সাক্ষাৎকার
বেড়িবাঁধের নির্মাণ প্রকৌশল বদলাতে হবে
×
অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
সমকাল :জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে দেশে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে...
আইনুন নিশাত :বর্ষাকালে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আমাদের দেশের নদীগুলোর উজান অংশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় বন্যার সৃষ্টি হয়। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় থেকে এই বন্যা হয়ে আসছে। বন্যা না হলে বাংলাদেশের সৃষ্টি হতো না। এখন থেকে প্রায় ২০ হাজার বছর আগে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে যে পলি এসেছে, সেই পলি দিয়ে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত হয়েছে। কাজেই বর্ষার সময় নদীর পানি দুই কূল পূর্ণ করে অথবা কোনো বছর দুই কূল উপচে প্রবাহিত হবে এটাই স্বাভাবিক।
সমকাল :প্রকৃতির এই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া দরকার?
আইনুন নিশাত :আমাদের দেশে চিন্তা-ভাবনা বহু বছরের পুরোনোই রয়ে গেছে। বহু বছরের পুরোনো এ কারণে বলছি যে, বন্যা হলে ত্রাণ বিতরণ করতে হবে। মহামতি অশোক এখন থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে বন্যার সময় তার প্রজাদের যাতে সংকট না হয়, সে জন্য রাজ্যে শস্যভাণ্ডার থেকে ত্রাণ বিতরণ করেছিলেন। মোগল আমলেও তাই ছিল। ব্রিটিশরা এ বিষয়ে ততটা আগ্রহী ছিল না। কেবল দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা দেখা দিলে ত্রাণকার্যে নামত। বাংলাদেশ হওয়ার পরেও আমরা সেই চিন্তাভাবনা থেকে দূরে সরিনি।
সমকাল :পঞ্চাশের দশক থেকে আমরা অনেক পরিকল্পনাও করছি।
আইনুন নিশাত :১৯৫৪-৫৫ সালে ব্যাপক বন্যা হয়। সে সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে ক্রুগ মিশন গঠন করা হয় এবং ওই মিশনের প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো- বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এখানে দুর্ভিক্ষ হবেই। সে জন্য তারা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে বলে। পরে ১৯৬৪ সালে মহাপরিকল্পনাটি প্রণীত হয়। আমরা আজও ১৯৬৪ সালের ধারায় চলছি। ১৯৬৪ সালের পরিকল্পনায় বলা হয়- বাঁধ নির্মাণ করে বন্যার পানি ঠেকাতে হবে। ভেতরের পানি স্লুইসগেট বা রেগুলেটরের মাধ্যমে বের করতে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে তখন জনসংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচ কোটি। এখন জনসংখ্যা ১৮-১৯ কোটি। সুতরাং এখন আর ১৯৬৪ সালের চিন্তাধারা চলতে পারে না। এখন একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন গঠন করা দরকার। সরকারের যে কর্মকর্তারা টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন, তাদের এ দায়িত্ব দিতে হবে। কারণ বন্যা হলে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়, কর্মসংস্থানের অভাব দেখা দেয়, জীবিকা থাকে না, স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। এগুলো সবই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৭টি লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত। এই কমিটিকে স্থান, কাল এবং কারণভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
