বন্যাদুর্গতদের দ্রুত সহায়তা দরকার
ড. মাহবুবা নাসরীন
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা শুরু হয়েছে। বন্যা আমাদের অতি পরিচিত দুর্যোগ হলেও কভিড-১৯ মহামারির কারণে এ বছর বন্যাদুর্গতদের দুর্ভোগ অনেক বেড়েছে। উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও মধ্যাঞ্চলে অবনতি হচ্ছে। বন্যাদুর্গতদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে অবস্থান করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় বন্যার জন্য সব জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি হয়নি। সরকার আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে। গত ৩০ জুন আবহাওয়া অধিদপ্তর বড় ধরনের বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলাসহ যে ১৪টি এলাকায় বন্যা হওয়ার কথা জানিয়েছিল সে এলাকাগুলো ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। জামালপুরেই এক লাখের বেশি মানুষ বন্যার কবলে পড়েছে। সাইক্লোনের সময় নিরাপদ দূরত্বের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি বন্ধ স্কুলগুলো যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বন্যাদুর্গতদের জন্যও একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তাদের আশ্রয় কিছুটা নিরাপদ হবে।
বাংলাদেশে প্রতিবছরই বন্যা হয়ে থাকে। মানুষ বন্যার সঙ্গে বসবাস করে অভ্যস্ত। তারা বন্যার আগাম ইঙ্গিত পান, এমনকি পানি কখন বিপদসীমা অতিক্রম করবে তাও অনেক সময় বুঝতে পারেন। পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে অনেকেই নিরাপদ স্থানে চলে যান। আবার সরকারি, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগেও অনেককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ?ঘূর্ণিঝড়ের সময় যেভাবে মানুষকে নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল এবার বন্যার সময় তা সম্ভব হয়নি। দেখা গেছে গাইবান্ধার সাঘাটা, ফুলছড়ি উপজেলায় বন্যার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ স্ব-উদ্যোগে বাঁধে বা বড় রাস্তায় আশ্রয় নিতে শুরু করেছিল। ফলে সেখানে স্বাস্থ্যবিধি সেভাবে মানা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সমন্বয়ে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা যে কমিটিগুলো রয়েছে কভিড-১৯ এর সংক্রমণের কারণে তারা সবাই এগিয়ে আসতে পারেননি। এখন দেখার বিষয় বন্যাদুর্গতদের স্বাস্থ্যসেবা কতটুকু নিশ্চিত করা হচ্ছে। কারণ বন্যাদুর্গত এলাকায় ডায়রিয়া, জ্বর, চর্মরোগসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। এখন স্বাস্থ্যসেবার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আমরা জানি, বন্যার সময় মানুষ দুই ধরনের আশ্রয়ে থাকে। একটি হলো ফ্লাড রিফিউজ বা তারা স্ব-উদ্যোগে যেসব স্থানে আশ্রয় নেয়। অপরটি হলো ফ্লাড শেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নেওয়া। এই দুই স্থানেই থাকা মানুষের সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সহায়তা প্রদান করা দরকার।
কভিড-১৯-এর কারণে অনেকেই কর্মস্থল হারিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই আবার শস্য উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে। বন্যার কারণে তাদের ফসলের ক্ষতি হয়েছে, অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। অনেকেই ফসল ঘরে তুললেও বিক্রি করতে পারেননি। তাদের স্বাস্থ্যগত সেবা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার উপায় অবলম্বন করতে হবে। তারা যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন সে সুযোগ করে দিতে হবে। এখন বন্যাদুর্গতদের সহায়তা দরকার। বিগত সময়ের ন্যায় বেসরকারি সংস্থাগুলো এ বছর কাজ করতে পারছে না। সুতরাং সরকারি উদ্যোগে সহায়তা করতে হবে। অন্যান্যবারের চেয়ে এবার সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে। বন্যাপরবর্তী মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের দেশে বন্যা ও বন্যার পরে সহিংসতা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তাদের জন্য কী করতে হবে সে বিষয়ে আমাদের নীতিমালা আছে। সেগুলো দালিলিক দিক থেকে অনেক শক্তিশালী। এখন বাস্তবায়ন দরকার। আমাদের তরুণ সমাজ, সচেতন মহল, গণমাধ্যমসহ সকলকে স্বাস্থ্যবিধি নেমে সহযোগিতায় নামতে হবে। মনে রাখতে হবে, পানিবাহিত অনেক রোগে কভিড-১৯-এর লক্ষণ থাকতে পারে, সেটা যেন নতুন করে ভীতির সঞ্চার না করে। আমরা আশা করি গণমাধ্যম এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
