ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

দায় কাউকে না কাউকে নিতেই হবে

দায় কাউকে না কাউকে নিতেই হবে
×

এম হাফিজ উদ্দিন খান

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

প্রতারক সাহেদ করিমের কথাই যদি বলি তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়- এত এত গোয়েন্দা সংস্থার চোখে ধুলো দিয়ে এত দুস্কর্ম করে কীভাবে সে পার পেয়ে যাচ্ছিল? সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে 'রাজকীয় পোশাক' পরিহিত অবস্থায় তার খোশমেজাজের ছবি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রায় সব অনুষ্ঠানেই তার উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। বছরের পর বছর দুস্কর্ম করে সে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। তার তথাকথিত রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (করোনা পরীক্ষার) চুক্তির সময় করেয়কজন মন্ত্রীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এই সাহেদ তো এক দিনে সাহেদ করিম হয়ে ওঠেনি। ক্ষমতাবান কিংবা ক্ষমতা সংশ্নিষ্টদের যদি ছায়া না পেত, তাহলে সে তার কুকর্মের পরিসর নিশ্চয়ই এত বিস্তৃত করতে পারত না। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বশীলরা সহজে তাদের দায় এড়াতে পারেন না। একই সঙ্গে বলা যায়, জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান সাবরিনা শারমিন ও আরিফুল হক দম্পতির কথাও। এ রকম দৃষ্টান্তের অভাব নেই।
ক্যাসিনোকাণ্ড খুব দূর-অতীতের ঘটনা নয়। পাপিয়াকাণ্ডও প্রায় সমসময়ের ঘটনাই বলা যায়। সম্রাটের উত্থান কাহিনিও পুরোনো নয়। তারা প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন মহলের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। আরেক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শামীম তো তাদের চেয়েও আরও এক ডিগ্রি ছাপিয়ে। এই যে এদের জন্ম এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্রমে বেড়ে ওঠা ও দুস্কর্মের পাহাড় গড়ে তোলা, এসব ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলসহ গোয়েন্দা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কোনো কিছুই অজানা থাকার কথা না। তাহলে তাদের দায় এড়ানোর পথটা কী? অস্বীকার করা যাবে না যে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু তার আগে তো বহু কিছু ঘটে গেছে। তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতাধরের ছায়াতলেই বেড়ে উঠেছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই ক্ষমতাধরদের ক'জনকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা কিংবা যথাযথ প্রতিকার করা সম্ভব হয়েছে? উত্তরটা প্রীতিকর নয়।
সংসদ সদস্য শহীদ ইসলামের মানব পাচারের মতো অপকর্ম ও কুয়েতে তার গ্রেপ্তার হওয়ার পর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসছে। বিষয়টি আমাদের জাতীয় সংসদে পর্যন্ত আলোচনায় উঠে এসেছে। আমাদের অজানা নয় যে, সংসদীয় গণতন্ত্রে অনৈতিক আচরণ কিংবা কর্মকাণ্ডের দায়ে সংসদ সদস্যের বহিস্কারের ঘটনা ঘটে থাকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতেই এমন দৃষ্টান্ত আছে। একজন সংসদ সদস্য আইনপ্রণেতা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাদের মতো ব্যক্তিদের কেউ কেউ যখন নানারকম দুস্কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েন, তখন শামীম, সম্রাট, পাপিয়া, সাহেদ করিমদের বাড়বাড়ন্তের সুযোগ সঙ্গত কারণেই বিস্তৃত হওয়ার পথ খুলে যায়। নিকট অতীতে একজন মহিলা সংসদ সদস্যের শিক্ষা সনদ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছিল। এরও কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার হয়নি