সমকাল : বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে বন্যার বিভিন্ন ধরন ও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়।
আইনুন নিশাত :আজ যখন কথা বলছি তখন রাজধানী ঢাকার একটি বড় অংশ পানির নিচে রয়েছে। বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না। রাস্তায় গাড়ি চলছে নৌকার মতো ঢেউ তুলে। এটাকে অনেকেই জলাবদ্ধতা বলে থাকেন। আমার সংজ্ঞা অনুযায়ী ডুবে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই বন্যা। অর্থাৎ জলাবদ্ধতাও একপ্রকার বন্যা। চট্টগ্রামেরও একই অবস্থা। শহরের উজানের পাহাড়গুলো থেকে বৃষ্টির পানির যে ঢল নামে, সেগুলো নিস্কাশিত হতে পারে না। কারণ বর্ষায় কর্ণফুলীর পানি ফুলে ওঠে। আবার মাঝে মাঝে কাপ্তাইয়ের পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। সবকিছুর প্রভাবে চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চল ডুবে যায়। অর্থাৎ চট্টগ্রামের বন্যার কারণ আরেক রকম। সেখানে বাইরের পানি ভেতরে আসতে দেওয়া যাবে না এবং ভেতরের পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা দেখছি সুনামগঞ্জ শহরে কোনো বাঁধ নেই। পানি বিপদসীমার ওপরে উঠলে সুনামগঞ্জ শহর ডুবে যাবে। বর্ষায় হাওরাঞ্চল ডুবে যাবে, এটা স্বাভাবিক। এটাকে বন্যা বললে আমি প্রতিবাদ করব। প্রতিবছর দেশের এক-চতুর্থাংশ যদি পানিতে ডুবে যায়, তাহলে আমরা পরিবেশগতভাবে শঙ্কিত হই। কিন্তু সেটির স্বাভাবিক সীমারেখা আছে। আবার কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি হঠাৎ করে বেড়ে যায়, আবার হঠাৎ করেই কমে যায়।
সমকাল :বন্যায় মানুষের দুর্দশা দেখতে পাই আমরা।
আইনুন নিশাত : সেটি মূলত চরাঞ্চলে। পদ্মার চরে মানুষের বসতি কম। যমুনার চরে বেশি। কারও কারও অনুমান যমুনার চরাঞ্চলে ৫০ লাখ লোকের বসবাস। আরও ৫০ লাখ লোকের বসবাস নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, হাতিয়া ও সন্দ্বীপ অঞ্চলের বিভিন্ন চরে। সেখানে বন্যার আশঙ্কা খুব বেশি নেই। কিন্তু যমুনার চরে যে ৫০ লাখ মানুষ বাস করে, তারা সবাই আজ ক্ষতির শিকার। এ বছর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় সেখানকার চরগুলো পানির নিচে চলে গেছে। তবে বাসিন্দাদের অনেকেই নিজস্ব উদ্যোগে বসতবাড়ি উঁচু করে নিয়েছে। বহু জায়গায় সরকার প্রাইমারি স্কুলের মাঠ উঁচু করে ত্রাণ কেন্দ্র তৈরি করেছে। যমুনার চরের মানুষেরা কিন্তু এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি- সেখানকার লোকজন বাড়িঘর নৌকায় করে উঁচু জায়গায় যাচ্ছে। এটা যমুনার চরাঞ্চলে প্রতি দুই-তিন বছর পরপরই ঘটে।
সমকাল :আপনি বলছেন, ঢাকায় এখন জলাবদ্ধতা চলছে। বন্যার পানিও ঢুকতে পারে?
আইনুন নিশাত :ঢাকা শহরের পশ্চিম অংশ অর্থাৎ টঙ্গি ব্রিজ থেকে মিরপুর-আশুলিয়া হয়ে বুড়িগঙ্গার ১ নম্বর ব্রিজ পর্যন্ত বাঁধ দিয়ে আটকানো। এই বেড়িবাঁধটি না থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আদাবর বা কল্যাণপুর এলাকাটি পানির নিচে ডুবে যেত। অর্থাৎ বেড়িবাঁধটি কার্যকর। কিন্তু পূর্বদিকে কোনো বেড়িবাঁধ নেই। ডেমরা থেকে বালু নদীর পার ঘেঁষে টঙ্গী পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ও রাস্তা একসঙ্গে নির্মাণ করার কথা ছিল; কিন্তু তা হচ্ছে না বলে সেখানকার ৩০-৪০ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হবে।
সমকাল :দেশের অনেক জেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থাকলেও সেগুলো খুব বেশি কাজে আসছে না কেন?
