অন্যদৃষ্টি
সুষম খাদ্য ও সবজি
আফতাব চৌধুরী
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১৫:১৯
যদিও বলা হচ্ছে খাদ্যে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ; কিন্তু সুষম খাদ্যে এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। সুস্থ-সবল জাতি গড়তে হলে দেশবাসীকে সুষম খাদ্য দেওয়া জরুরি। সুষম খাদ্য তালিকায় সবজির যে এক বিশেষ ভূমিকা আছে তা বিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন। আমাদের খাদ্য তালিকায় দৈনিক ২০১ গ্রাম সবজি থাকা উচিত, অথচ আমরা পাচ্ছি মাত্র ৫০ গ্রাম, যেখানে জাপানে মাথাপিছু ২৮৭ গ্রাম, কোরিয়ায় মাথাপিছু ৫৮৯ গ্রাম এবং চীনে মাথাপিছু ৩০৬ গ্রাম সবজি গ্রহণ করছে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক।
বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উদ্বেগজনক। আমরা দেখতে পাচ্ছি যেখানে জাপানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ০.০৪ শতাংশ, কোরিয়ায় ১.০১ শতাংশ, চীনে ১.০৬ শতাংশ, ভারতে ১.০৯, সেখানে বাংলাদেশে ২.১৯ শতাংশ। এর ফলে চাষের জমি ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও শিল্প স্থাপনের জন্য ব্যবহূত হচ্ছে। একই জমিতে একাধিকবার এবং অধিক ফসল ফলানোর জন্য জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, সেই সঙ্গে অবৈজ্ঞানিকভাবে বিভিন্ন কৃষি উপকরণের ব্যবহারের ফলে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে, জমির নিজস্ব উৎপাদন শক্তি হ্রাস পেয়ে চলেছে এবং মাটির প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হচ্ছে।
জমিতে খুবই কম জৈব পদার্থের উপস্থিতি, মাটির অনুখাদ্যের ভাণ্ডারও কমতির দিকে। অনেক জমিতে অনুখাদ্যের অভাব ও মাটির পানি ধারনের ক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান এককভাবে না করে সমষ্টিগতভাবে করা উচিত। জাপান, কোরিয়া এবং চীনের খাদ্য তালিকায় সবজি ব্যবহার আমাদের চেয়ে বেশি এবং সবজি ফসলের উৎপাদনশীলতাও অনেক বেশি। আমাদের দেশের সবজি উৎপাদনশীলতা যেখানে ৫০০ টনের মতো প্রতি হেক্টরে, সেখানে জাপানে ৩১.৭৯ টন, কোরিয়ায় ১৭.২০ টন এবং চীনে ৩৫.০৩ টন প্রতি হেক্টরে। বিশ্নেষণ করলে দেখা যায় এ উৎপাদনশীলতা বাড়ার কারণ হাইব্রিড বীজ ব্যবহার এবং উন্নত চাষ পদ্ধতি প্রয়োগ।
জাপান, কোরিয়া, চীন ইত্যাদি দেশে দেখা যায় বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো ইত্যাদি প্রায় একশ' শতাংশই উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের সবজির আওতায়। বিজ্ঞানীরা বিশ্নেষণ করে এও দেখেছেন যে, উন্নত জাতের বীজের জন্যই ২০ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এ হাইব্রিড বীজে রোগপোকা প্রতিরোধের ক্ষমতা বিদ্যমান, প্রয়োজনীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও এ উন্নতমানের বীজে বিদ্যমান। তাই সব্জির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আমাদের উন্নত জাতের হাইব্রিড সবজি এবং উন্নত প্রথায় চাষবাস করতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হতে হবে- একক জমিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াবার জন্য উন্নত মানের বীজ এবং জমির স্বাস্থ্য বজায় রেখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করা। তা হলে আমাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
আমাদের চাষিরা এখনও জানেন না কোন সবজি মাটি থেকে কী পরিমাণ কী সঞ্চিত খাদ্য অপসারণ করে এবং বিভিন্ন জাতের সবজিতে ভালো উৎপাদন পেতে কত এবং কী কী সার মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। যেমন- এক সমীক্ষায় দেখা গেছে জাপান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশ ৯০৮০ কেজি বাঁধাকপি উৎপাদনের জন্য এক একর জমি থেকে প্রায় ২৮ কেজি ক্যালসিয়াম এবং ৬৮১০ কেজি ফুলকপি উৎপাদনের জন্য প্রায় ১৯ কেজি নাইট্রোজেন, সাত কেজি ফসফেট, ২২ কেজি পটাশ ও তিন কেজি ক্যালসিয়াম মাটির সঞ্চিত ভাণ্ডার থেকে অপসারণ করে।
কিছু চাষি সবজি চাষে বেশ ভালো ফলন ফলাচ্ছেন। কিন্তু জমির স্ব্বাস্থ্য বজায় রেখে কি সেই ফলন ফলাচ্ছেন? এ বিষয়ে এখন কৃষি বিভাগকে অগ্রণী হতে হবে।
আরও একটি বিষয়ে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছি। তা হলো- কোন সবজির কী পুষ্টিগুণ- এও আমাদের সাধারণকে বোঝাতে হবে এবং সেভাবে সবজি চাষের এলাকা নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের শুধু সবজির চাষ করলে চলবে না, সেইসঙ্গে পরিকল্পনামাফিক কোন সবজি কোন এলাকায় হবে তাও ঠিক করে এগোতে হবে। কারণ এ পরিকল্পনার অভাবে আমাদের চাষিরা অনেক সময় উপযুক্ত মূল্যে তাদের উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রি করতে পারেন না। আমরা প্রায়ই দেখি ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ইত্যাদি একই সময়ে সব চাষি বিক্রি করার জন্য বাজারে নিয়ে উপস্থিত হয়ে হিমাগার না থাকার জন্য কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। চাষিরা যদি উপযুক্ত জলদি ও নাবি জাতের এসব সবজি চাষ করেন, তাহলে বিভিন্ন সময়ে তাদের ফসল বাজারজাত করতে পারবেন এবং উপযুক্ত মূল্যও পেতে পারবেন।
সাংবাদিক ও কলাম লেখক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- আফতাব চৌধুরী