শুধু অনিয়ম-দুর্নীতিই নয়, করোনাদুর্যোগের মতো এই ভয়াবহ বিপর্যয়কালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও কম উদ্বেগের কারণ নয়। গত ১৬ জুলাই খুলনার ফুলতলা উপজেলার খানজাহান আলী থানাধীন মশিয়ালী গ্রামে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটল তাতে তো ফের এই প্রশ্নই উঠেছে- আইনের শাসন কতটা কার্যকর? ওই ঘটনায় চারজনের প্রাণ গিয়েছে। পত্রপত্রিকার খবরে প্রকাশ, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ জাকারিয়া ও তার দুই ভাইয়ের অত্যাচারে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে দখলবাজির মতো নানারকম দুস্কর্মের অভিযোগই ছিল। তাদের সুদের জমজমাট কারবারও ছিল এবং এর মধ্য দিয়ে অনেককেই তারা সর্বস্বহারাও করেছে। তাদের অপকর্মের প্রতিবাদ করার সাহস এলাকার অনেকেরই ছিল না। আর কেউ করলেও নেমে আসত নির্যাতনের খড়্‌গ। অভিযোগ আছে, একজন নিরীহ গ্রামবাসীকে অস্ত্রসহ এই 'বলবান'রা পুলিশে ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী তাদের বাড়িতে প্রতিকার চাইতে গেলে বলবানদের ছোড়া গুলিতে তিনজন নিহত ও সাতজন আহত হন। পরে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর পিটুনিতে এক তরুণ প্রাণ হারায়। এই পরিস্থিতি নৈরাজ্যকর, একই সঙ্গে অত্যন্ত মর্মন্তুদ। এই পরিস্থিতির দায় কি দল এড়াতে পারে?
আইনের প্রধান ও অন্যতম পূর্বশর্ত দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন। কিন্তু আমরা কি খুলনার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ জাকারিয়া ও তার ভাইদের ক্ষেত্রে এমনটি দেখেছি? এটি একটি মাত্র ঘটনা। কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত এমন বলবানের সংখ্যা কম নয়। তারা শুধু সমাজের ক্ষত সৃষ্টিকারীই নয় দলেও বোঝা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- দল এমন ক'জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে? অনস্বীকার্য যে, রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে শেখ জাকারিয়া ও তার ভাইদের আরও অনেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিংবা উঠছে। সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এমন জাকারিয়াদের বিরুদ্ধে আইনি সংস্থাগুলোর যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দায় যেমন রয়েছে, তেমনি দায় রয়েছে দলেরও। রাজনৈতিক নেতাকর্মীর পরিচয়ে-দাপটে যে বা যারা অশান্তি-অনিয়ম-দুর্নীতি করবে তারা তো সমাজের মিত্র নয়। যারা সমাজের মিত্র নয় তারা দলের জন্য কেন অপরিহার্য? দেশে আইনের শাসন কার্যকর আছে- এমনটি নিশ্চিত করতে হলে দুস্কর্মকারী যে বা যারাই হোক তাদের বিরুদ্ধে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে কঠোর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতেই হবে।
করোনা দুর্যোগে সরকারের সহায়তা কার্যক্রমে, বন্যা আক্রান্তদের ত্রাণ কার্যক্রমে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনেক দুর্নীতির চিত্র বিগত কয়েক মাসে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অনিয়ম-দুর্নীতির মতো দুস্কর্মে জড়িত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিকার হয়েছে বটে যা ব্যতিক্রম ঘটনা। ব্যতিক্রম ঘটনা তো সার্বিকভাবে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে না। কেন সরকার প্রধানের এত কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও একের পর এক বড় আকারের দুস্কর্ম ঘটে চলেছে এবং সিংহভাগ ক্ষেত্রেই এসব দুস্কর্মে দলীয় শক্তিশালীদের ছায়ার চিত্র উঠে আসছে- তা অবশ্যই জিজ্ঞাস্যের বড় বিষয়। অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র অনেক দেশেই কমবেশি রয়েছে। কিন্তু সেসব দেশের অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিকার চিত্র দৃষ্টান্তযোগ্য যা আমাদের দেশে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় লক্ষণীয় নয়।
দুর্নীতির ব্যাপারে সরকারের 'শূন্য সহিষ্ণুতা' রয়েছে বলে শুনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে তাও জানি। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা-সদিচ্ছাই সব সমস্যা-সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে একমাত্র উপায় নয়। তার পক্ষে একা সব দিকে নজর রাখাও দুরূহ। তারপরও এ ব্যাপারে তার অবিচলতা নানা মহলের সাধুবাদ কুড়িয়েছে শুনি। একটি সরকারের নানা শাখা-প্রশাখা থাকে। থাকেন মন্ত্রিবর্গ। প্রশ্ন হচ্ছে- তাদের ভূমিকা কতটা কার্যকর? সবাই যদি স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ থাকতেন, তাহলে নিশ্চয় এত নেতিবাচকতা পরিলক্ষিত হতো না। এসব নেতিবাচকতার দায় তো কাউকে না কাউকে নিতেই হবে। এমন স্বেচ্ছাচারিতা তো চলতে পারে না। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ নিস্কণ্টক করতেই হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

আরও পড়ুন

×