আইনুন নিশাত :১৯৬৪ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত বাঁধগুলো দিয়ে দেশের ৭০-৮০ ভাগ এলাকা প্রটেক্টেড থাকার কথা। জিকে প্রজেক্টের জন্য হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে কুষ্টিয়ার পাশ ঘেঁষে ফরিদপুর পর্যন্ত যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত ভাঙেনি। ফলে আমরা কুষ্টিয়া অঞ্চলে বন্যা হতে দেখি না। কিন্তু গাইবান্ধা থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে বাঘাবাড়ী ঘাট পর্যন্ত যে বাঁধ আছে সেটি প্রায়ই ভেঙে যায়। কারণ বাঁধগুলো নির্মিত হয়েছিল নদী থেকে এক কিলোমিটার দূরে। নদী ভাঙতে ভাঙতে বাঁধকে আক্রান্ত করে এবং বাঁধগুলো ভেঙে যায়। এবারও সিরাজগঞ্জের কাছে বহু জায়গায় বাঁধ ভেঙে ভেতরে পানি ঢুকেছে। বাঁধ নির্মাণ করলে তা কার্যকর থাকতে হবে। অন্যথায় বাঁধ না থাকলে যে ক্ষতি হতো তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে। বন্যায় যে বাঁধ ভাঙে, তা থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। বাঁধগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা ও কাজ শুকনো মৌসুমেই শেষ করা উচিত। এ জন্য নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। শুধু স্থানীয় প্রকৌশলীদের দায়ী করা কোনোমতেই ঠিক হবে না।
সমকাল :আগামী বছরগুলোতে বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা।
আইনুন নিশাত :কারণ বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। এখন থেকে ১০-১৫ বছর পরে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে। ৫০ বছর পরে বৃষ্টির পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে। ফলে বন্যা ও জলবদ্ধতার সংকট আরও বাড়বে। আমাদের উচিত হবে পুরোনো চিন্তা থেকে বেরিয়ে যুগোপযোগী ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সমকাল :বন্যা নিয়ন্ত্রণে কী করতে হবে?
আইনুন নিশাত :নিয়ন্ত্রণ নয়, ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে। যেখানে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা আছে সেখানে পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। বেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে ষাট বা সত্তরের দশকের মতো করে ভাবলে হবে না। বাঁধের অবকাঠামো নিয়ে পঞ্চাশ বা একশ' বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। বাঁধের নির্মাণ প্রকৌশল বদলাতে হবে। প্রয়োজনে মাটির বাঁধের পরিবর্তে কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণ করতে হবে।
সমকাল : এ বছর বন্যায় নদী ভাঙনের প্রকোপ বেড়েছে।
আইনুন নিশাত :বন্যার সঙ্গে নদীর শক্তিশালী হওয়া ও নদী ভাঙনের সম্পর্ক প্রাকৃতিক। আমাদের দেশে পানি উন্নয়ন বোর্ড যে ডিজাইনে নদী ভাঙন রোধ করতে চায়, আমি মনে করি এটা সঠিক নয়। সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখেছি, উপকূল অঞ্চলে সেনাবাহিনী ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো নির্মাণ করছে। তারা যে জিও ব্যাগ ব্যবহার করছে, সেগুলোর একেকটার ওজন তিন থেকে পাঁচ টন। আর আমাদের প্রকৌশলীরা ব্যবহার করেন আড়াইশ' কেজির জিও ব্যাগ। যেখানে আমাদের এক টন দরকার, সেখানে আড়াইশ' কেজি কাজ করবে কীভাবে? এর জন্য পরিকল্পনা কমিশনকে দায়িত্ব নিতে হবে। কারিগরি মহল থেকে যারা নীতিনির্ধারকদের কাছে ডিজাইন পাঠান, তারা যেন নির্ভয়ে সঠিক ডিজাইনটি পাঠাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দশ বা বিশ বছর আগে যে কুপরিকল্পনায় কাজ হয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে।
সমকাল :ভুল পরিকল্পনায় নদীও তো মেরে ফেলা হচ্ছে।
আইনুন নিশাত :নদীমাতৃক দেশে নৌ চলাচল ব্যবস্থা বন্ধ করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা তার অধীনস্থ প্রকৌশলীরা। খরচ কমানোর নামে কালভার্টের দৈর্ঘ্য ছোট করে নৌপথগুলো ধ্বংস করেছে। এখন খরচের কথা না ভেবে সঠিক ডিজাইনের কথা ভাবতে হবে। এর জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিশন গঠন করতে হবে। ডেল্টা পরিকল্পনার অধীনেও কাজগুলো হতে পারে। এক্ষেত্রে যারা দায়িত্বে থাকবেন তারা যেন মাঠ পর্যায়ের অবস্থাটা অনুধাবন করেন।
সমকাল :আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আইনুন নিশাত : সমকালের জন্য শুভকামনা।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ :সুদীপ্ত সাইফুল
আইনুন নিশাত :বর্ষাকালে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আমাদের দেশের নদীগুলোর উজান অংশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় বন্যার সৃষ্টি হয়। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় থেকে এই বন্যা হয়ে আসছে। বন্যা না হলে বাংলাদেশের সৃষ্টি হতো না। এখন থেকে প্রায় ২০ হাজার বছর আগে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে যে পলি এসেছে, সেই পলি দিয়ে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত হয়েছে। কাজেই বর্ষার সময় নদীর পানি দুই কূল পূর্ণ করে অথবা কোনো বছর দুই কূল উপচে প্রবাহিত হবে এটাই স্বাভাবিক।
সমকাল :প্রকৃতির এই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া দরকার?
