ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

করোনা পরীক্ষার ফি

প্রশ্নটা অর্থের ও অধিকারের

প্রশ্নটা অর্থের ও অধিকারের
×

২০১৮ সালে কোটালীপাড়ার পৈত্রিক ভিটায় ফুফাতে ভাই এরিক অমর মজুমদার, স্ত্রী লিপিকা ও বোন শিখার সাথে এন্ড্রু কিশোর

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

করোনা মহামারিকালে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শোচনীয় গলি-ঘুপচি এমনিতেই উদোম হতে থাকার মাঝে কভিড-১৯ পরীক্ষার ফি নিয়ে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছে, তা যেন গোদের ওপর বিষফোড়া। মঙ্গলবার সমকালে 'এক দেশে দুই নীতি' শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে করোনা পরীক্ষার সরকারি ফি সম্পর্কিত যে চিত্র উঠে এসেছে, তা যেমন বিস্ময়কর, তেমনই বেদনা জাগানিয়া। এতে দেখা যাচ্ছে, বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য করোনার নমুনা পরীক্ষায় উচ্চহারের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে নমুনা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হলেও পরীক্ষাকারীদের গুনতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালের জন্য ধার্য করা ফির সমান টাকা। সরকার নির্ধারিত হাসপাতালে গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করালেও প্রত্যেককে দিতে হবে সাড়ে তিন হাজার টাকা। আর যদি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয় আরও ৫০০ টাকা বেশি দিতে হবে। আমরা জানি, বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরীক্ষা করালে ২০০ টাকা ও বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করলে ৫০০ টাকা দিতে হয়। আমাদের বোধগম্য নয় স্বাস্থ্য বিভাগের সরকারি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে দুই রকম ফি নির্ধারণের যৌক্তিকতা কী। যারা বিদেশে শ্রম বিক্রি করে আমাদের অর্থনীতি স্টম্ফীত করে আসছেন, তাদের প্রতি এই বৈষম্যমূলক নীতির হেতুটা কী- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় স্বাস্থ্য বিভাগ এড়াতে পারে না। যখন দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের নানারকম অনিয়ম-দুর্নীতি-অপরিপকস্ফ কর্মকাণ্ড একের পর এক প্রশ্ন তুলছে, বিস্ময় জাগাচ্ছে, তখন তাদের তরফে এই দ্বৈত সিদ্ধান্ত সমালোচনার আরও খোরাক জুগিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিদেশগামীদের পরীক্ষা কি তাহলে ভিন্নমাত্রায় হচ্ছে? এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দু'রকম পরীক্ষা হচ্ছে কিনা কিংবা এক্ষেত্রে লুক্কায়িত আর কোনো রহস্য রয়েছে কিনা তাও প্রশ্নের বিষয়।
করোনা দুর্যোগের কারণে এমনিতেই আমাদের প্রবাসী কর্মীরা রয়েছেন নানারকম ঝুঁকিতে। অনেকে ইতোমধ্যে ফিরে এসেছেন, অনেকে ফিরে আসার পথে রয়েছেন। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম জোগানদার প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের প্রবাহেও সঙ্গতই ভাটা পড়েছে। এর মধ্যে যারা বিভিন্ন দেশে কাজে ফিরতেন, এখন তাদের করোনা নেগেটিভ সনদের প্রয়োজন। এত চাপে থাকা মানুষদের কাছ থেকে উচ্চহারে ফি আদায়ের বিষয়টি কোনোভাবেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। বাড়তি ফি নির্ধারণ করে কি করোনা পরীক্ষা নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে? আমরা মনে করি, করোনা সংক্রান্ত যে কোনো চিকিৎসা ও পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হওয়া উচিত। তা ছাড়া রাষ্ট্র তার নাগরিকের জন্য কোনোভাবেই দ্বৈতনীতি গ্রহণ করতে পারে না। আমরা এটিও মনে করি, সরকারের এই পরিপত্র অবিলম্বে বাতিল করা উচিত।
আমরা দেখছি, করোনা নেগেটিভ ও সনদ জালিয়াতির কারণে ইতালিগামী বাংলাদেশি কয়েকজনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব কত বিস্তৃত হয়েছে তা আমরা জানি। ইতালিসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ কিছুদিনের জন্য বন্ধ রেখেছে। বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা পরীক্ষার জন্য কেন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাড়তি ফি গুনতে হবে- এ প্রশ্ন উপেক্ষণীয় থাকতে পারে না। উল্লেখ্য, প্রায় বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের পর দেশে আসা প্রবাসীদের সিংহভাগই শ্রমিক শ্রেণির। করোনা পরিস্থিতির কারণে তাদের বিভিন্ন দেশ ফেরত পাঠায়। কোনো কোনো দেশে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় কিংবা নিয়ন্ত্রণে আসায় আবার তাদের ডাক পড়েছে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কি তাদের 'অপরাধ'? বাড়তি ফি কি সেই অপরাধের দণ্ড? দেশের অর্থনীতিতে যারা অবদান রাখছেন, কেন তারা এমন বৈষম্যের শিকার হবেন? হতে পারে, প্রবাসী অনেকের জন্য সাড়ে তিন হাজার বা চার হাজার টাকা খুব বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু প্রশ্নটি অর্থের নয়, অধিকারের। তা ছাড়া এক রাষ্ট্রে নাগরিকদের জন্য দ্বৈতনীতি হবে কেন? ভুলে যাওয়া চলবে না, চিকিৎসাসেবা মানুষের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইন কিংবা নীতি সব নাগরিকের জন্য সমান হবে এটিই খুব স্বাভাবিক ও সঙ্গত।

আরও পড়ুন

×