ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

কোরবানির পশু সংশ্নিষ্ট বিধান

কোরবানির পশু সংশ্নিষ্ট বিধান
×

আবু রুফাইদাহ রফিক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

কোরবানি মুসলমানদের এমন একটি বার্ষিক ইবাদত, যা ইসলামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ নিদর্শন বহন করে। মুসলিম জীবনে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আল্লাহ নিজেই এ ইবাদতের ঐতিহাসিক পটভূমি রচনা করেছেন। ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রিয় সন্তান ইসমাইল (আ.)-এর কোরবানির ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ এ ইবাদতকে বিধিবদ্ধ করেন। সুতরাং এ ইবাদতের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য বর্ণনাতীত।
কোরবানির উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং করণীয় বিষয়ে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের ৩৪ থেকে ৩৭ নম্বর আয়াতগুলোতে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এ আলোচনায় তিনি পশু জবাইয়ের সময় তার নাম নেওয়াকে কোরবানির উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আর আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানির বিধান নির্ধারণ করেছি, যেন আল্লাহ তাদের রিজিক হিসেবে যেসব জন্তু দান করেছেন, সেগুলোর ওপর আল্লাহর নাম নিতে পারে। কোরবানির পশুকে আমরা আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছি, এতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ। সুতরাং তোমরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে এগুলোর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। অতঃপর সেগুলো যখন হেলে পড়বে অর্থাৎ জবাই সম্পন্ন হবে এবং দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাবে, তখন তা থেকে নিজেরা আহার করবে এবং দানের জন্য হাত পাতে না এমন দুস্থ ও যারা অভাব পেশ করে এমন দুস্থদেরও আহার করাবে। এভাবেই এগুলোকে আমরা তোমাদের জন্য বাধ্য করে দিয়েছি, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারো। এসব জন্তুর গোশত কিংবা রক্ত কিছুই আল্লাহর নিকট পৌঁছে না, বরং তোমাদের পক্ষ থেকে তার কাছে পৌঁছে শুধু তাকওয়া।
কোরআনের উপরিউক্ত আলোচনায় দেখা যায়, আল্লাহ কোরবানির উদ্দেশ্য হিসেবে পশু জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়াকে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি কোরবানির পশু আল্লাহ আমাদের জন্য বাধ্য করে দেওয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে তার প্রতি আমাদের শুকরিয়া এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব তথা তাকবিরকে উল্লেখ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আলল্গাহর নামে জবেহ করো'। তিনি নিজেও জবাইয়ের সময় 'বিসমিলল্গাহ আল্লাহু আকবর' বলতেন। কারও কাছে মনে হতে পারে, পশু জবাইয়ের সময় 'বিসমিলল্গাহ আল্লাহু আকবর' বলার মতো সামান্য কাজ কীভাবে এত বড় একটি ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে! কিন্তু আমাদের কাছে বিষয়টি যতই হালকা মনে হোক না কেন, আল্লাহর কাছে এটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমরা তখনই বুঝতে পারব, যখন সে সময়ে আরবে প্রচলিত একটি জাহালত ও জঘন্য শিরকের প্রতি লক্ষ্য করব। তৎকালীন আরবের মুশরিকরা আল্লাহর নাম বাদ দিয়ে নিজেদের দেবদেবীর নামে পশু বলি দিত। এটা ছিল সুস্পষ্ট এবং বড় ধরনের একটি শিরক, যা আল্লাহর পরিবর্তে গাইরুল্লাহর প্রতি ভক্তির বীজ মানুষের মনে বপন করে দিয়েছিল। সুতরাং এহেন জঘন্য শিরকের মূলোৎপাটন করে মানুষের অন্তরে তাওহিদের বীজ বপন করার জন্যই পশু জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া ও তার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করাকে কোরবানির মূল উদ্দশ্য ঘোষণা করার প্রয়োজন ছিল। এ প্রসঙ্গে তাফসিরে বলা হয়েছে, 'মানুষ যেসব পদ্ধতিতে গায়রুল্লাহর বন্দেগি করেছে, সেগুলো সবই গায়রুল্লাহর জন্য নিষিদ্ধ করে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে দেওয়াই হচ্ছে ইবাদতের ক্ষেত্রে একত্ববাদের অন্যতম মৌলিক দাবি। ঠিক এমনিভাবে মানুষ তার মনগড়া উপাস্যদের জন্য পশু কোরবানি করতে থেকেছে। আল্লাহর শরিয়ত পশু কোরবানিকেও গায়রুল্লাহর জন্য একেবারে হারাম এবং আল্লাহর জন্য ওয়াজিব করে দিয়েছে।' অতএব কোরবানি করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করাকে মোটেও মামুলি ভাবা যাবে না। আমরা যদি এ ব্যাপারে আলল্গাহর নির্দেশের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাব, আল্লাহ তাদের জবেহ করো না বলে বলেছেন, তাদের ওপর আল্লাহর নাম নাও। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর নাম নেওয়াই হচ্ছে আসল বিষয়। কিন্তু আজকাল দেখা যায়, পশু জবাইয়ের সময় মুসলমানেরা অনেক গুরুত্বহীন বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিলেও আল্লাহর নাম নিয়ে কোরবানি করার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে চায় না। অথচ কোরআনের নির্দেশনা প্রমাণ করে, জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম না নিলে পশু হালাল হবে না। যেমন- অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'যার ওপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, তা থেকে তোমরা খেও না, তা হচ্ছে পাপাচার।' (আনয়াম, ১২১)।
প্রশ্ন হলো- আল্লাহর নাম আমরা কীভাবে নেবো? উচ্চ আওয়াজে, অনুচ্চস্বরে নাকি মনে মনে ধ্যান করে? এ ক্ষেত্রে আমরা রাসুল সাল্লালল্গাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই অনুসরণ করব। তিনি যেভাবে বলেছেন, আমাদেরও ঠিক সেভাবেই বলতে হবে। তাই আমরা এ ব্যাপারে হাদিসের ভাষা তালাশ করব। অনেকগুলো সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, রাসুল (সা.) জবাইয়ের সময় উচ্চৈঃস্বরে আল্লাহর নাম নিতেন, যা সাহাবিগণ শুনেছেন। তিনি বলতেন, 'বিসমিল্লাহ ওয়া আল্লাহু আকবর' তথা 'আল্লাহর নামে এবং আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।' তাই আমাদেরও উচিত জবাইয়ের সময় 'বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবর' উচ্চৈঃস্বরে বলা। এতে একই সঙ্গে কোরআন এবং সুন্নাহর ওপর আমাদের আ'মল হয়ে যাবে। তাছাড়া এটা হচ্ছে শিরকের বিরুদ্ধে তাওহিদের বলিষ্ঠ ঘোষণা, তাই এই ঘোষণা উচ্চ আওয়াজই দাবি করে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে পূর্ণ আন্তরিকতা। অর্থাৎ বাক্যগুলোর অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে অন্তরে আল্লাহর ভয় নিয়ে বলা উচিত। শুধু উচ্চ আওয়াজে বললেই হক আদায় হবে না বরং সেই সঙ্গে থাকতে হবে পূর্ণ আন্তরিকতা।
  প্রভাষক, জয়নারায়ণপুর ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসা বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী

আরও পড়ুন

×