্যোগকালেই যে দেশে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা-ই নয়। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়বদ্ধতার বিষয়টি যেমন উপেক্ষণীয় থাকতে পারে না তেমনি ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির বিষয়টিও থাকতে পারে না অনালোচিত। প্রশ্নমুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের ভুলে গেলে চলবে কি করে? স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণহীনতা, সমন্বয়হীনতা, কারও কারও পেশাগত দায়িত্বহীনতা দূর করে এসব ব্যাপারে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করতেই হবে। আমরা শ্রদ্ধা জানাই সেসব চিকিৎসকসহ সংশ্নিষ্ট মহলের দায়িত্বশীল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং অন্যদের যারা করোনা দুর্যোগে শুধু করোনাক্রান্তদেরই নয় অন্য ব্যাধিক্রান্তদের প্রতিও প্রসারিত করেছেন মানবিতার হাত এবং নানাভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন।
করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। মানসিক চাপে অন্য ব্যাধিতে আক্রান্তের হারও বাড়ছে। আশঙ্কা রয়েছে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া নিয়েও। এমতাবস্থায় চিকিৎসা ব্যবস্থার সব রকম অব্যবস্থাপনা দূর করে যে কোনো রোগাক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি-ক্লিনিক অর্থাৎ প্রতিটি চিকিৎসাকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। রোগীদের ভোগান্তি রয়েছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ চাই। যেসব হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুতে মর্মন্তুদতার সৃষ্টি হয়েছে এর প্রত্যেকটি ঘটনার প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
- বিষয় :
- বিনা চিকিৎসা