আইনুন নিশাত :আমাদের দেশে চিন্তা-ভাবনা বহু বছরের পুরোনোই রয়ে গেছে। বহু বছরের পুরোনো এ কারণে বলছি যে, বন্যা হলে ত্রাণ বিতরণ করতে হবে। মহামতি অশোক এখন থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে বন্যার সময় তার প্রজাদের যাতে সংকট না হয়, সে জন্য রাজ্যে শস্যভাণ্ডার থেকে ত্রাণ বিতরণ করেছিলেন। মোগল আমলেও তাই ছিল। ব্রিটিশরা এ বিষয়ে ততটা আগ্রহী ছিল না। কেবল দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা দেখা দিলে ত্রাণকার্যে নামত। বাংলাদেশ হওয়ার পরেও আমরা সেই চিন্তাভাবনা থেকে দূরে সরিনি।
সমকাল :পঞ্চাশের দশক থেকে আমরা অনেক পরিকল্পনাও করছি।
আইনুন নিশাত :১৯৫৪-৫৫ সালে ব্যাপক বন্যা হয়। সে সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে ক্রুগ মিশন গঠন করা হয় এবং ওই মিশনের প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো- বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এখানে দুর্ভিক্ষ হবেই। সে জন্য তারা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে বলে। পরে ১৯৬৪ সালে মহাপরিকল্পনাটি প্রণীত হয়। আমরা আজও ১৯৬৪ সালের ধারায় চলছি। ১৯৬৪ সালের পরিকল্পনায় বলা হয়- বাঁধ নির্মাণ করে বন্যার পানি ঠেকাতে হবে। ভেতরের পানি স্লুইসগেট বা রেগুলেটরের মাধ্যমে বের করতে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে তখন জনসংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচ কোটি। এখন জনসংখ্যা ১৮-১৯ কোটি। সুতরাং এখন আর ১৯৬৪ সালের চিন্তাধারা চলতে পারে না। এখন একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন গঠন করা দরকার। সরকারের যে কর্মকর্তারা টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন, তাদের এ দায়িত্ব দিতে হবে। কারণ বন্যা হলে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়, কর্মসংস্থানের অভাব দেখা দেয়, জীবিকা থাকে না, স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। এগুলো সবই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৭টি লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত। এই কমিটিকে স্থান, কাল এবং কারণভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
সমকাল : বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে বন্যার বিভিন্ন ধরন ও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়।
আইনুন নিশাত :আজ যখন কথা বলছি তখন রাজধানী ঢাকার একটি বড় অংশ পানির নিচে রয়েছে। বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না। রাস্তায় গাড়ি চলছে নৌকার মতো ঢেউ তুলে। এটাকে অনেকেই জলাবদ্ধতা বলে থাকেন। আমার সংজ্ঞা অনুযায়ী ডুবে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই বন্যা। অর্থাৎ জলাবদ্ধতাও একপ্রকার বন্যা। চট্টগ্রামেরও একই অবস্থা। শহরের উজানের