নদীর পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন শুরু হবে। অনেকেই মনে করেন নদী ভাঙন প্রকৃতিগত। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায় নদী ভাঙন শুধু প্রকৃতিগত না। আমরা যত বেশি নদী দখল করছি, নদী ভরাট করছি এবং নদীর তীরে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ করছি তত বেশি নদী ভাঙন ত্বরান্বিত করছি। আবার অনেকের ধারণা, কাঠামোগত স্থাপনা বা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদী ভাঙন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, কাঠামোগত পরিকল্পনা বা বড় বড় বাঁধ নির্মাণ করে সব স্থানে ভাঙনরোধ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ। এখানে নদী তার আপন গতিতে চলে। এটাই ব-দ্বীপের ধরন। আমরা যদি নেদারল্যান্ডসের ব-দ্বীপের সঙ্গে বাংলাদেশের ব-দ্বীপের তুলনা করি তাহলে ভুল হবে। আমাদের নদীশাসন শুধু বড় বড় বাঁধ দিয়ে হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে নদীশাসন সম্ভব। বিগত সময় বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোতে নির্মাণগত ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে। স্লুইচ গেট না থাকা, একপাশে পানি প্রবেশ করলে অন্য পাশ দিয়ে বের হতে না পারা- এই বিষয়গুলো গবেষণার মাধ্যমে নিরূপণ করার প্রচেষ্টা চলছে। কোথাও কোথাও স্থায়ী আর কোথাও কোথাও অস্থায়ী বাঁধ দরকার। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ করলেই হয় না, এর রক্ষণাবেক্ষণও ভালোভাবে হওয়া দরকার। এই জায়গায় আমাদের দৃষ্টি কম থাকে। বন্যার পূর্বাভাস পাওয়ার আগেই সমন্বয় দরকার। সংশ্নিষ্ট সকল পক্ষ ভালোভাবে সমন্বয় করতে পারলে বাঁধ নিয়ে যে ভোগান্তির কথা বলা হয় তা থাকে না। সরকার ডেল্টা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশে যদি পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সময়মতো ডেল্টা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় এবং এর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ঠিকমতো হয় তাহলে মানুষের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হবে।
উপকূলীয় অঞ্চলে ও বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ ভোগান্তি লাঘবে বাঁধ নির্মাণের কথা বলে থাকে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কাঠামোগত পরিকল্পনার চেয়ে অকাঠামোগত দিকটিতেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করি। সেই ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। যদি কাঠামোগত চিন্তা করা হয় তাহলে যেন টেকসই হয়। মাটি আঁকড়ে থাকতে পারে এমন বৃক্ষ যেন বাঁধে লাগানো হয়। স্থানীয়রাই ভালো জানেন কোন গাছগুলো মাটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও লোকায়ত জ্ঞানকে এক করা হলে বেশি ফলপ্রসূ হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের বাঁধগুলো অনেক সময় বর্ষার পানি আসতে দেয় না। এতে কৃষকের ক্ষতি হয়। এজন্য কিছু বাঁধ অস্থায়ীভাবে নির্মাণ করতে হয়, যাতে বর্ষায় বৃষ্টির পানি আসতে পারে। পূর্বে বন্যার অগ্রিম খবর পাওয়া যেত না। এখন আমরা ১০ দিন আগেই বন্যার তথ্য পেয়ে থাকি। আমাদের বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় চ্যাম্পিয়ন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। আশা করি পরিকল্পনামাফিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা হলে বন্যা মোকাবিলা সহজ হবে।
অধ্যাপক; পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- দুর্যোগ