সৈকতে বর্জ্যের স্তুপ
গভীর সমুদ্রে দৃষ্টি দিন
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক- ফাইল ছবি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২০ | ১৫:১৮
করোনা পরিস্থিতিতে প্রকৃতি যখন 'সুস্থ' হয়ে উঠছে, তখনই কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কমবেশি ১০ কিলোমিটার জুড়ে বর্জের অসুস্থ স্তুপ এবং ফাঁকে ফাঁকে মৃত জলজপ্রাণী আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। ইতিমধ্যে পরিবেশকর্মীরা শতাধিক অসুস্থ কচ্ছপ উদ্ধার করে সাগরে অবমুক্ত করেছেন। কিছুদিন আগেও আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, জনবিরল সৈকতে পাতা ও শেকড় মেলেছে সাগর লতা। দেখা গেছে বিরল বন্যপ্রাণী। আমরা জানি, মানুষই নিকৃষ্টতম দূষণকারী। করোনা নিষেধাজ্ঞার কারণে সৈকতে যেখানে মানুষের পদচিহ্ন নেই, সেখানে এত বর্জ্য এলো কোথা থেকে? এখন বর্ষা মৌসুম, সাগর স্বভাবতই উত্তাল। এই মৌসুমে সাগরে মাছ ধরার ট্রলারও সাধারণত খুব থাকে না। তারপরও কক্সবাজারের সুগন্ধা থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত্ম প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ময়লা-আবর্জনা ও মৃত কচ্ছপ এর কারণ অনুসন্ধানে জোর তাগিদ দেয়। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, এত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এবং একই সঙ্গে এত বেশি কচ্ছপ মারা যাওয়ার দৃষ্টান্ত্ম বিরল। আমরা জানি, ২০ মে থেকে উপকূলে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। এই কর্মসূচি একটানা ৬৫ দিন বলবৎ থাকবে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, গভীর মুদ্রে দেশি-বিদেশি জেলেরা ট্রলার নিয়ে মাছ ধরছে। মৎস্য ভাণ্ডারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যেখানে দেশীয় মৎসজীবীদের ডাঙায় রাখা হচ্ছে, সেখানে যদি বিদেশীরা এসে মাছ ধরে নিয়ে যেতে থাকে, তাহলে এমন কর্মসূচির সার্থকতা কোথায়? শুধু মৎস্যসম্পদ নয়, নির্বিচার আহরণে ব্যবহূত জলযান ও জাল পরিবেশেরও কতটা ক্ষতি করছে আমরা জানি না। সেসব জলযান থেকে নিক্ষেপিত বর্জ্যের আঘাতে শত শত কচ্ছপ হতাহত হবে, বিশ্বাসযোগ্য নয়। অন্যান্য জলজপ্রাণীও ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এবং তাদের মৃত বা অর্ধমৃত দেহ সৈকতে ভেসে নাও আসতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজ এনে বাংলাদেশের উপকূলে ভাঙা হয়। প্রাণী মৃত্যুর কারণ হিসেবে তেমন কোনো জাহাজের বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, করোনা পরিস্থিতিতে উপকূল ও গভীর সমুদ্রে নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। সেই সুযোগে সমুদ্রে চলছে নিষিদ্ধ তৎপরতা। সেখানে বিদেশীদের সঙ্গে দেশীয় অবিমৃষ্যকারী কোনো গোষ্ঠী জড়িত থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা দেখতে চাই, অবিলম্বে সম্ভাব্য সব কারণ খতিয়ে দেখা হয়েছে। স্বস্টিত্মর বিষয় যে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বর্জ্য ও হতাহত প্রাণী ভেসে আসার কারণ উদঘাটনে সোমবার পাঁচ সদস্যের তদন্ত্ম কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কেবল তদন্ত্ম কমিটি গঠনের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। আমরা দেখতে চাইব, নির্ধারিত সময়ে এই কমিটি তদন্ত্ম শেষ করেছে এবং সুপারিশ জমা দিয়েছে। অতীতের বিভিন্ন তদন্ত কমিটির নজির না মেনে সংশিস্নষ্টদের উচিত হবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশও করা। যাতে করে বেসরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরাও এ ব্যাপারে মতামত দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, উদ্ভূত পরিস্থিতি শুধু জীববৈচিত্রের জন্যই হুমকি নয়, আমাদের পর্যটন শিল্পের জন্যও অশুভ বার্তা। বর্জ্যগুলো যাতে সৈকতে পড়ে থাকতে থাকতে ভাটার টানে সাগরে ফিরে না যায় বা জোয়ারের বালিতে চাপা না পরে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। যত দ্রল্ফম্নত সম্ভব পরিস্কার করতে হবে সৈকতটি। এই কাজে প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। বিশেষত এগিয়ে আসতে হবে হোটেল-মোটেল ব্যবসায়িদের। এখন যদিও পর্যটক নেই, পরিচ্ছন্ন সৈকতই তাদের ভবিষ্যতের পুঁজি ভুলে যাওয়া চলবে না। বস্তুত সমুদ্র সৈকত যেমন সামষ্টিক, সৈকতের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব সবার। সরকারি-বেসরকারি পক্ষগুলো মিলে সেই দায়িত্বশীলতা সৈকত থেকে গভীর সমুদ্রেও সম্প্রসারিত করতে হবে। সৈকতে কেন বর্জ্য ও হতাহত জলজ প্রাণী ভেসে এলো, তা কেবল সৈকতে চোখ রেখে বোঝা যাবে না। দৃষ্টি দিতে হবে গভীর সমুদ্রেও। গভীর সমুদ্র যদি আমরা সুরক্ষিত না রাখতে পারি, সৈকত কার্যত অরক্ষিতই থেকে যাবে।
- বিষয় :
- সৈকতে বর্জ্যের স্তুপ
- সৈকত