মহামারিকালে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রত্যাশা
ড. মো. মাসুদ পারভেজ রানা
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন। গৌরবের ৬৭ বছর পূর্ণ করল বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিগত বছরগুলোতে জাঁকজমকপূর্ণ জন্মদিন পালিত হলেও এবার সেটি হচ্ছে না। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সবক'টি দেশ কভিড-১৯ মহামারিতে জর্জরিত। অজানা আতঙ্ক এবং অনভিপ্রেত মৃত্যুর সংবাদের মধ্য দিয়ে জনজীবন চলছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ জনসংখ্যাবহুল শহরগুলোতে করোনা আক্রান্তের হার অধিক। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং আক্রান্ত বিবেচনায় দেশের অনেক জায়গা লকডাউনের আওতায় রয়েছে। ফলে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন বন্ধ। গত ১৮ মার্চ, ২০২০ তারিখ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে বর্তমানে যার যার বাড়িতে অবস্থান করছে। স্বল্প পরিসরে দাপ্তরিক কাজ-কর্ম চললেও শিক্ষা ও গবেষণার সব কার্যক্রম মূলত অচল রয়েছে। এমন দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে উৎসবমুখর জন্মদিন পালন করাটা বেমানান। যা হোক, এবারের জন্মদিনে প্রতিবারের মতো উচ্ছলতা-আবেগ-উচ্ছ্বাস না থাকলেও, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই বদ্ধপরিকর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার নিশ্চিতভাবেই এই সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সমর্থ হবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনা। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুর্যোগকালীন পরিস্থিতির মধ্যে ইন্টারনেটের সহায়তায় অনলাইনভিত্তিক লেখাপড়া চালু রাখতে সফল হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা চালু রাখতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনভিত্তিক লেখাপড়া করানোর মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারেনি। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা ডিজিটাল আইডি কার্ড নিতে বাধ্য হলেও, ডিজিটালি ব্যবহারের কোনো মাধ্যম এখন পর্যন্ত পায়নি। ক্যাম্পাসের আনাচেকানাচে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিলেও, শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ই-মেইল যোগাযোগ এবং অনলাইনভিত্তিক লেখাপড়ার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ব্যাপক হারে ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহূত হলেও অনলাইনভিত্তিক কোর্স রেজিস্ট্রেশন, কোর্স উপকরণ দেওয়া-নেওয়া, ফল তৈরি এবং ছাত্র-শিক্ষক পরামর্শ করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট সেবা অনেকাংশে শুধু কিছু সংখ্যক শিক্ষকের গবেষণা, বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রথম বর্ষ ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা এবং ছাত্রছাত্রীদের ফেসবুক ও ইউটিউবে গান বা সিনেমা দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য যে, যতটুকু এবং যত ধীর গতিতেই হোক না কেন; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সুনামের সঙ্গে উন্নয়নের পথে ধাবিত হচ্ছে। ওয়েবোমেট্রিক্স র্যাংকিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ-এর তথ্যানুযায়ী ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা একশ' বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও এই তালিকায় রয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রায় সবক'টি বিভাগ নতুন কারিকুলাম প্রস্তুতের মধ্য দিয়ে তাদের পাঠদানকৃত কোর্স, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানের করে তুলেছে। বেশ কয়েকটি অনুষদ সেমিস্টারভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেছে। উল্লেখ্য যে, প্রায় সবক'টি অনুষদই ২০২০ সাল থেকে সেমিস্টারভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি হওয়ার প্রবণতাই বলে দেয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করার জন্য সম্পূর্ণভাবেই প্রস্তুত আছে। মানসম্মত গবেষণা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয়েছে কুম্ভীলকবৃত্তি নিরীক্ষা। এ ছাড়া শিক্ষকসহ ছাত্রছাত্রীদের গবেষণায় অধিকতর আগ্রহী করে তোলার প্রয়াসে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে এবং বিভিন্ন বিভাগ ও অনুষদ আলাদাভাবে শুরু করেছে বিশেষ কর্মশালা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি পূর্বের তুলনায় আরও আধুনিক হয়েছে। বিশ্বের নামকরা ৪০ হাজার জার্নাল, তিন লাখ ৫০ হাজার বই এবং অসংখ্য রিপোর্টের হার্ডকপি অথবা সফটকপি এখানে পাওয়া যায়। এ ছাড়া লাইব্রেরি প্রশাসন নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করে থাকে। 
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, উপরোক্ত অর্জনগুলো আজ অনেকটাই মূল্যহীন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা চালু হলেও, শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীরা কেউ সেগুলো সন্তোষজনকভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। লেখাপড়ার রীতি এবং গবেষণা অনেক ক্ষেত্রেই সেই পুরোনো ধারায় রয়ে গেছে। এজন্য দরকার এক আমূল পরিবর্তন। গড়ে ওঠা ডিজিটাল অবকাঠামোকে ফলপ্রসূ ব্যবহারের মাধ্যমে এক নতুন ধারায় শুরু করতে হবে শিক্ষক-ছাত্রছাত্রী সবাইকে। পূর্ব থেকেই যদি এই ধরনের প্রস্তুতি বিশ্ববিদ্যালয়টির থাকত তাহলে অতি সহজেই এই দুর্যোগকালীন সময়ে অনলাইনভিত্তিক লেখাপড়া শুরু করা যেত।
অনলাইনভিত্তিক লেখাপড়া এখনও যে শুরু করা যাবে না, তা কিন্তু নয়। মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই স্বল্প পরিসরে হলেও এটি করা সম্ভব। এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন হবে ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সেবার আওতায় নিয়ে আসা। এ ছাড়া শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় ট্রেনিং প্রদান করতে হবে। অনেকে হয়তো যুক্তি দেখাবেন, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা পরিবার নিয়ে দু'মুঠো খাবার পাচ্ছে না, সেখানে অনলাইনে লেখাপড়া করবে কীভাবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের অনেক ছাত্রছাত্রী উপার্জনহীন পরিবারের সঙ্গে করুণ অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। আমার বিশ্বাস, এমন পরিবারের সংখ্যা অনেক কম। সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই এমন ছাত্রছাত্রীদের চিহ্নিত করতে পারবে। অর্থাৎ ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই অনলাইনভিত্তিক লেখাপড়া সম্ভব। এ বিষয়ে ইউজিসির বিভিন্ন উদ্যোগের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নের ধীরগতি প্রতীয়মান। তাই একান্ত প্রত্যাশা, কিছু সংখ্যক ছাত্রছাত্রী পিছিয়ে থাকলেও সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় অচিরেই অনলাইনভিত্তিক লেখাপড়া শুরু করা উচিত। অনলাইনে ব্যবহারিক ক্লাস এবং পরীক্ষা নেওয়া না গেলেও অন্তত তাত্ত্বিক ক্লাসগুলো চালু করা যেতে পারে। সংশ্নিষ্ট কোর্স শিক্ষকগণ অনলাইনে ক্লাসগুলো নেবেন এবং সেগুলোর ভিডিও ধারণ করবেন। ছাত্রছাত্রীরা সরাসরি যোগদান করতে না পারলেও পরে অনলাইনে থাকা ক্লাসগুলো দেখে নিতে পারবে।
এই মহামারির শেষ কোথায় তা সবার অজানা। বিগত চার মাসে লেখাপড়া ও গবেষণার মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে। এই ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে, অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকলেও আমাদের বসে থাকার আর সময় নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিনে তাই প্রত্যাশা, অচিরেই শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া ও গবেষণায় মনোনিবেশ করবে। পরিশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকলের সুস্থতা কামনা করছি।
প্রফেসর, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়