ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

নিবন্ধন আইনের একটি খসড়া ও অনেক প্রশ্ন

নিবন্ধন আইনের একটি খসড়া ও অনেক প্রশ্ন
×

ফারজানা মাহমুদ

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

গত ১৬ জুন জাতীয় নির্বাচন কমিশন 'রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন ২০২০'-এর খসড়া তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। এটি মূলত ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) আলোকে নতুন একটি আইন যেখানে ১৬টি ধারার ওপর দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। খসড়া আইনটিতে মোটা দাগে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে; রাজনৈতিক দলের সর্বস্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিতের সময়সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে; এবং প্রচলিত কিছু রাজনৈতিক পদের নতুন সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে।
যেমন খসড়া আইনের ২ (১) ধারায় বর্তমান প্রচলিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আইন ১৯৯৮ (১৯৯৮ সনের ২৪নং আইন) এর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে যথাক্রমে উপজেলা পরিষদ প্রধান ও উপপ্রধান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। খসড়া আইনের ২(৩) ধারায় স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ২০০৯ (২০০৯ এর ৫৮ নং আইন) এর পৌর ও পৌরসভাকে যথাক্রমে 'নগর ও নগর সভা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একইভাবে ২০২০ সালের খসড়া আইনের ২ (৮) ধারায় স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ (২০০৯ এর ৬১ নং আইন) এর অধীনে সংজ্ঞায়িত চেয়ারম্যানকে 'পল্লী পরিষদ প্রধান' হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে। একইভাবে ২ (১০) ধারায় 'পুরাধ্যক্ষ' অর্থে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ (২০০৯ এর ৬০ নং আইন) এর মেয়রকে বোঝানো হয়েছে। খসড়া আইনের ২(১৬) ধারায় 'মহানগর আধিকারিক' অর্থে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ৬০ নং আইন) এর মেয়রকে বোঝানো হয়েছে। উপরন্তু ২ (১৭) ধারায় 'মহানগর ও মহানগর সভা' অর্থে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ এর 'সিটি করপোরেশন'কে বোঝানো হয়েছে।
বর্তমানে বহুল প্রচলিত এসব সংজ্ঞা বা বিশেষণগুলো পরিবর্তন করতে হলে এ সংক্রান্ত আইনগুলোতে সংশোধনী আনতে হবে এবং সব পর্যায়ে তা কার্যকরের ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। এই ধরনের পরিবর্তনের কারণ আপাতদৃষ্টিতে বোধগম্য নয়, এবং সাধারণ জনগণের কাছে এটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।
প্রস্তাবিত নিবন্ধন আইন ২০২০ এর ৪(১)(ক) ধারায় বলা হয়েছে 'রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য (অ) দলটিকে আবেদন জমা দেওয়ার তারিখ হতে পূর্ববর্তী দুটি সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসনে জয়লাভ করতে হবে (আ) নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত আসনে প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে (ই) দলটির দেশের এক-তৃতীয়াংশ জেলা ও ১০০ উপজেলায় কমিটিসহ দলীয় কার্যালয় থাকতে হবে। উপরোক্ত তিনটি শর্তের যে কোনো দুটি পূরণ করতে পারলে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পাওয়া যাবে।'
প্রশ্ন থেকে যায় নতুন কোনো দল যদি নিবন্ধন চায় তবে ৪(১)(ক) ধারায় বর্ণিত প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করা আদৌ সম্ভব কিনা। আমাদের মহান সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সকলের রাজনৈতিক দল করার সুযোগ প্রদান করা হয়েছে কিন্তু নিবন্ধন আইনের ৪(১) (ক)ধারাটি স্পষ্টতই এই সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো নিবন্ধন আইন ২০২০ এর ৪(১)(খ)(আ) ধারার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের সকল কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিতের সময়সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে বিদ্যমান আরপিওতে বলা হয়েছে ২০২০ সালের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের বিষয়টিকে নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সংবিধানের ২৮(২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্র ও গণজীবনের নারী-পুরষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং ১৯ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে জাতীয় জীবনের সকল স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা হবে। সংবিধানের এই প্রত্যয় নিবন্ধন আইনের খসড়াটিতে প্রতিফলিত হয়নি, বরং তা অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছে। সংবিধান যেখানে সুবিধাবঞ্চিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নের ব্যবস্থা রেখেছে, সেখানে নির্বাচন কমিশন কেন যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথকে আরও কঠিন করে দিচ্ছে তা বোধগম্য নয়।
খসড়া আইনের ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে 'কোনো দলের গঠনতন্ত্রের উদ্দেশ্যসমূহ যদি সংবিধানের পরিপন্থি হয়; লিঙ্গ বা ধর্মভেদে বৈষম্য সৃষ্টি করে; ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে; বা একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিফলিত করে বলে প্রতীয়মান হয়, তবে সেই দল নিবন্ধনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।'
বাস্তবতার নিরিখে বলা যায় কোনো দলের গঠনতন্ত্রে বর্ণিত গণতান্ত্রিক ভাবধারা, লিঙ্গ বা ধর্মভেদে বৈষম্যহীন উদ্দেশ্যসমূহের বাস্তবায়ন যদি সেই দলের কমিটি বা দল দ্বারা সম্পাদিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা দলীয় নেতাগণের মতাদর্শে প্রতিফলিত না হয়, তবে পরবর্তী সময়ে দলের নিবন্ধন বাতিল হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। শুধু গঠনতন্ত্র নয় কার্যত গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ দলগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে কিনা এতদ্‌সংক্রান্ত কোনো প্রমাণাদি বার্ষিক প্রতিবেদন আকারে নির্বাচন কমিশনকে প্রদান করতে হবে কিনা তাও উল্লেখিত হয়নি এই খসড়া আইনটিতে।
প্রস্তাবিত রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন, ২০২০ এর ৯(১) ধারাতে বলা হয়েছে 'কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বিধিবদ্ধভাবে কোনো ব্যক্তি থেকে বাৎসরিক সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা বা সমপরিমাণ সম্পদ এবং প্রতিষ্ঠান থেকে বাৎসরিক ৫০ লক্ষ টাকা বা সমপরিমাণ সম্পদ অনুদান হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে।'
বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে এবং বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে খসড়া আইনে নির্ধারিত এই অনুদান যৎসামান্য। দলগুলোর অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে অনুদানের এই সীমা বৃদ্ধি করা উচিত।
মোটাদাগে প্রস্তাবিত রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন আইনের যে খসড়া নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত করেছে, তাতে অসংখ্য প্রশ্ন থেকেই যায়। এই আইনটির আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা, থাকলে কী কী পরিবর্তন বা সংযোজন প্রয়োজন, তা সব রাজনৈতিক দল সংশ্নিষ্ট সকলের মতামত ও সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে, অন্যথায় গণতন্ত্রের চর্চা, অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কৃষ্টি ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন

×