ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ছায়া ও মায়ার মনোয়ারা জামান

ছায়া ও মায়ার মনোয়ারা জামান
×

জাহিদ রহমান

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

ছায়া ও মায়ায় ভরা এক অভিভাবক ছিলেন মনোয়ারা জামান। ২৮ জুন চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন মাগুরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক এই সভানেত্রী। সবার শ্রদ্ধেয় মনোয়ারা জামান মাগুরার প্রয়াত জননেতা, একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আছাদুজ্জামানের সহধর্মিণী এবং মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. সাইফুজ্জামান শিখরের মা। তার বড় মেয়ে কামরুল লায়লা জলিও বিগত সংসদে সংরক্ষিত আসনের এমপি ছিলেন। কিন্তু এসব পরিচয়ের বাইরে দলীয় নেতাকর্মী আর মাগুরার সাধারণ মানুষের কাছে মনোয়ারা জামানের পরিচয়ের দ্যুতি ছড়িয়েছিল সাদাসিধে এক অভিভাবক হিসেবে। হাসিমুখে সবার সঙ্গে মিশতেন, কথা বলতেন, আদর-আপ্যায়ন করতেন। স্বামী আছাদুজ্জামান একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও কোনোদিন তার মধ্যে সামান্যতম অহমিকা বা অহংকার কেউ খুঁজে পাননি। সেই মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরের কাল থেকে স্বামীর সঙ্গে তিনিও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়তে লড়াই করেছেন, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
'ভাবি' হিসেবে সবার কাছে তিনি প্রিয় ছিলেন। দলীয় নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে, দুঃসময়ে নিজের আঁচল খুলে টাকা-পয়সা দিতেও কার্পণ্য করতেন না। রাতদুপুরে নেতাকর্মীদের জন্য ভাত রান্না করে খাওয়ানো, শোবার ব্যবস্থা করা- রাজনৈতিক পরিবারের মানুষ হিসেবে এসব তিনি করেছেন সারাজীবন। আবার বিভিন্ন আন্দোলনের সময় পুলিশের হাত থেকে নেতাকর্মীদের রক্ষা করতে বাড়িতে লুকিয়ে রাখার বহু ঘটনা তিনি সামলেছেন ঠান্ডা মাথায়। আছাদুজ্জামানের জেল জীবন এবং নিপীড়ন-নির্যাতনকালে তিনি পুরো পরিবার নিয়ে একা সংগ্রাম ও লড়াই করেছেন। '৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে আছাদুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘদিন জেলে থাকেন তিনি। এই মহাসংকটে তিনি ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে নিয়ে একাই সংগ্রামে অবতীর্ণ হন।
জিয়াউর রহমানের আমলে স্বামী মো. আছাদুজ্জামানকে একাধিকবার বিএনপিতে যোগদানের জন্য বার্তা পাঠানো হলেও মনোয়ারা জামান কখনোই তাতে সামান্যতম সায় দেননি। বরং গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন মারফত এ ধরনের অনুরোধের কথা শুনেই তিনি তা স্পষ্ট নাকচ করে দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য, '৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জিয়াউর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগ সারাদেশে মোট ৩৯টি আসনে জয়ী হয়। তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলায় ( যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা) শুধু যশোর-১১ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে অ্যাডভোকেট মো. আছাদুজ্জামান একমাত্র নির্বাচিত হয়েছিলেন।
স্বাধানীতার পর মো. আছাদুজ্জামান তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ঢাকায় কখনোই প্লট বা ফ্ল্যাট নেওয়ার কথা চিন্তা করেননি। এমনকি সংসদ সদস্য হিসেবে কখনই তার ব্যক্তিগত কোনো গাড়িও ছিল না। সংসদ অধিবেশনের আগে মনোয়ারা জামান মাগুরা থেকে সবজি ও মাংস কিনে সোহাগ বা ঈগল পরিবহনে স্বামী আছাদুজ্জামানের সঙ্গে ঢাকায় এমপি হোস্টেলে আসতেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মনোয়ারা জামানের সম্পর্ক বরাবরই ছিল মা ও মেয়ের মতো। দু'জনের দেখা হয়েছে বহুবার। '৮১ সালের ১৭ মে দেশে আসার পর সারাদেশে রাজনৈতিক সফর শুরু করেন শেখ হাসিনা। মাগুরাতেও রাজনৈতিক সমাবেশ করেন তিনি। সে সময় প্রথম আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা মাগুরায় আছাদুজ্জামানের বাড়িতে যান। মনোয়ারা জামানের সঙ্গে ছবিও তোলেন। যে ছবি স্মৃতিময় হয়ে আছে। '৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর অ্যাডভোকেট মো. আছাদুজ্জামানের মৃত্যু হলে '৯৪ সালের মার্চে মাগুরা-২ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে কারচুপির ঘটনা ঘটলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা মাগুরায় গিয়ে আছাদুজ্জামানের বাসভবনে দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনে যাবেন না বলে আন্দোলনে ঘোষণা দেন। সেদিন শেখ হাসিনার পাশে মনোয়ারা জামানও ছিলেন। মনোয়ারা জামানের মৃত্যুতে মাগুরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সত্যিকার অর্থেই তাদের মাতৃসম অভিভাবককে হারাল। ছায়া ও মায়ার এই মানুষটি সবার কাছে শ্রদ্ধেয় হয়ে থাকবেন চিরদিন।

আরও পড়ুন

×