এক গুণীর নীরব বিদায়
×
জাহিদ রহমান
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
গত মাসের ৯ তারিখ আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. এমএ জলিল। অর্থশাস্ত্রে পিএইচডি করা এই আলোকিতজন মৃত্যু অবধি ছিলেন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের এক নীরব নিবেদিত প্রাণ। যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই মানুষকে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নির্মাণের তাগাদা দিয়েছেন। তিনি বলতেন, সার্থক জীবন গড়তে অর্থবিত্তের চেয়েও অনেক বেশি প্রয়োজন জ্ঞান, সততা, সৃষ্টিশীল চিন্তা ও কর্মকুশলতা। এসবের বাইরে মানুষের বাহ্যিক বিত্তবৈভব অনাকর্ষণীয়। পরিবার, সমাজে, রাষ্ট্রে শিক্ষা এবং জ্ঞানের যথার্থ প্রয়োগই হলো মূল সাফল্য। যতদিন বেঁচে ছিলেন, নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে তিনি এই কথাগুলো বিলিয়েছেন। মানবজীবন যাতে জ্ঞান ও কর্মে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ হয়, নিরন্তর সে কথাই বলেছেন।
সেই ষাটের দশকে তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর থানার নিভৃত পল্লি বরিশাট থেকে তিনি কেবল মেধার জোরেই নগরে উঠে এসেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। মাগুরা কলেজ, যশোর এমএম কলেজ এরপর দীর্ঘসময় রংপুর কারমাইকেল কলেজ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। রংপুর রেডিওতে অনুষ্ঠান করতেন কর্মজীবনের শুরুতেই। পরে লোকপ্রশাসন কেন্দ্র (পিএটিসি), জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। সরকারি চাকরি জীবন শেষ হওয়ার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রাইম ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় অনুষদের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতেন। নিজ গ্রাম বরিশাটে 'বরিশাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়' গড়ে তুলতে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। টানা পনেরো বছর তিনি এই স্কুলের সভাপতি ছিলেন। এসবের বাইরে আরও অনেক কিছুর সঙ্গেই তিনি জড়িত ছিলেন। কিন্তু বরাবরই তিনি নেপথ্যে থেকে সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। কখনোই প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। হয়তো এই দীক্ষা তিনি পেয়েছিলেন তারই অগ্রজ-আত্মীয় একই গ্রাম বরিশাটের ড. শফিউদ্দিন জোয়ার্দ্দারের কাছ থেকে। ষাট দশকে শফিউদ্দিন জোয়ার্দ্দার হার্ভার্ডে পড়তে গিয়ে এলাকায় হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সত্তরের দশকের মধ্যভাগে ভারতের হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থশাস্ত্রে শুধু পিএইচডি ডিগ্রিই অর্জন নয়, গোল্ডমেডালিস্ট খেতাবও নিয়ে আসেন। সেই সময়ে মাগুরার অজপাড়ার আনাচে-কানাচে মেধাবীজন হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
ড. এমএ জলিল ভীষণরকম শুধু কর্মপ্রিয়ই নন, অনেকটা গণমুখীও ছিলেন। মানুষের সঙ্গে নীরবে মিশতে, কথা বলতে ও চলতে ভালোবাসতেন। নিজের ব্যক্তিগত অনেক কাজ তুচ্ছ করে তিনি সমষ্টির জন্যই আত্মত্যাগ করতে ভালোবাসতেন। বহুমাত্রিক কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এ কারণেই যশোর বা মাগুরাবাসীর দুর্দিনে সবসময় পাশে থেকে সুপরামর্শ দিয়েছেন।
মননে-চিন্তায় আধুনিক এই অনন্য আলোকিত মানুষ সবসময়ই পরিবার থেকে শুরু করে পরিচিত বলয়ে সৃষ্টি আর স্নিগ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এ কারণেই বোধ হয় তারই ছোট কন্যা তাহসীনা শাহীনের ফ্যাশন হাউস 'সাদাকালো' আজ পৃথিবীময় বিখ্যাত হয়েছে। 'তার চার কন্যাই আজ উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। ড. এমএ জলিল শায়িত হয়েছেন কুমার নদের তীরে বরিশাটের নিজ গ্রামে পিতা-মাতার কোলেই। যে গ্রাম থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন নগরে, সেই নগর ছেড়ে তিনি আবার ফিরে গেছেন নিজ গ্রামে তাল-তমালের ছায়ে। প্রিয় কুমার নদকেও তিনি খুব ভালোবাসতেন। বাড়িতে গেলে কুমার নদের পাড়েই বসতেন গ্রামবাসীকে নিয়ে। করোনা দুর্যোগের কাল না থাকলে অসংখ্যজন যে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসতেন তার কফিনে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই আফসোসটুকু সবার থেকেই গেল।
