ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

স্বাস্থ্য খাত

চিকিৎসার অধিকার বনাম চিকিৎসকের সুরক্ষা

চিকিৎসার অধিকার বনাম চিকিৎসকের সুরক্ষা
×

এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১৫:১৯

করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংক্রমিতদের চিকিৎসাসেবা দিলেও কোথাও কোথাও চিকিৎসা না পাওয়া বা অস্বীকৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত অভিযোগও উঠেছে। কিছু চিকিৎসক-নার্স পিপিই স্বল্পতা ও মাস্কের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিজেদের সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে আনছেন। অস্থির সময়ে এ ধরনের ঘটনা মানুষকে আরও অসহায় করে তোলে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়টি দু'পক্ষই আইনগত দিক থেকে দেখতে পারে।

চিকিৎসা ব্যবস্থা তত্ত্বাবধানের জন্য 'দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরি অর্ডিন্যান্স ১৯৮২'-এর ১১ ধারা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বেসরকারি হাসপাতাল সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করবেন। যদি কোনো অনিয়ম ঘটে, তবে ১৩ ধারা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করতে পারেন। এ ছাড়া ছয় মাসের জেল ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, এমনকি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তিও জব্দ করতে পারবেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান মৌলিক চাহিদা। মৌলিক অধিকার নয়! যতক্ষণ পর্যন্ত না ওই চিকিৎসা না পেলে জীবন হুমকির মুখে পড়ে। কারণ অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী সকল নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে, আর এক্ষেত্রে হাইকোর্টে রিট করে প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে।

যদি কোনো চিকিৎসক পেশাদারিত্বের অবহেলা করেন বা অস্বীকৃতি জানান, সেক্ষেত্রে 'কোর্ট অব মেডিকেল ইথিকস'-এর ধারা ৫-এ অনুযায়ী বিএমডিসি বরাবর অভিযোগ দেওয়া যাবে এবং তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিএমডিসি অ্যাক্ট ২০১০-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী সেই ডাক্তারের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা যাবে। যদি চিকিৎসা প্রদানকালে ডাক্তারের অবহেলাজনিত কোনো অঘটন ঘটে, দ বিধি ৩০৪-এ অনুযায়ী পাঁচ বছরের জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। ক্ষতিপূরণের জন্য দেওয়ানি আইনের আওতায় সিভিল কোর্টে প্রতিকারের বিধান রয়েছে। তবে সর্বশেষ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ধারা-২ অনুযায়ী চিকিৎসাসেবাকে এ আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এ আইনেরই ৫২-৫৬ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে।

শুধুমাত্র কঠোর আইনের প্রয়োগ নয়, সকলের মন ও মগজের পরিবর্তন দরকার। পুরোনো অভিযোগ রয়েছে যে, মফস্বল পর্যায়ে সরকারি পদায়নপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা থাকেন না। বিষয়টি সামগ্রিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করলে প্রতিপালন না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, গ্রামের অসহায় গরিব মানুষের জীবনের কি মূল্য নেই? এসব জনগণের অর্থেই তো আমরা চিকিৎসক বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সুবিধা পাই। আর সেবাই তো ডাক্তারের ধর্ম।

বিপরীত চিত্রও দেখতে হবে। অনেক চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হন। করোনাকালে জীবনও উৎসর্গ করেছেন অনেক চিকিৎসক। এমনই বাস্তবতায় তাদের সুরক্ষাও জরুরি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এক্ষেত্রে তাদের আইনগত অধিকারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান নেই।

অনেক আইনজ্ঞ মনে করেন, 'বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬'-এর ৭৮ ধারায় শ্রমিকদের বিশেষ পোশাক ও সুরক্ষার বিধান স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু এটা সম্ভব নয়, কারণ ২ ধারা বলা হয়েছে, শ্রমিক বলতে যারা কলকারখানায় কাজ করেন তাদের বোঝানো হবে। তবে 'জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি নীতিমালা-২০১৩'-এর দফা ২-এ নীতিমালার অধিক্ষেত্র বলতে শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্ঠানসহ সব কর্মস্থলকে বোঝানো হলেও চিকিৎসকদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিকার কষ্টকর। বর্তমানে বৈশ্বিক সমস্যা হওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনের দ্বারা তাদের সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, 'বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন' নামে একটি খসড়া আইন কয়েক বছর ধরে পড়ে আছে। এই খসড়া আইনে সরকারি চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। এ ছাড়াও উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা অনুমতি ব্যতীত কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না। আর এসব বিষয় নিয়ে বিরোধিতার কারণে আজ পর্যন্ত আইনটি আলোর মুখ দেখেনি।

ব্রিটেনে 'হেলথ অ্যান্ড সেফটি অ্যাট ওয়ার্ক ১৯৭৪' আইন আছে। যুক্তরাষ্ট্রে 'হেলথ সিকিউরিটি অ্যাক্ট ১৯৯৩' প্রণয়নের পাশাপাশি 'ভায়োলেন্স এগেইনস্ট হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার ১৯৯৮' আইনটি নিশ্চিত করা হয়েছে। ভারতে 'চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন-২০০৮' প্রণয়ন, এমনকি নেপালেও ২০১০ সালে 'স্বাস্থ্য কর্মী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন' প্রণয়ন হয়েছে। বাংলাদেশেও চিকিৎসকদের সুরক্ষা ও আইনগত নিরাপত্তা দিলে তারা দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশেও সহানুভূতিশীল, মানবিক ও আন্তরিকভাবে কাজ করতে পারেন।

আমাদের দেশেও অনেক মেধাবী চিকিৎসক আছেন। তথাপি অনেক ক্ষেত্রে গুণগত সীমাবদ্ধতা, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্বার্থসংশ্নিষ্ট ও রাজনৈতিক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ায় চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ সরকারকে সঠিক পরামর্শ দিতেও ব্যর্থ হয়েছেন। তাই স্বাস্থ্যসেবা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। চিকিৎসার জন্য ইউরোপ-আমেরিকা গমন নিয়ে আমরা যত সমালোচনাই করি না কেন, যতদিন এদেশে সঠিক চিকিৎসার অধিকার ও চিকিৎসকের সুরক্ষা নিশ্চিত না হচ্ছে, ততদিন শুধু ধনীরা নয়, দরিদ্র মানুষও সর্বস্ব ব্যয় করে চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশে হলেও যাওয়ার চেষ্টা করবে।

আইনজীবী

আরও পড়ুন

×