ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের আন্দোলন

শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের আন্দোলন
×

ফাইল ছবি

পলাশ কান্তি নাগ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁঁকি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন সারাদেশের শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা। অবস্থান কর্মসূচির আগে জেলায় জেলায় ডিসির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ, মানববন্ধন-সমাবেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে টানা সাত দিন অনশন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা।
আজ যারা আন্দোলন করছেন তারা সবাই বার কাউন্সিল সদস্যদের সন্তানতুল্য। একবারও কি শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের কষ্ট-বেদনা তাদের হৃদয়ে রেখাপাত করে না? এ অবস্থায় আন্দোলনকারীদের দাবি সম্পর্কে ঢালাওভাবে বিরোধিতা না করে তাদের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই আমরা যৌক্তিকতা খুঁজে পাব।
নিয়ম অনুযায়ী বছরে আইনজীবী তালিকাভুক্তির দুটি পরীক্ষা সম্পন্ন করা বার কাউন্সিলের দায়িত্ব। ২০১২ সালের আগে গড়ে আট মাসে একটি পরীক্ষা সম্পন্ন হতো। সেখানে বর্তমানে আড়াই-তিন বছর পর পর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কোনো কারণে একবার কেউ ফেল করলে তার পাঁচ-ছয় বছর সময় লেগে যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় সব পরীক্ষা অনুষ্ঠান ও ফল প্রকাশ দ্রুততম সময়ের মধ্যেই হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষা। যে পরীক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও বিড়ম্বনার শেষ নেই।
২০১৭ ও ২০২০ সালের এমসিকিউ উত্তীর্ণ ১২ হাজার ৮৭৮ শিক্ষানবিশ আইনজীবী করোনা মহামারির কারণে রিটেন ও ভাইভা থেকে অব্যাহতি চেয়ে সনদ প্রার্থনা করেছেন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যদি রিটেন ও ভাইভা পরীক্ষা হতো তাহলে এর মধ্যে দুই-তিন হাজার জন হয়তো সনদ পাবেন না। এর বেশি নয়। আজ যারা বৈশ্বিক এই মহামারির কারণে রিটেন ও ভাইভা পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে আইনজীবী সনদের দাবিতে আন্দোলন করছেন, তারাই কিন্তু দ্রুত পরীক্ষা অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন করেছেন।
কবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে সেই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। পরীক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে নিশ্চয়ই এই দাবি উত্থাপিত হতো না। শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের জীবনের মূল্যবান যে সময় অপচয় হচ্ছে, তার দায় কে নেবে। আজ বৈশ্বিক মহামারির কারণে গত তিন মাস যাবত আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নিয়মিত আদালত চালুর জন্য আইনজীবীরা আন্দোলন করছেন, লেখালেখি করছেন, সংবাদ সম্মেলন করছেন। যেখানে আইনজীবীরা তিন মাস অপেক্ষা করতে পারছেন না, সেখানে শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা কীভাবে তিন বছর, ক্ষেত্রবিশেষে পাঁচ-ছয় বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন, তা একবারও চিন্তা করেছেন? অন্যসব বিশেষায়িত পেশায় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, রসায়নবিদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এমন পরীক্ষা পদ্ধতি নেই।
পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন পরীক্ষা পদ্ধতি আছে বলে আমার জানা নেই। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এলএলবি, এলএলএম পাস করে বার কাউন্সিলে নির্ধারিত ফি দিয়ে আইনজীবী সনদপ্রাপ্ত হন। আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রদান করলেই কি সরকারের রাজস্ব থেকে বেতন-ভাতা দিতে হবে? জুডিশিয়ারি কিংবা বিসিএস পরীক্ষা তো প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিয়োগের জন্য। সেখানে তিন ধাপে বাছাই করলেও করতে পারে। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে পেশা পরিচালনার সনদ প্রদানের জন্য তিন ধাপে পরীক্ষা গ্রহণের কোনো যৌক্তিকতা আছে কি? তিন ধাপে পরীক্ষা গ্রহণ যদি যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি হয়, তাহলে ২০১২ সালের আগে যারা তিন ধাপে পরীক্ষা দেননি কিংবা যারা শুধু ভাইভা পরীক্ষা দিয়ে আইনজীবী হিসেবে সনদপ্রাপ্ত হয়েছেন, আমরা কি তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি? সেটা কি যৌক্তিক হয়?
যতদূর জানি, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২ এর ৪০(১) এবং ৪০(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে ২০১৭ ও ২০২০ সালের এমসিকিউ উত্তীর্ণদের গেজেট প্রকাশ করে সনদ প্রদানে কোনো বাধা নেই। বার কাউন্সিল ইচ্ছা করলে প্রস্তাবটি রেজুলেশন আকারে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদন নিয়ে আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করতে পারে।
সাবেক ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন

×