ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকৃত রাজনীতির চর্চা এখন মূল্যহীন?

প্রকৃত রাজনীতির চর্চা এখন মূল্যহীন?
×

ড. নাদির জুনাইদ

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২০ | ১৪:৫০

দেশ ভাগের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের গৌরবময় অর্জনগুলো সম্ভব হয়েছিল দেশের মানুষের রাজনৈতিক বোধ আর সক্রিয়তার কারণেই। সেই সময় দেশ পেয়েছিল বিচক্ষণ আর কর্তব্যনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ। যথাযথ রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল অনেক তীক্ষষ্ট ধী ছাত্রনেতা। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো মনে করতেন রাষ্ট্র শাসনের কাজে যুক্ত হওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। যাদের মধ্যে এই গুরুদায়িত্ব পালনের সহজাত যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য দেখা যাবে, সেই মানুষদের বিশেষ রাজনৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করতে হবে। যে রাজনৈতিক শিক্ষা তাদের শেখাবে বিত্ত এবং ক্ষমতা লাভ করলেই জীবন অর্থবহ হয় না। প্রকৃত অর্থে সুন্দর জীবন হলো প্রজ্ঞা, শুভবোধ ও ন্যায়বিচার দিয়ে পরিচালিত জীবন।

প্লেটোর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রাজনীতি কোনো মামুলি ব্যাপার নয়। রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা আর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দেশের প্রতি কর্তব্য পালনের মানসিকতা। এ কারণেই প্লেটো বলেছিলেন, যারা রাজনীতিতে আসবেন তাদের পরিবার থেকে আলাদা করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন নিজের কাছের মানুষদের চেয়ে রাষ্ট্রকে বেশি সেবা করার মানসিকতা তাদের মধ্যে তৈরি হয়। রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধান পরামর্শদাতা চাণক্য বলেছিলেন রাজ্য সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য মন্ত্রীরা শাসককে মূল্যবান এবং যৌক্তিক পরামর্শ দেবেন। চাণক্য মনে করতেন রাষ্ট্র হলো একটি গাড়ি, আর দেশের শাসক গাড়ির একটি চাকা। গাড়ির অন্য চাকাগুলো হলো দেশের মন্ত্রীরা। এক চাকায় যেমন গাড়ি চলবে না তেমনি মন্ত্রীরা রাজনীতি-অভিজ্ঞ ও সুবিবেচক না হলে শাসক একা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবেন না।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের রাজনীতিতে আমরা কী দেখতে পেয়েছি? যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে পাই তাতে মনে হয়, এই দেশে এখন রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য রাজনীতি আসলে কী তা অনুধাবন করার এবং দীর্ঘদিন রাজনৈতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলকে মানব আর মুদ্রা পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের একজন সদস্যকে অন্য এক দেশের সরকার তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য ব্যাপারটি কতটা মর্যাদা হানিকর! সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাপুল স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হলেও আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়েই তিনি সাংসদ হয়েছিলেন। আরও জানা যায়, ৩০-৩২ বছর আগে পাপুল গ্রাম ছেড়ে বিদেশে যান। তখন তিনি ছিলেন অনেকটা নিঃস্ব। বিদেশে গিয়ে আদম ব্যবসা শুরু করার পর তার অবস্থার পরিবর্তন হয়। ২০১৬ সালের আগে গ্রামের মানুষ তাকে চিনতেন না; কিন্তু নির্বাচনের সময় দেদার টাকা বিলিয়ে তিনি সাংসদ হয়ে যান। উল্লেখ্য, পাপুলের স্ত্রীও সংরক্ষিত আসনের একজন সাংসদ।

আদম ব্যবসা করে অর্থশালী হওয়া একজন মানুষ আমাদের দেশে আইনপ্রণেতা হতে পারেন- এই বাস্তবতা আমাদের বিস্মিত ও হতাশ করে। দেশে প্রকৃত রাজনীতি এখন কতটা মূল্যহীন যে, যাকে এলাকার মানুষ চিনতই না, মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত এমন একজন মানুষ কেবল টাকার জোরে রাজনৈতিক সমর্থন পেয়ে আইনপ্রণেতা হয়ে গেলেন আমাদের দেশে। কেবল পাপুলের অন্যায়ের সংবাদই নয়, দেশের সংবাদপত্রে আরও কিছু সাংসদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিতর্কিত কাজের ওপর প্রতিবেদনও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। রাজনীতি করলে, জনপ্রতিনিধি হলে যে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতি থেকে দূরে থেকে সত্যিকার অর্থেই মানুষের সেবা করতে হবে, সেই রাজনৈতিক শিক্ষা কি রাজনৈতিক দল এই মানুষদের দিয়েছিল? রাজনীতি করা, সংসদে দায়িত্ব পালন করা সহজ কোনো কাজ নয় যে, প্রকৃত রাজনীতির প্রয়োজনীয় পাঠ এবং চর্চা ছাড়া এবং জটিল দায়িত্ব পালনের মতো বুদ্ধিবৃত্তি ছাড়া যে কেউ রাজনীতিবিদ হয়ে যাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের আমি 'পলিটিক্যাল প্রসেস অ্যান্ড ইনস্টিটিউশন' নামে একটি কোর্স পড়াই। কোর্সটিতে বিখ্যাত দার্শনিক আবু নাসের আল-ফারাবির একটি ধারণা আমি প্রতি বছরই আলোচনা করি। আল-ফারাবি কয়েক ধরনের রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন। সৎভাবে জীবনযাপন করা কেন জরুরি তা বোঝার জ্ঞান যে রাষ্ট্রে মানুষের তৈরি হয় না, সেই রাষ্ট্র একটি 'নির্বোধ রাষ্ট্র'। যে রাষ্ট্রে মানুষ খারাপ এবং ভুল কাজকেই ভালো এবং সঠিক কাজ মনে করে, তা একটি 'ভ্রান্ত চিন্তার রাষ্ট্র'। আর যে রাষ্ট্রে মানুষ জানে ন্যায় আর সততা কী, কিন্তু জানার পরেও তারা সৎভাবে জীবনযাপন না করে অন্যায় কাজ করে, সেই রাষ্ট্র হচ্ছে একটি 'বিকৃত চিন্তার রাষ্ট্র'। আল-ফারাবির মতে কোনো রাষ্ট্র এমন হয়ে গেলে বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্রের সরকার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

