ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

জনসেবা

রাজনীতি ও প্রশাসনে দরকার আমূল সংস্কার

রাজনীতি ও প্রশাসনে দরকার আমূল সংস্কার
×

সাব্বির আহমেদ

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২০ | ১৫:১৪

দেশবাসী যখন করোনাভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে, তখন প্রশাসকরা পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধিতে ব্যর্থ। বন্দর বন্ধ করা, করোনা কিট, চিকিৎসা উপকরণ, সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ থেকে লকডাউন ঘোষণা ও বাস্তবায়ন, বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ত্রাণ ও নগদ অর্থ বিতরণ- কোনো কাজই সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন হয়নি। তাদের বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী কথাবার্তা, পরিকল্পনাহীনতা, সমন্বয়হীনতা এবং সর্বোপরি দুর্যোগকালেও দুর্নীতির চিত্র সেই মার্চ মাস থেকে প্রতিদিনের পত্রিকায় লিপিবদ্ধ। করোনাযুদ্ধের নেতৃত্ব রাজনীতিকদের বদলে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার ফল এটা।

দেশে আমলাতন্ত্র এমন অবস্থায় কেন, বুঝতে হলে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ মাত্র সাড়ে তিন বছর চলেছিল নিজের মতো। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় আর পাকিস্তানপন্থি সেনা সদস্যদের অংশগ্রহণে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবর্তী টানা একুশ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছে ঘুরেফিরে একই আদর্শের সরকার। সেনা ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র মিলেমিশে দেশ শাসন করেছে। নিজেদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে তখন রাজনীতিকে মেধাশূন্য করা হয়েছে। রাজনীতিবিদ নিহত হয়েছে, জেল খেটেছে, রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়েছে। রাজনীতি ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় তারা ছাত্র রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। বহুকাল দেশে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না, একমাত্র ব্যতিক্রম গতবছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ফলে রাজনীতিতে যোগ হয় না নতুন মেধা।

ষাটের দশক ছিল বাংলাদেশে রাজনীতির স্বর্ণযুগ। তখনকার মানুষ শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, চেতনায় এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন যে, তারা একটা দেশকে স্বাধীন করে ফেলতে পেরেছিলেন। সে সময়ে তৈরি হওয়া মানুষ এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বে নেই বললেই চলে। যারা এখন স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা প্রায় সবাই স্বাধীনতার পরে অর্থাৎ রাজনীতির খরার কালে তৈরি হওয়া নেতা। তাদের মধ্যে কিছু সুস্থ রাজনীতির ধারার মানুষ রয়েছেন, তবে বেশিরভাগ অসুস্থ রাজনীতির চর্চা করে এসেছেন। আওয়ামী লীগে সুস্থ চিন্তার লোক কিছু পাওয়া গেলেও অন্যান্য দলে আরও কম।

মেধাবী ও সুস্থ ধারার রাজনীতিকের অভাব অনুধাবন করেই কি প্রধানমন্ত্রী করোনা মহামারি ব্যবস্থাপনার মতো ব্যাপক একটা দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের কাছে না দিয়ে আমলাদের হাতে দিলেন? এ কারণেই কি তিনি সে কথা প্রকাশ্যে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জনগণকে জানিয়ে দিলেন? কিন্তু করোনাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসন সরকারের দুই অংশের কোনোটাই একবিংশ শতাব্দীর প্রয়োজন মেটাতে পারছে না।

এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণে দরকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সুস্থ রাজনীতির চিন্তা আর চর্চা করার লোক যথেষ্ট নেই বলে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ গ্রহণ সত্ত্বেও ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং মূল সংগঠনে সংস্কার সম্ভব হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে এমন অনেকে যারা চিন্তা-চেতনায় দলীয় আদর্শ ধারণ করেন এবং নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দক্ষ, সফল। দুর্বৃত্ত মানসিকতার নেতাকর্মীদের সরিয়ে সমর্থকদের মধ্যে থাকা যোগ্য লোকদের মূলধারা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে পারলে বদলে যাবে দেশের রাজনীতির চেহারা। এ কাজ করতে হলে এমন কাউকে উদ্যোগী হতে হবে যিনি সত্যিকার অর্থে দেশের এবং দলের মঙ্গল চান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কথায় নয়, মনেপ্রাণে ধারণ করেন। রাজনীতির গুরুত্ব ও মারপ্যাঁচ বোঝেন, মানুষ বোঝেন ও চেনেন। দলীয় প্রধানের আস্থাভাজন একজনের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটা টিম গঠন করে তাদের দিয়ে সব রকম কমিটিতে সুস্থ রাজনীতির মানুষকে যুক্ত করে বছর দু-একের মধ্যে রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব। আওয়ামী লীগে সুস্থ রাজনীতির চর্চা শুরু হলে তার প্রভাব অন্য দলগুলোর ওপরও পড়বে।