পাহাড়গুলো থেকে বৃষ্টির পানির যে ঢল নামে, সেগুলো নিস্কাশিত হতে পারে না। কারণ বর্ষায় কর্ণফুলীর পানি ফুলে ওঠে। আবার মাঝে মাঝে কাপ্তাইয়ের পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। সবকিছুর প্রভাবে চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চল ডুবে যায়। অর্থাৎ চট্টগ্রামের বন্যার কারণ আরেক রকম। সেখানে বাইরের পানি ভেতরে আসতে দেওয়া যাবে না এবং ভেতরের পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা দেখছি সুনামগঞ্জ শহরে কোনো বাঁধ নেই। পানি বিপদসীমার ওপরে উঠলে সুনামগঞ্জ শহর ডুবে যাবে। বর্ষায় হাওরাঞ্চল ডুবে যাবে, এটা স্বাভাবিক। এটাকে বন্যা বললে আমি প্রতিবাদ করব। প্রতিবছর দেশের এক-চতুর্থাংশ যদি পানিতে ডুবে যায়, তাহলে আমরা পরিবেশগতভাবে শঙ্কিত হই। কিন্তু সেটির স্বাভাবিক সীমারেখা আছে। আবার কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি হঠাৎ করে বেড়ে যায়, আবার হঠাৎ করেই কমে যায়।
সমকাল :বন্যায় মানুষের দুর্দশা দেখতে পাই আমরা।
আইনুন নিশাত : সেটি মূলত চরাঞ্চলে। পদ্মার চরে মানুষের বসতি কম। যমুনার চরে বেশি। কারও কারও অনুমান যমুনার চরাঞ্চলে ৫০ লাখ লোকের বসবাস। আরও ৫০ লাখ লোকের বসবাস নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, হাতিয়া ও সন্দ্বীপ অঞ্চলের বিভিন্ন চরে। সেখানে বন্যার আশঙ্কা খুব বেশি নেই। কিন্তু যমুনার চরে যে ৫০ লাখ মানুষ বাস করে, তারা সবাই আজ ক্ষতির শিকার। এ বছর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় সেখানকার চরগুলো পানির নিচে চলে গেছে। তবে বাসিন্দাদের অনেকেই নিজস্ব উদ্যোগে বসতবাড়ি উঁচু করে নিয়েছে। বহু জায়গায় সরকার প্রাইমারি স্কুলের মাঠ উঁচু করে ত্রাণ কেন্দ্র তৈরি করেছে। যমুনার চরের মানুষেরা কিন্তু এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি- সেখানকার লোকজন বাড়িঘর নৌকায় করে উঁচু জায়গায় যাচ্ছে। এটা যমুনার চরাঞ্চলে প্রতি দুই-তিন বছর পরপরই ঘটে।
সমকাল :আপনি বলছেন, ঢাকায় এখন জলাবদ্ধতা চলছে। বন্যার পানিও ঢুকতে পারে?
আইনুন নিশাত :ঢাকা শহরের পশ্চিম অংশ অর্থাৎ টঙ্গি ব্রিজ থেকে মিরপুর-আশুলিয়া হয়ে বুড়িগঙ্গার ১ নম্বর ব্রিজ পর্যন্ত বাঁধ দিয়ে আটকানো। এই বেড়িবাঁধটি না থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আদাবর বা কল্যাণপুর এলাকাটি পানির নিচে ডুবে যেত। অর্থাৎ বেড়িবাঁধটি কার্যকর। কিন্তু পূর্বদিকে কোনো বেড়িবাঁধ নেই। ডেমরা থেকে বালু নদীর পার ঘেঁষে টঙ্গী পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ও রাস্তা একসঙ্গে নির্মাণ করার কথা ছিল; কিন্তু তা হচ্ছে না বলে সেখানকার ৩০-৪০ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হবে।
সমকাল :দেশের অনেক জেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থাকলেও সেগুলো খুব বেশি কাজে আসছে না কেন?
