ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

সরকারি পাটকল

প্রশ্নটি অনিয়ম বন্ধের, অস্তিত্ব রক্ষার

প্রশ্নটি অনিয়ম বন্ধের, অস্তিত্ব রক্ষার
×

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২০ | ১২:০০

বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধের যে সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এর বিকল্প ছিল না বলে আমরাও মনে করি। অস্বীকার করা যাবে না যে, এই 'গোল্ডেন হ্যান্ডশ্যাক' বাস্তবায়নে কমবেশি ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী নিয়মিত কাজ হারাবেন। কিন্তু এমনিতেও মাঝেমধ্যেই বকেয়া বেতনের দাবিতে তাদের রাজপথে নামতে হতো। আমরা কয়েক দশক ধরেই দেখছি- রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ক্রমাগত লোকসান দিয়ে চলছে। কাঁচা পাট সংগ্রহ থেকে পাটজাত পণ্য বিপণন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্টদের অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতায় গুণগত ও পরিমাণগত উভয় দিক থেকেই পায়ের নিচের মাটি হারাচ্ছিল পাটকলগুলো। পাশাপাশি দলাদলি, স্বজনপ্রীতি, কায়েমি স্বার্থ তো ছিলই। লোকসান সামাল দিতে প্রতিবছর ভর্তুকি দিতে হতো। চলতি অর্থবছরেও ৬শ' কোটি টাকার মতো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। গত এক দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো সচল রাখতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। এই প্রশ্ন অন্যায্য হতে পারে না যে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষকে সুবিধা দিতে সাধারণ নাগরিকরা এই লোকসানের বোঝা কতদিন বহন করে চলবে? এছাড়া বেশিরভাগ পাটকল স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে স্থাপিত হওয়ায় এর যন্ত্র ও অবকাঠামোও সংস্কার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নতুন প্রযুক্তি প্রয়োজন। ফলে সবকিছু ঢেলে সাজানোই সংগত। আমরা দেখেছি, এর আগেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হলে সেখানে উৎপাদন ও মান বৃদ্ধি ঘটেছে। লোকসানের বদলে দেখেছে লাভের মুখ। দেশের বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিল এলাকায় যেসব শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে, সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে আগের তুলনায় বেশি মানুষের।
আমরা মনে করি, রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল পিপিপি বা পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ পদ্ধতিতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সময়োচিত। রুগ্‌ণ ও লোকসানি খাত ভর্তুকি দিয়ে জিইয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই। অনিয়ম বন্ধ করতে হলে এবং পাটকলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে আপাত অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। আমরা বিশ্বাস করি, দীর্ঘমেয়াদে মিলবে এর সুফল। এক্ষেত্রে আমরা দেখতে চাইব, যেসব শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হবেন, তারা যেন তাদের পাওনা অবিলম্বে এবং সময়মতো পান। আগে বিভিন্ন পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সময় শ্রমিকদের পাওনা বিলম্বিত হয়েছে। এবার তার পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। রোববার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে পাটমন্ত্রীও একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা দেখতে চাইব, পাটকল আনুষ্ঠানিক বন্ধ ঘোষণার দিনেই এই অর্থ পরিশোধ করা হবে। এছাড়া নতুন ব্যবস্থাপনায় সাবেক পাটকলের দক্ষ শ্রমিক ও কর্মচারীরা যাতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান, প্রতিপালিত হতে হবে সেই প্রতিশ্রুতিও। এক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠন, রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিরাও ইতিবাচক অবস্থান নেবেন বলে প্রত্যাশা।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো এমন সময় বন্ধ করা হচ্ছে, যখন পাটখ াত দীর্ঘদিন পর চাঙ্গা হয়ে উঠছে। আমরা দেখছি, বর্তমান সরকার টানা তিন মেয়াদে পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একসময় দেশের প্রধান অর্থকরী এই ফসলটির উৎপাদন ও বাজার উন্নয়নে আগের তুলনায় সরকারের মনোযোগ অনেক বেড়েছে। পাটের 'ন্যায্যমূল্য' দাবি করে আশি বা নব্বইয়ের দশকে দেয়াল লিখন দেখা গেলেও, এখন তা বিরল। পাট খাতে স্থবিরতা নেমে এসেছিল; পাটচাষিরা উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে পাট চাষে আগ্রহ হারিয়েছিল, বিশ্বে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার খুইয়েছিল বাংলাদেশ। আমাদের মনে আছে, শেখ হাসিনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাতেই তোষা ও দেশি পাটের জিনোম সিকোয়েন্স বা জীবন-সূত্র উন্মোচন হয়েছিল। মিলেছিল পাটের তিনটি জিনোম কোডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এখন দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে পাটের বাজার সম্প্রসারণে মনোযোগ দেওয়ার বিকল্প নেই। পাটচাষি, পাটপণ্য উৎপাদক, রপ্তানিকারকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনা ও উপযুক্ত বাজারমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেক্ষেত্রে পাটকলে অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতেই হবে। দূর করতে হবে অদক্ষতা ও উৎপাদনহীনতা। অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে বলব আমরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি দেখিয়েছিল, কেবল সরকারি কাজেই প্রতি বছর ৮০ কোটি পাটের বস্তা প্রয়োজন হয়। সরকারিভাবে যদি পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলেই পাট খাত বিপুল বিক্রমে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আমরা দেখতে চাই, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পিপিপি করার মধ্য দিয়ে তার পথেই একধাপ এগিয়ে যাওয়া হলো।

আরও পড়ুন

×