কোরবানির পশু
খামারি সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিন
প্রতীকী ছবি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২০ | ১৪:৫৭
ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের এক মাসও যেখানে বাকি নেই সেখানে কোরবানির পশুর হাটের যে দুর্দশা আমরা দেখছি সেটি উদ্বেগজনক। আমরা জানি, বাঙালি মুসলমানের প্রধান দুটি উৎসবের অন্যতম এ উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ পশু কোরবানি করা। কিন্তু এ বছর এমন সময়ে এ ঈদ উপস্থিত যখন দেশ করোনাদুর্যোগে বিপর্যস্ত। এ দুর্যোগের ফলে বিশাল জনগোষ্ঠী এখন আর্থিকভাবে সংকটের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। তারা এবার পশু কোরবানির কথা ভাবতেই পারছেন না। মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত যারা আগে একাই একটা কিংবা একাধিক গরু কোরবানি দিতেন তারাও হয়তো সেভাবে কোরবানি দিতে পারবেন না। অন্যদিকে করোনা সংক্রমণের উচ্চহারের এ সময়ে যখন কোরবানির পশুর হাট বসবে তখন ভাইরাসের ভয়েও হয়তো অনেকে হাটে যেতে সাহস পাবেন না। এ অবস্থায় শনিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে খামারিদের দুশ্চিন্তার বিষয়টি।
এক সময় ভারতীয় গরু ছাড়া বাংলাদেশে কোরবানির পশুর হাট ভাবাও যেত না। কিন্তু গত কয়েক বছর কোরবানির পশুর হাটে ভারতীয় গরুর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এর ফলে কোরবানির পশুতে আমরা ইতোমধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ধারণা করছে, এবার এক কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হবে। অথচ আমাদের মজুদ পশুর পরিমাণ এর চেয়ে পনেরো লাখ বেশি। অন্যদিকে সংশ্নিষ্টদের ধারণা, সরকার এবার কোরবানির হাটের যে চাহিদা নিরূপণ করেছে, তা থেকেও ২০ শতাংশ গবাদি পশু কম বিক্রি হবে। একদিকে ক্রেতার হাতে টাকা নেই, অন্যদিকে ট্রাকভাড়াসহ পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে খামার থেকে হাটে গরু নিয়ে আসার মতো অনেকেরই পুঁজি নেই।
আমরা জানি, সরকার কয়েক বছর থেকেই দেশীয় খামারিদের উৎসাহিত করে আসছে এবং খামারিরাও ভালো দাম পাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে করোনার কারণে এবার যে তাতে ছেদ পড়বে তা বলা বাহুল্য। সমকালে আলোচ্য প্রতিবেদনে বাজার ইজারা নিয়ে যে মন্দাবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেটি তারই পূর্বাভাস। পশুহাটের ইজারা নিয়ে বরাবরই একটি প্রতিযোগিতা ও মহড়া হয় নগর ভবনে। কিন্তু এবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কোনো নগর ভবনেই সে চিত্র পাওয়া যায়নি। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ঢাকা সিটির কোনো কোনো হাটের ইজারার দরপত্রই জমা পড়েনি। কোথাও দু-একটি দরপত্র জমা পড়েছে। তবে দর উঠেছে সরকার নির্ধারিত ইজারামূল্যের চেয়ে অনেক কম। অথচ প্রতিবারই প্রায় প্রত্যেক হাটের বিপরীতে দর ওঠে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি এবং প্রতিযোগীও থাকে বেশি। এ অবস্থায় আমরা মনে করি খামারিদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। ঈদুল আজহার আগেই যেন তাদের পশুগুলো বিক্রি করতে পারেন, প্রশাসন সে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
করোনার এ সময়ে কোরবানির পশুর কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে ভাইরাসটির সংক্রমণ বাড়ার যে শঙ্কা জনমনে রয়েছে আমরা চাই সরকার সেটি আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। কোরবানির হাটে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন, পশুর হাটের ইজারাদারদের তা নিশ্চিত করতে হবে। কোরবানির হাট এমনিতেই অপরিচ্ছন্ন থাকে, গরু রাখার জায়গাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ, এ দিকটায় নজর দেওয়া চাই। এ ক্ষেত্রে নিরাপদ হলো অনলাইনে পশু কেনাকাটা। কয়েক বছর ধরেই ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেসে পশু কেনাকাটা চলছে। এ বছর অনলাইনে কেনাকাটা যত বেশি হবে পশুর বাজারকেন্দ্রিক করোনাঝুঁকি তত কমবে বলেই আমরা মনে করি। এ ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে গ্রামের খামারিরাও যেন অনলাইনে পশু বেচাকেনা করতে পারেন সে ব্যবস্থ্থা নিতে হবে। অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে সকলের জন্য মঙ্গলজনক।
আমরা চাই, খামারিরা যাতে কোনোভাবেই ক্ষতির মুখে না পড়েন। সরকার যেহেতু খামারিদের উৎসাহিত করেছে, সরকারের উচিত হবে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য কোনো আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ আমিষে যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে সেটি যেন হিতে বিপরীত না হয়। খামারিদেরও উচিত হবে কেবল কোরবানিকেন্দ্রিক না থেকে সারা বছর সরবরাহ ও বিক্রির মনোভাব রেখে পশু পালন করা। এ ক্ষেত্রে পশুর মাংসের দাম কমিয়ে বাজার মানুষের নাগালে রাখতে পারলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই লাভবান হতে পারে। তবে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সামর্থ্যবানরা যেন আগের তুলনায় এবার বেশি করে কোরবানি দেন, তাতে খামারিরা যেমন উপকৃত হবেন তেমনি যারা পশু কোরবানি দিতে পারবেন না তাদেরও মাংস দেওয়ার ব্যবস্থা হবে।
- বিষয় :
- কোরবানির পশু
- খামার