ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

শিক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজ ও রাজনীতি

বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজ ও রাজনীতি
×

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২০ | ০০:০৫

সমাজ ও রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কী? এ নিয়ে সবসময়ই চিন্তাভাবনা, লেখালেখি, নীতি পর্যালোচনা ও গবেষণা করেছি। করোনাকালে পরিবর্তিত দৈনন্দিন রুটিনের সুবাদে গত কয়েকদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে ভাবছি। এমন ভাবনা উদয়ের উপলক্ষ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে পদার্পণ। চলতি মাসের প্রথম দিন দেশের প্রথম এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার এক শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। এমন একটি মাইলফলক যেভাবে উদযাপন করার কথা ছিল, করোনা পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির শতবর্ষের তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে সংবাদ মাধ্যম ও সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা থেমে ছিল না। বিশেষত অনলাইন আলোচনায় যুক্ত হওয়ার যে নতুন প্রযুক্তি ও প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা যোগ করেছে নতুনতর মাত্রা। দিবসটি উপলক্ষে আমি নিজেও সংশ্নিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি ভিডিওবার্তা প্রকাশ করি।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমান মেয়াদসহ একাধিকবারের সিনেট সদস্য হিসেবে আমি সেখানে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলাম যে, এই বিশ্ববিদ্যলয় জ্ঞানচর্চা এবং জ্ঞানদানে আরও সমৃদ্ধ হবে আগামীতে। আগামী দিনে এর শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে পড়াশোনা করবে। তারা নীতিবান হয়ে উঠবে। তারা মানবিক ও সামাজিক গুণাবলিতে বলীয়ান হবে, দক্ষ হয়ে উঠবে। এই দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়তে অবদান রাখবে।

যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা প্রদান করা, সন্দেহ নেই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য স্পষ্ট হয় না। ১৯২০ সালে তৎকালীন ভারতীয় বিধান সভায় গৃহীত আইন অনুযায়ী ১৯২১ সালের ১ জুলাই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সহজ ছিল না। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের 'ক্ষতিপূরণ' হিসেবে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত ১৯১২ সালে গৃহীত হলেও প্রতিষ্ঠা হতে আরও প্রায় এক দশক লেগে গিয়েছিল। আগ্রহী, উৎসাহী ও দূরদর্শী যেসব মনীষী এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সময় ও শ্রম দিয়েছেন এবং কোনো কোনো মহলের বিরোধিতা হটিয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য।

আমরা দেখেছি, প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী সময়ে এই বিশ্ববিদ্যলয় তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখেছে। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে এর একাডেমিক ও আবাসন কাঠামোর কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জনসাধারণের মধ্যে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে পরিচিতি লাভ করে। আসলে এই বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববাংলার জাগরণের সূতিকাগার এবং এই বাংলার মানুষের স্বাধীন সত্তার বাস্তব রূপ দেওয়ার চক্রকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ভাস্বর হয়ে রয়েছে। যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন এবং পড়ছেন বা যারা এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিলেন না কিন্তু প্রশাসনিক এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বা আছেন, তাদের সবার জন্য এটি নিশ্চয়ই গৌরবের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগের কাজ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো এবং পড়ার বিষয় এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্য বৃদ্ধি করা। শুরুর সময়ে সেই সীমিত পরিসর থেকে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যলয়টিতে শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ৩৪ গুণ এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৫৩ গুণ। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন বিশাল অবয়বের। এদিকে অনেক পাঠ্যবিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সেই অনুসারে বিভাগের সংখ্যা বেড়েছে। এ ছাড়া অঙ্গীভূত প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রয়েছে।

বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান এবং তার সহযোগীদের দায়িত্ব শুধু এই নয় যে, বিশাল বিশ্ববিদ্যলয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-পরীক্ষা কার্যক্রম প্রচলিত ধাঁচে সুচারুরূপে পরিচালনা করা। যে কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো, তাতে যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করে এর অতীত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সচেষ্ট হতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন আবার উঁচু মানের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং গবেষণালব্ধ নতুন নতুন উল্লেখযোগ্য জ্ঞান সৃষ্টি। দুর্ভাগ্যবশত দীর্ঘদিন ধরে উভয় ক্ষেত্রে দুর্বলতা বাড়ছে বৈ কমছে না।

দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে শিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়টি শুধু বিশ্ববিদ্যলয় পর্যায়েরই নয়, এটি পুরো শিক্ষা খাতে বিস্তৃত। বলা যায় সমস্যাটা প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায় থেকে শুরু। প্রশ্ন হচ্ছ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা কতটা মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জন করে পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোতে। বস্তুত প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার মান এখনও অনেক প্রশ্নবিদ্ধ। সেই পর্যায়ে যাদের শিক্ষার ভিত দুর্বল থাকে তাদের মধ্যে ব্যাপক সংখ্যক ছেলেমেয়ে পরবর্তী পর্যায়গুলোতে আর ভালো করতে পারে না। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে প্রচলিত (যদিও অনেকে পাওয়ার পয়েন্টও ব্যবহার করেন) শিক্ষাদান পদ্ধতি তাদের সেই ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠতে তেমন সহায়ক হয় না।কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী যারা সাধারণত আগে থেকে ভালো ভিত নিয়ে আসে, তারা অবশ্য চেষ্টা করে এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা লাভ করে থাকে। কিন্তু সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার মান সম্বন্ধে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন রয়েছে।

মানতে হবে, পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা নির্ভর করা হয়েছে। অর্থাৎ 'যে যা বলুক ভাই, আমার পরীক্ষায় জিপিও পাঁচ পাওয়া চাই'- এই ধারণা প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের মাথায় বদ্ধমূল করে দেওয়া হয়। অন্যথায় সব শেষ। মা-বাবা, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবাই এ কাজটি করে থাকে। ফলে দেখা যায়, পরীক্ষায় ফল আশানুরূপ না হওয়ায় কোনো কোনো ছেলেমেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। পরীক্ষায় ফল ভালো করার জন্য তাই প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীরা বেছে বেছে পড়ে, নোটবই পড়ে, প্রাইভেট শিক্ষক যা পড়তে দেন তাই পড়ে, মূলত এ সবকিছুই মুখস্থ করে। বুঝে পড়া, চিন্তা করা এবং প্রশ্ন উত্থাপন করার কোনো অবকাশ থাকে না। অর্থাৎ মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জনের মৌলিক বিষয়গুলো বর্জন করা হয়। মোট কথা, শেখার-বোঝার কোনো বালাই নেই, মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো করতে হবে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে এই ধারা পরবর্তী সব পর্যায়েই চলতে থাকে। প্রাথমিক পর্যায় থেকে নোটবই, প্রাইভেট পড়া ও মুখস্থ বন্ধ করে বুঝে পড়া, চিন্তা করা ও প্রশ্ন উত্থাপন করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জরুরি। ধারাটা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত চললে সব পর্যায়ে শিক্ষার মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে। ফিনল্যান্ডসহ উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা বা জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ-সুবিধা ও সরঞ্জাম সীমিত। গবেষণার জন্য অর্থও সীমিত। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মৌলিক কাজ তথা জ্ঞান সৃষ্টি ব্যাপকভাবে অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। আগামীতে যথাযথ উন্নতি না হলে দেশের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় না থেকে শুধু একটি পাঠদানকারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। কাজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে যথাযথ পর্যায়ে গবেষণা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্নিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য এবং বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি।

শেষ করার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে কোনো বহিঃশত্রু নেই যাকে তাড়াতে হবে। এখন দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলা আমাদের সবার কাজ। কাজেই বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দলভিত্তিক জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় আমি কোনো সমস্যা দেখি না। সমস্যা তখন হয়, যখন তাদের দলীয় রাজনীতি বিশ্ববিদ্যলয়ের আসল কাজ তথা শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-গবেষণা বিঘ্নিত করে; শিক্ষক নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যলয়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দলীয় রাজনীতি হবে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি হবে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-গবেষণা সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম কীভাবে উন্নত করা যায়, আরও মানসম্পন্ন করা যায়, বিশ্বমানের করা যায় এবং বিশ্ববিদ্যলয়ের সার্বিক পরিবেশ আরও উন্নত মানের করা যায় সেসব বিষয়কে ঘিরে।

অর্থনীতিবিদ; সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আরও পড়ুন

×