সংসদ সদস্যদের প্রায়ই ত্রাণ বিতরণসহ বেশ কিছু সরকারি কাজে যুক্ত হতে দেখা যায়। তারা কেন সরকারি কর্মকাে জড়িত থাকবেন? তাদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন করা এবং জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু সংসদ সদস্যরা আমলাদের বানানো আইনের ওপর সিল মারা ছাড়া আইন প্রণয়নের জন্য আর কোনো কাজ করেন না। আইন তৈরির সব ব্যবস্থা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের অধীন। সংসদের অধীনে সেগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য যেটুকু জনবল দরকার তাও নেই। জাতীয় সংসদ ভবনে প্রত্যেক সাংসদের জন্য আইন পড়াশোনা, গবেষণা, প্রস্তাবিত আইনের পর্যালোচনা করার প্রয়োজনীয় উপকরণসহ লোকবল দেওয়া দরকার।

ব্রিটিশদের 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' নীতির আলোকে সৃষ্ট আমলাতন্ত্র এখনও চলছে স্বাধীন বাংলাদেশে। জনপ্রতিনিধিরা আমলাদের কাছে আটকা পড়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের বস করে রাখা হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে, উপজেলা চেয়ারম্যানকে নয়। উপজেলা চেয়ারম্যানের বস জেলা প্রশাসক, জেলা চেয়ারম্যান নন। জেলা চেয়ারম্যান নামেই আছেন, কাজে নেই। পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন চলে আবার অন্য তালে। সিটি করপোরেশনগুলো মেয়রদের পদমর্যাদা প্রতিমন্ত্রী বা মন্ত্রীর সমান হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের অধীন। নির্বাচিত চেয়ারম্যান, কাউন্সিলরদের চাকরি যখন-তখন নট করার ক্ষমতা দেওয়া আছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। জনপ্রতিনিধিরা কেন প্রশাসকদের হাতে জিম্মি থাকবেন?

জনসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে সরকারের দেওয়া সেবাগুলো স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। সেজন্য তাদের শক্তিশালী করে তোলা দরকার। একদিকে তাদের কর আদায় করার অধিকার বাড়াতে হবে অন্যদিকে স্থানীয় জনসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চেয়ারম্যান, মেয়রদের অধীনে নিয়ে আসতে হবে। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, গণপরিবহন, চিকিৎসা, খাদ্য, রাস্তাঘাট ইত্যাদি কাজের দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। প্রশাসন এসব সেবা প্রদানকারী অবকাঠামোর দেশব্যাপী পরিকল্পনা করবে, নির্মাণ করবে; কিন্তু পরিচালনা করবে স্থানীয় সরকার। জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা শুধু আদালতের হাতে থাকতে পারে, কোনো প্রশাসকের হাতে নয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন (এসিআর) উপজেলা চেয়ারম্যান করবেন; জেলা প্রশাসকেরটা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। প্রশাসকরা জনপ্রতিনিধিদের অধীনে কাজ করবেন- এটাই গণতন্ত্র।

দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৫০ বছর। '৭৫-এর পর দীর্ঘ সময় সাম্রাজ্যবাদীরা দেশকে স্বাধীনতাবিরোধীদের দিয়ে চালিয়েছে। সেখান থেকে দেশ মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরে এসেছে। এখানে শেষ নয়। এখানে পরবর্তী পর্যায়ের শুরু। '৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন শুধু পরিমাণগত নয়, গুণগত উন্নয়ন দরকার।

চার্টার্ড অ্যকাউন্ট্যান্ট

আরও পড়ুন

×