এই তিন ধরনের ত্রুটিপূর্ণ রাষ্ট্রেই জীবন প্রকৃত অর্থে সুন্দর করে তোলার ব্যাপারে মানুষের মনোযোগ থাকে না। তাদের আগ্রহ থাকে অনেক টাকার মালিক হওয়ার প্রতি, আর ভোগসর্বস্ব জীবনযাপনের প্রতি। দুঃখজনক যে, আমাদের দেশে যেভাবে বিভিন্ন সময় দুর্নীতি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ ব্যবসা, অনিয়ম, রাজনৈতিক ক্ষমতায় মত্ত হয়ে সন্ত্রাস আর নির্যাতনের ঘটনা আমরা দেখতে পাই, তাতে বোঝা যায় আল-ফারাবি বর্ণিত সেই ধরনের মানুষের সংখ্যা এখানে কম নয়। রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য যদি হয় জনকল্যাণ, তাহলে রাজনীতি করে সম্পদশালী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ আমাদের সমাজে দুর্নীতি হচ্ছেই। দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষেরা যদি এই দেশে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী হন, তাহলে জনগণের কল্যাণের জন্য তারা কাজ করছেন রাজনৈতিক দলগুলোর এমন দাবি তো বিশ্বাসযোগ্য হবে না।

এখানে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের ছাত্র সংগঠন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ক্ষমতার দাপট দেখাতে শুরু করে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় মূল দলের সব কাজের প্রতি সম্মতি প্রদর্শন। মূল দলের কোনো নেতার কর্মকাণ্ড বিতর্কিত হলেও ছাত্র সংগঠন তার সমালোচনা করে না। বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের নেতাকমঅীরা এমন রাজনৈতিক চর্চায় অভ্যহমশ হওয়ার পর কী করে আশা করা যায় দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করার ব্যাপারে ভবিষ্যতে তারা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে? রাজনীতির অর্থ তো নিজ স্বার্থে নেতাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন আর ক্ষমতার দাপট দেখানো নয়।

প্রখ্যাত মার্কিন লেখক হেনরি ডেভিড থোরো গুরুত্ব দিয়েছিলেন মানুষের নীতিচেতনা। থোরো মনে করতেন নির্দিষ্ট কোনো বিধি মানার পরিবর্তে একজন ব্যক্তির নৈতিক বোধ তাকে যে কাজ করতে বলে, তার তাই করা উচিত। আর মানুষ তার নীতিচেতনা অনুযায়ী কাজ না করলে রাষ্ট্রে অন্যায় বাড়বে। নৈতিক বোধবিহীন মানুষদের থোরো তুলনা করেছিলেন প্রাণহীন কাঠ বা পাথরের টুকরোর সঙ্গে যা ব্যবহার করেই তৈরি করা হয় অত্যাচার আর নিপীড়ন করার যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ তো তাদের নীতি বাদ দিয়ে রাজনীতি করেননি। অন্যায় দেখেও নিজ স্বার্থের জন্য তারা নীরব থাকেননি। তারা শোষণমূলক ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর বিরোধিতা করেছেন যৌক্তিকভাবে। তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাই অজস্র মানুষকে নৈতিক সাহসে উজ্জীবিত হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

রাজনীতিবিদরা তাই তখনই সফল যখন তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য মানুষের ওপর অন্যায়ভাবে কর্তৃত্ব করার পরিবর্তে মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেন। রুশ বিপ্লবী আলেকজান্ডার হারজেন যেমন বলেছিলেন, 'সবার জন্য সত্যিকারের স্বাধীনতাই হলো প্রকৃত বিপ্লবের মূল আদর্শ।' হারজেন সতর্ক করেছিলেন যে, কিছু রাজনীতিবিদ কেবল নিজেদের মুক্তি নিশ্চিত করেন, জনসাধারণের অবস্থার পরিবর্তন করার প্রতি তাদের আগ্রহ থাকে না। এই রাজনীতিবিদরা যেন মানুষের পায়ের শিকল ভেঙেছেন ঠিকই, কিন্তু কারাগারের দেয়াল ভেঙে দেননি। তা তারা নিজেদের সুবিধার জন্য ঠিকই টিকিয়ে রাখেন এবং গণমানুষের প্রকৃত মুক্তি আসে না। হারজেনের এই বক্তব্য বিভিন্ন সময়ে দেখতে পাওয়া বাস্তব অবস্থাই বর্ণনা করে। রাজনীতি যদি একটি ক্ষুদ্র ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে তা আর রাজনীতি থাকে না। আমাদের দেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি কেবল মুখের কথায় নয়, সত্যিকার অর্থেই কি সাধারণ মানুষের কল্যাণ করছে? রাজনীতি যারা করেন তাদের এবং সচেতন নাগরিকদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার।

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×