ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

করোনা সংকট ও তারুণ্য

করোনা সংকট ও তারুণ্য
×

ড. আতিউর রহমান

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২০ | ১২:০০

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং প্রতিদিনই সংক্রমণ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা অস্বীকারের উপায় নেই। নিঃসন্দেহে এ খাতে সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমাদের জনসচেতনতাও অপ্রতুল। স্বাস্থ্য খাতের এই নাজুক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন না আনতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনমনে আস্থা ফিরে আসবে বলে মনে হয় না। আর তা ফিরে না এলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের আলাপ অপ্রাসঙ্গিকই মনে হবে। তদুপরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় করোনা পরীক্ষার জন্য চার্জ নির্ধারণ এবং বেসরকারি পর্যায়ে ফি ও অন্যান্য খরচ নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারায় জনমনে অসন্তুষ্টি বিরাজ করছে। পাশের পশ্চিমবঙ্গ সরকার কিন্তু জনস্বার্থে এই নিয়ন্ত্রণ বলবৎ করতে পেরেছে। তা হলে আমরা কেন পারব না?
যে কোনো কারণেই হোক এ পরিস্থিতি যে একটি যুদ্ধাবস্থা- সেই ভাবটি এখনও আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাবনার কেন্দ্রে স্থান করে নিতে পারেনি। এর অংশ হিসেবেই দেখা দিয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্তিমিত রূপ। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে হঠাৎ করেই কর্মসংস্থানের সুযোগ উধাও হয়ে গেছে। জীবন ও জীবিকা দুই-ই আজ বিপন্ন। এই প্রেক্ষাপটে তরুণ সমাজের ভূমিকা নিয়ে নিশ্চয়ই আলাপের সুযোগ রয়েছে।
এখন আমাদের তরুণদের বড় অংশই বাসায় বসে সময় কাটাচ্ছে। একটি অংশ হয়তো অনলাইনে সীমিত আকারে পড়ালেখাতেও যুক্ত আছে। স্বভাবতই এই তরুণরা করোনায় বিপন্ন মানুষকে রক্ষা করতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন শহর ও গ্রামের অসংখ্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। কখনও স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে নিজেরাই উদ্যোগ নিচ্ছেন।
আমাদের মানতেই হবে যে, করোনার মতো মহাদুর্যোগ মোকাবিলা সরকারের একার পক্ষে তো সম্ভব নয়ই, এর সঙ্গে ব্যক্তি খাতের এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া উদ্যোগও যথেষ্ট হবে না। এই মহাসংকট উত্তরণ তখনই সম্ভব যখন বৃহত্তর অর্থে সমাজকে এখানে যুক্ত করা যাবে। আর স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে স্বেচ্ছাসেবা দিতে এগিয়ে আসা তরুণরাই সমাজের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোর যোগসূত্র স্থাপন করতে পারে। সারাদেশে আমাদের ১৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। করোনা আক্রান্তদের প্রাথমিক সেবা, পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতা না থাকায় এসব কমিউনিটি ক্লিনিক বেশিরভাগ রোগীকেই শহরের হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এ সময় গ্রামে বসে থাকা শিক্ষিত তরুণদের যদি নূ্যনতম প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা যায় তাহলে এ দুর্ভোগ অনেকখানি কমে আসবে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এ তরুণরা মানুষের মধ্যে করোনা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম একরকম বন্ধ। দূরশিক্ষণের মাধ্যমে কোথাও কোথাও ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে এবং মিশ্র ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি আমাদের সামনে এটা স্পষ্ট করে তুলেছে যে, দেশব্যাপী ইন্টারনেট অ্যাকসেস থাকলেও শহর-গ্রাম ভেদে এর গুণমানের পার্থক্য আছে, পার্থক্য আছে ইন্টারনেট খরচের ক্ষেত্রেও। এ ছাড়াও শোনা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের বিপুল অংশের কাছে ইন্টারনেটে ক্লাস করার মতো পর্যাপ্ত ডিভাইসও নেই। এ পরিস্থিতি একটু হতাশাজনক হলেও মনে রাখতে হবে দূরশিক্ষণে ক্লাস নেওয়ার মতো আইসিটি অবকাঠামো নির্মাণ আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় হয়তো এতটা সামনে ছিল না। তবে এটাও সত্য যে, আগে থেকে সুপরিকল্পিতভাবে এগুলো আমরা এতদিনে হয়তো ভারসাম্যপূর্ণ দূরশিক্ষণ অবকাঠামো প্রস্তুত করতে পারতাম।
এই দশকের শুরু থেকেই ডিজিটাল আর্থিক সেবাকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অগ্রাধিকার দিয়েছে বলে করোনা আসার আগেই সারাদেশে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে গেছে। এর সুফল আমরা পেয়েছি করোনা দুর্যোগের সময়। এমনকি সরকারও বিপন্ন মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য ডিজিটাল মাধ্যমকেই বেছে নিয়েছে। কাজেই শিক্ষা খাতের ডিজিটাইজেশনে এখন বিপুল বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের দরকার হবে। তবে সবার আগে দেশের সব জায়গায় যেন সুলভে মানসম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোর আর্থিক সামর্থ্যের বিবেচনায় তাদের ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষা নেওয়ার জন্য আর্থিক প্রণোদনা বা বৃত্তি শুরু করতে হবে। এর আগে বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের অংশগ্রহণ আমরা নিশ্চিত করে সারা বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছি।