শেষ বয়সে এসেও মানুষ কতটা কর্মমুখর, প্রাণবন্ত থাকতে পারেন, তার অনন্য উদাহরণ তিনি। নিয়মিত ধর্মাচার, জীবনবোধের দর্শনে একটা মানুষ কতটা উজ্জ্বলতর থাকতে পারেন, তার উদাহরণ তিনি। আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তার জীবনের গল্পগুলো আমরা যত তুলে ধরতে পারব, ততই এ প্রজন্ম জ্ঞানে-গরিমায়, আদর্শে ঋদ্ধ হবে। লোক দেখানো বিত্তবৈভবের এই যুগে নিভৃতচারী, অনাড়ম্বর এই আলোকিতজন সততা এবং জ্ঞানশক্তির যে অনন্যতা রেখে গেলেন, তার সীমাহীন মূল্য আছে। এরকম মানুষের ছায়াই নষ্টভ্রষ্ট সমাজকে দেখাবে আলোর পথ। আমরাও আমাদের সন্তানদের কাছে গর্ব আর ভালোবাসা নিয়ে বলতে পারব আমাদের এক গুণীজন ছিলেন- 'অধ্যাপক ড. এমএ জলিল'।
সেই ষাটের দশকে তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর থানার নিভৃত পল্লি বরিশাট থেকে তিনি কেবল মেধার জোরেই নগরে উঠে এসেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। মাগুরা কলেজ, যশোর এমএম কলেজ এরপর দীর্ঘসময় রংপুর কারমাইকেল কলেজ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। রংপুর রেডিওতে অনুষ্ঠান করতেন কর্মজীবনের শুরুতেই। পরে লোকপ্রশাসন কেন্দ্র (পিএটিসি), জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। সরকারি চাকরি জীবন শেষ হওয়ার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রাইম ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় অনুষদের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতেন। নিজ গ্রাম বরিশাটে 'বরিশাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়' গড়ে তুলতে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। টানা পনেরো বছর তিনি এই স্কুলের সভাপতি ছিলেন। এসবের বাইরে আরও অনেক কিছুর সঙ্গেই তিনি জড়িত ছিলেন। কিন্তু বরাবরই তিনি নেপথ্যে থেকে সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। কখনোই প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। হয়তো এই দীক্ষা তিনি পেয়েছিলেন তারই অগ্রজ-আত্মীয় একই গ্রাম বরিশাটের ড. শফিউদ্দিন জোয়ার্দ্দারের কাছ থেকে। ষাট দশকে শফিউদ্দিন জোয়ার্দ্দার হার্ভার্ডে পড়তে গিয়ে এলাকায় হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সত্তরের দশকের মধ্যভাগে ভারতের হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থশাস্ত্রে শুধু পিএইচডি ডিগ্রিই অর্জন নয়, গোল্ডমেডালিস্ট খেতাবও নিয়ে আসেন। সেই সময়ে মাগুরার অজপাড়ার আনাচে-কানাচে মেধাবীজন হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
ড. এমএ জলিল ভীষণরকম শুধু কর্মপ্রিয়ই নন, অনেকটা গণমুখীও ছিলেন। মানুষের সঙ্গে নীরবে মিশতে, কথা বলতে ও চলতে ভালোবাসতেন। নিজের ব্যক্তিগত অনেক কাজ তুচ্ছ করে তিনি সমষ্টির জন্যই আত্মত্যাগ করতে ভালোবাসতেন। বহুমাত্রিক কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এ কারণেই যশোর বা মাগুরাবাসীর দুর্দিনে সবসময় পাশে থেকে সুপরামর্শ দিয়েছেন।
মননে-চিন্তায় আধুনিক এই অনন্য আলোকিত মানুষ সবসময়ই পরিবার থেকে শুরু করে পরিচিত বলয়ে সৃষ্টি আর স্নিগ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এ কারণেই বোধ হয় তারই ছোট কন্যা তাহসীনা শাহীনের ফ্যাশন হাউস 'সাদাকালো' আজ পৃথিবীময় বিখ্যাত হয়েছে। 'তার চার কন্যাই আজ উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। ড. এমএ জলিল শায়িত হয়েছেন কুমার নদের তীরে বরিশাটের নিজ গ্রামে পিতা-মাতার কোলেই। যে গ্রাম থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন নগরে, সেই নগর ছেড়ে তিনি আবার ফিরে গেছেন নিজ গ্রামে তাল-তমালের ছায়ে। প্রিয় কুমার নদকেও তিনি খুব ভালোবাসতেন। বাড়িতে গেলে কুমার নদের পাড়েই বসতেন গ্রামবাসীকে নিয়ে। করোনা দুর্যোগের কাল না থাকলে অসংখ্যজন যে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসতেন তার কফিনে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই আফসোসটুকু সবার থেকেই গেল।
শেষ বয়সে এসেও মানুষ কতটা কর্মমুখর, প্রাণবন্ত থাকতে পারেন, তার অনন্য উদাহরণ তিনি। নিয়মিত ধর্মাচার, জীবনবোধের দর্শনে একটা মানুষ কতটা উজ্জ্বলতর থাকতে পারেন, তার উদাহরণ তিনি। আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তার জীবনের গল্পগুলো আমরা যত তুলে ধরতে পারব, ততই এ প্রজন্ম জ্ঞানে-গরিমায়, আদর্শে ঋদ্ধ হবে। লোক দেখানো বিত্তবৈভবের এই যুগে নিভৃতচারী, অনাড়ম্বর এই আলোকিতজন সততা এবং জ্ঞানশক্তির যে অনন্যতা রেখে গেলেন, তার সীমাহীন মূল্য আছে। এরকম মানুষের ছায়াই নষ্টভ্রষ্ট সমাজকে দেখাবে আলোর পথ। আমরাও আমাদের সন্তানদের কাছে গর্ব আর ভালোবাসা নিয়ে বলতে পারব আমাদের এক গুণীজন ছিলেন- 'অধ্যাপক ড. এমএ জলিল'।
- বিষয় :
- নীরব বিদায়