প্রাথমিক বিদ্যালয়
ভাবিয়া কিনিও গ্রন্থ
ওই কিশোরকে কোমর থেকে পা পর্যন্ত বাঁশডলা দিয়ে নির্যাতন চালানো হয় -সংগৃহীত ছবি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২০ | ১৫:১৮
খবরটি স্বস্তির যে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে কমবেশি দেড় কোটি টাকার গ্রন্থ ক্রয়ের প্রক্রিয়া স্থগিত হয়েছে। সোমবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে আরও জানা যাচ্ছে যে, ক্রয় প্রক্রিয়ার যথার্থতা যাচাইয়ে গঠিত হয়েছে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি। গ্রন্থাগারগুলোর জন্য সরকারিভাবে বই ক্রয় নতুন নয়। বস্তুত বাংলাদেশে পেশাদার প্রকাশনী সংস্থাগুলো এ জন্য সাংবৎসর অপেক্ষাও করে থাকে। কিন্তু আলোচ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান চর্চিত রেওয়াজ অনুযায়ী ক্রয় তালিকাভুক্তির জন্য বই আহ্বান বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচক কমিটি গঠন করা হয়নি। তার বদলে মন্ত্রণালয়ের 'নিজস্ব' পদ্ধতিতে বই নির্বাচন ও ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি স্পষ্টতই বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি এবং বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তারা সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এই প্রক্রিয়ায় বই ক্রয়ের প্রতিবাদ জানায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও স্পষ্ট হয় নাগরিকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ১৫ জন বিশিষ্ট লেখক এ ব্যাপারে যৌথ বিবৃতি প্রদান করে। আমরা মন্ত্রণালয়কে সাধুবাদ জানাই যে, বিলম্বে হলেও তারা লেখক-প্রকাশকদের প্রতিবাদ ও পরামর্শ গ্রহণ করেছে। কিন্তু এটা প্রথম ধাপ মাত্র; যদি যথার্থ বই প্রকৃত প্রকাশকের কাছ থেকে উপযুক্ত মূল্যে ক্রয় করা হয়, তবেই এই স্থগিতাদেশের সার্থকতা। আলোচিত এই ক্রয় কার্যক্রমে মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছা ও দক্ষতা কতখানি স্পষ্ট হয়, আমরা নিশ্চয়ই নজর রাখব।
আমরা জানি, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে 'মুজিব কর্নার' বঙ্গবন্ধুবিষয়ক বই দিয়ে সমৃদ্ধ করার জন্য গৃহীত হয়েছিল এই উদ্যোগ। বই কেনার যে কোনো উদ্যোগই নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এর ওপর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়ক বই ক্রয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভুলে যাওয়া চলবে না যে, পঁচাত্তর-পরবর্তী কয়েক মেয়াদের সরকার জনমানস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার অপচেষ্টা চালিয়েছে। পাঠ্যসূচিতে বিকৃত করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছিল, পাঠ্যসূচিতে তিনি ছিলেন এক নিষিদ্ধ নাম। যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বঙ্গবন্ধুবিষয়ক পাঠ ও গবেষণা খুবই জরুরি। জাতি গঠনে তার জীবন, আদর্শ, স্বপ্ন ও চর্চা শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার বিকল্প নেই। কিন্তু একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুবিষয়ক প্রকাশনা ও কার্যক্রম গ্রহণের ব্যাপারে সতর্কতারও বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণে সুযোগ সন্ধানীরা প্রবেশ করেছে প্রায় সর্বত্র। এমনকি বঙ্গবন্ধুবিষয়ক প্রকাশনার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে- যারা আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুর নামও নেয়নি, তারা আজ পরিণত হয়েছে বঙ্গবন্ধুবিষয়ক বড় গবেষক ও লেখকে। বলাবাহুল্য, পঁচাত্তর-পরবর্তী দুঃসময়ে যারা ঝড়-ঝাপটা, রক্তচক্ষু, হেনস্তা উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু-চর্চা অব্যাহত রেখেছিল, তাদের অনেকেই পড়ে গেছে পেছনে। রাষ্ট্রীয়ভাবে বই নির্বাচন ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে এসব ব্যাপারে যেমন সচেতন থাকা উচিত, বঙ্গবন্ধুবিষয়ক প্রকৃত তথ্য ও গবেষণা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারেও থাকা উচিত তেমনই সতর্কতা। মন্ত্রণালয়ের এমন কর্মসূচির সুফল যদি মৌসুমি লেখক ও প্রকাশকরা পেয়ে যায়, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না।
মনে রাখতে হবে- রাষ্ট্রীয় অর্থ জড়িত রয়েছে, এমন যে কোনো ক্রয়ে অধিকতর সতর্কতার বিকল্প নেই। প্রতিটি ধাপে থাকতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও। আবার বিষয়টি যদি বই ক্রয়ের ব্যাপার হয়, তাহলে প্রয়োজন বাড়তি মনোযোগ ও মননশীলতা। এ ব্যাপারে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালা কেন করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন আমরা তুলে রাখলাম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপযোগী বই নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ, মনে রাখতে হবে। ফলে আমরা দেখতে চাইব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বই নির্বাচক কমিটিতে উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই সন্নিবেশ ঘটিয়েছে। সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থে সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে যদি বই কেনা না হয়, তাহলে দেউলিয়াত্ব ঘটা অস্বাভাবিক নয়।
- বিষয় :
- প্রাথমিক বিদ্যালয়