ডিজিটাল পাঠদানের সবচেয়ে বড় বাধা গ্রামে গণমানুষের ইন্টারনেট প্রাপ্তির সংকট। বিটিআরসির কাছে থাকা সামাজিক দায়বদ্ধ তহবিল থেকে প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি করে 'ইন্টারনেট হটস্পট কানেকটিভিটি' দেওয়া যেতে পারে। গ্রামে থেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব হটস্পট থেকে ভালো মানের ইন্টারনেট সেবা পেতে পারে। যেসব তরুণ ডিজিটাল উদ্যোক্তা হিসেবে ই-কমার্স ও ফ্রিল্যান্সিং করতে চায়, এই সংকটকালে তাদেরও সুবিধা হবে। আমাদের গ্রামে-গঞ্জে সাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক পৌঁছে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই অবকাঠামো ব্যবহার করে নিশ্চয়ই বিটিআরসি গ্রামে গ্রামে এমন হটস্পট সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে অনলাইন প্রশিক্ষণের সুযোগও সৃষ্টি করা সম্ভব। কৃষিপণ্যের ই-মার্কেটিংয়ের জন্য ডিজাইন ও উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে তাদের পারদর্শী করা সম্ভব।
করোনাজনিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ হতে পারে কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো। কৃষিতে শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি যুক্ত আর অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের একটি বড় অংশ যুক্ত আছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর সঙ্গে। এ দুই খাতেই তরুণদের অংশগ্রহণ রয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। আমাদের চেষ্টা করতে হবে এই দুই খাতেই তরুণ উদ্যোক্তা আরও বেশি করে তৈরি করার এবং তাদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার। তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রশংসনীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে। যেমন- ন্যাশনাল সার্ভিস প্রোগ্রামের আওতায় এ পর্যন্ত যে প্রায় দুই লাখ ৩০ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটি এবং বিডাও তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। যুব মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় 'পাইকারি ডট সেল' নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গ্রামের পণ্য শহরে বিক্রি করতে আগ্রহী তরুণ উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করছে। চলমান এসব কর্মসূচির পরিসর আরও বড় করলে অবশ্যই তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান তৈরির চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা সম্ভব হবে।
কেবল প্রশিক্ষণ নয়, তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নও নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে মনে হয় চাহিদার বিচারে প্যাকেজের ্‌আকার আরও বড় করা দরকার। যেহেতু প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন প্রধানত নির্ভর করবে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর তাই ব্যাংকগুলোকেও উৎসাহিত করার কর্মসূচি নিতে হবে। গত ২২ জুন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি ঘোষণা দিয়েছে। ভারতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে ব্যাংকগুলো যে ঋণ দিচ্ছে তার সবই ন্যাশনাল ক্রেডিট গ্যারান্টি ট্রাস্টি কোম্পানির (এনসিজিটিসি) আওতায় ক্রেডিট গ্যারান্টি পাচ্ছে। ফলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ খাতে দেওয়া সব ঋণকে 'শূন্য ঝুঁকির ঋণ' হিসেবে বিবেচনা করতে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে। বাংলাদেশেও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের মাধ্যমে এসএমই খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করেছে। এখন অবিলম্বে বাংলাদেশ ব্যাংকেরই একটি বিভাগের অধীনে এই স্কিম চালু করে দেওয়া উচিত। সরকার এর পুঁজি দেশের ভেতর থেকে এবং বিশ্বব্যাংক থেকে পাওয়া প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে জোগান দিতে প্রস্তুত রয়েছে। আর তা না পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই এই পুঁজি দিতে পারে। এই সংকট মোকাবিলা শেষ করে একটি স্বতন্ত্র ক্রেডিট গ্যারান্টি কোম্পানি বা সাবসিডিয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক দাঁড় করাতে পারে। সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের আদলে এমন একটি পাবলিক কোম্পানি গড়া খুবই সম্ভব।
এখন তরুণ উদ্যোক্তাদের নানা উদ্যোগে সহায়তা দেওয়ার জন্য ব্যাংক নিজে প্রণোদনা তহবিল থেকে তাদের অর্থ দিতে পারে অথবা এমএফআইগুলোর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেও দ্রুত অর্থ ছাড় করতে পারে। অনেক খুদে উদ্যোক্তা চলতি মূলধনের অভাবে বসে পড়েছে। তাই আর দ্বিধা নয়। আর্থিক খাতকে সরকার ঘোষিত প্রণোদনাগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে তরুণ উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা স্মরণকালের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিলম্বের সুযোগ একেবারেই নেই। কাজে নেমে পড়ার সময় বয়ে যাচ্ছে।
[email protected]
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

আরও পড়ুন

×