অশ্বিনী কুমার দত্তের নামেই হোক নামকরণ
ফয়জুল হাকিম
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
জীবন চলার পথে কত মানুষের ভালোবাসা, সাহস ও পরামর্শ জীবনকে এগিয়ে নেয়, আলোকিত করে, তা বোঝার মতো ধৈর্য, স্থিরতা আজকের দিনে আমাদের নেই। সমাজ বিকাশের পথে পুঁজিবাদ যখন থেকে আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতিতে জেঁকে বসেছে, তখন থেকেই শুরু হয়েছে এই অস্থিরতা, বিচ্ছিন্নতার পালা। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষকে তার শেকড় থেকে, পরিবার ও সমাজ থেকে এমনকি নিজের কাছ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে চলেছে। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে এক একজন ব্যক্তি যেন আজ এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আর সেই দ্বীপে বাস করতে গিয়ে একেকজন হয়ে উঠেছে স্বার্থপর ও কূপমণ্ডূক।
২.
ছেলেবেলায় আব্বার মুখে (প্রফেসর এস. এম. ফজলুল হক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল) শুনেছিলাম গোপালগঞ্জের জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত উলপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি খুলনা ব্রজলাল কলেজে ভর্তি হবেন বলে মনস্থির করে ফেলেন। সে সময় শেখ সাহেব (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) তাকে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং এ জন্য এক হাত চিঠি লিখে তাকে বরিশালের রাজনীতিবিদ হাশেম আলী খান সাহেবের কাছে পাঠান। সেই সূত্রেই আব্বার বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়া ও শিক্ষাগ্রহণ করা। উল্লেখ্য, আমার পূর্বপুরুষের স্থায়ী ঠিকানা টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতি নৌবন্দরের বিপরীতে রহমতপুর গ্রামে যার পূর্ব নাম গঙ্গাচন্না।
৩.
ব্রিটিশ আমলে অশ্বিনী কুমার দত্ত ১৮৮০ সালে ওকালতির জন্য বরিশাল শহরে বসবাস শুরু করেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা মানুষ। প্রয়াত পিতা ব্রজমোহন দত্তের নামে বরিশাল অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন ব্রজমোহন বিদ্যালয় (১৮৮৪ সালে) এবং ব্রজমোহন কলেজ (১৮৮৯ সালে) ও নিজ গ্রাম বাটাজোড়ে একটি ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে তার উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বরিশালের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন 'বরিশাল জনসাধারণ সভা'। একপর্যায়ে তিনি এর সম্পাদকও নির্বাচিত হন। ১৮৮৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে এই সংগঠনটি যোগ দেওয়ার পরে সর্বভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে বরিশালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার সংগ্রামে চারণ কবি মুকুন্দ দাসকে তিনি কাজে লাগান। ১৯২৪ সালে এই রাজনীতিক সমাজসেবীর প্রয়াণ ঘটে।
৪.
১৯৪৭ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হতে এসে আব্বা দেখেন ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের গ্রহণ করতে রাতের বেলা স্টিমার ঘাটে ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষকরা অপেক্ষা করছেন। দক্ষিণবঙ্গের দূরদূরান্ত থেকে আগত ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীরা যাতে কোনো অসুবিধার ভেতর না পড়ে সে জন্য এই ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন অশ্বিনী কুমার দত্ত, যার ধারাবাহিকতা তখনও রক্ষা করা হতো। তার সময় ব্রজমোহন কলেজে গুণী, পণ্ডিত ও ছাত্রদরদি শিক্ষক নিয়োগ করে ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষার মান উন্নত করে একে উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। এ কারণে অবিভক্ত বাংলায় ব্রজমোহন কলেজের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল।
৫.
দক্ষিণবঙ্গের জনগণের ভেতর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বদেশি আন্দোলন, স্বাধীনতার চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অশ্বিনী কুমার দত্তের নেতৃত্বমূলক ভূমিকা আজকের বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা। সে সময় তার বাড়িতে করমচাঁদ গান্ধী, মওলানা মহাম্মদ আলী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এমন অনেক ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের নেতার আগমন ঘটেছিল।
৬.
জনগণই প্রকৃত অর্থে ইতিহাস নির্মাণ করে। তার পরেও ইতিহাসের নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। অশ্বিনী কুমার দত্ত তার সময়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামী যেমন ছিলেন, তেমনি তার সীমাবদ্ধতাও ছিল। তিনি ছিলেন উচ্চবর্ণ ও অভিজাত সম্প্রদায় থেকে আগত এবং তাদের প্রতিনিধি। এসব সত্ত্বেও অসাম্প্রদায়িক সামাজিক আন্দোলনে, শিক্ষা বিস্তার ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ও অনস্বীকার্য।
৭.
আজ বরিশাল শহরের কেন্দ্রস্থলে সরকারি বরিশাল কলেজ যে স্থানে প্রতিষ্ঠিত, যা একসময় ছিল তার বাসগৃহ, সেই কলেজের নামকরণে তার নাম প্রস্তাবের সংবাদে খুবই আনন্দ পেয়েছি। দীর্ঘ বহু বছর পর বরিশালবাসী তার এক যোগ্য নেতাকে সম্মানিত করতে যাচ্ছে। তাকে স্মরণে রাখার এ এক মহৎ উদ্যোগ। ব্রজমোহন কলেজের মূল ভবনের লেখা 'সত্য প্রেম পবিত্রতা'র স্লোগান আজও ছাত্রছাত্রীদের উদ্দীপিত করে চলেছে। আমি আমার বাবার মতোই গর্বিত, আমি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের ছাত্র ছিলাম। যে বাতিওয়ালা দক্ষিণবঙ্গের ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে সরকারি বরিশাল কলেজের নামকরণ হোক।
চিকিৎসক; আহ্বায়ক, জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ
- বিষয় :
- ইতিহাস