আইনুন নিশাত :১৯৬৪ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত বাঁধগুলো দিয়ে দেশের ৭০-৮০ ভাগ এলাকা প্রটেক্টেড থাকার কথা। জিকে প্রজেক্টের জন্য হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে কুষ্টিয়ার পাশ ঘেঁষে ফরিদপুর পর্যন্ত যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত ভাঙেনি। ফলে আমরা কুষ্টিয়া অঞ্চলে বন্যা হতে দেখি না। কিন্তু গাইবান্ধা থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে বাঘাবাড়ী ঘাট পর্যন্ত যে বাঁধ আছে সেটি প্রায়ই ভেঙে যায়। কারণ বাঁধগুলো নির্মিত হয়েছিল নদী থেকে এক কিলোমিটার দূরে। নদী ভাঙতে ভাঙতে বাঁধকে আক্রান্ত করে এবং বাঁধগুলো ভেঙে যায়। এবারও সিরাজগঞ্জের কাছে বহু জায়গায় বাঁধ ভেঙে ভেতরে পানি ঢুকেছে। বাঁধ নির্মাণ করলে তা কার্যকর থাকতে হবে। অন্যথায় বাঁধ না থাকলে যে ক্ষতি হতো তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে। বন্যায় যে বাঁধ ভাঙে, তা থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। বাঁধগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা ও কাজ শুকনো মৌসুমেই শেষ করা উচিত। এ জন্য নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। শুধু স্থানীয় প্রকৌশলীদের দায়ী করা কোনোমতেই ঠিক হবে না।
সমকাল :আগামী বছরগুলোতে বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা।
আইনুন নিশাত :কারণ বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। এখন থেকে ১০-১৫ বছর পরে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে। ৫০ বছর পরে বৃষ্টির পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে। ফলে বন্যা ও জলবদ্ধতার সংকট আরও বাড়বে। আমাদের উচিত হবে পুরোনো চিন্তা থেকে বেরিয়ে যুগোপযোগী ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সমকাল :বন্যা নিয়ন্ত্রণে কী করতে হবে?
আইনুন নিশাত :নিয়ন্ত্রণ নয়, ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে। যেখানে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা আছে সেখানে পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। বেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে ষাট বা সত্তরের দশকের মতো করে ভাবলে হবে না। বাঁধের অবকাঠামো নিয়ে পঞ্চাশ বা একশ' বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। বাঁধের নির্মাণ প্রকৌশল বদলাতে হবে। প্রয়োজনে মাটির বাঁধের পরিবর্তে কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণ করতে হবে।
সমকাল : এ বছর বন্যায় নদী ভাঙনের প্রকোপ বেড়েছে।
আইনুন নিশাত :বন্যার সঙ্গে নদীর শক্তিশালী হওয়া ও নদী ভাঙনের সম্পর্ক প্রাকৃতিক। আমাদের দেশে পানি উন্নয়ন বোর্ড যে ডিজাইনে নদী ভাঙন রোধ করতে চায়, আমি মনে করি এটা সঠিক নয়। সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখেছি, উপকূল অঞ্চলে সেনাবাহিনী ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো নির্মাণ করছে। তারা যে জিও ব্যাগ ব্যবহার করছে, সেগুলোর একেকটার ওজন তিন থেকে পাঁচ টন। আর আমাদের প্রকৌশলীরা ব্যবহার করেন আড়াইশ' কেজির জিও ব্যাগ। যেখানে আমাদের এক টন দরকার, সেখানে আড়াইশ' কেজি কাজ করবে কীভাবে? এর জন্য পরিকল্পনা কমিশনকে দায়িত্ব নিতে হবে। কারিগরি মহল থেকে যারা নীতিনির্ধারকদের কাছে ডিজাইন পাঠান, তারা যেন নির্ভয়ে সঠিক ডিজাইনটি পাঠাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দশ বা বিশ বছর আগে যে কুপরিকল্পনায় কাজ হয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে।
সমকাল :ভুল পরিকল্পনায় নদীও তো মেরে ফেলা হচ্ছে।
আইনুন নিশাত :নদীমাতৃক দেশে নৌ চলাচল ব্যবস্থা বন্ধ করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা তার অধীনস্থ প্রকৌশলীরা। খরচ কমানোর নামে কালভার্টের দৈর্ঘ্য ছোট করে নৌপথগুলো ধ্বংস করেছে। এখন খরচের কথা না ভেবে সঠিক ডিজাইনের কথা ভাবতে হবে। এর জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিশন গঠন করতে হবে। ডেল্টা পরিকল্পনার অধীনেও কাজগুলো হতে পারে। এক্ষেত্রে যারা দায়িত্বে থাকবেন তারা যেন মাঠ পর্যায়ের অবস্থাটা অনুধাবন করেন।
সমকাল :আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আইনুন নিশাত : সমকালের জন্য শুভকামনা।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ :সুদীপ্ত সাইফুল
- বিষয় :
- বেড়িবাঁধের নির্মাণ